ভোলা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস © সংগৃহীত
ভোলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর বড় একটি অংশ চলছে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই। বিদ্যালয় আছে, শিক্ষার্থী আছে, সহকারী শিক্ষকও আছেন; কিন্তু নেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক। জেলার ১ হাজার ৪৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪২৮টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। অর্থাৎ জেলার প্রায় ৪১ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চলছে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই।
শুধু প্রধান শিক্ষক সংকট নয়, সহকারী শিক্ষক পদেও রয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি। জেলায় সহকারী শিক্ষকের ৪৬৪টি পদ শূন্য রয়েছে। ফলে কোথাও প্রধান শিক্ষক নেই, আবার কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় কম সহকারী শিক্ষক দিয়ে চলছে পাঠদান। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে একই সঙ্গে দুই ধরনের জনবল সংকট রয়েছে।
বরিশাল বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষার উপপরিচালকের কার্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। বিভাগের ৬ হাজার ২৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২ হাজার ৫৯৯টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। সে হিসাবে বিভাগের প্রতি ১০টি বিদ্যালয়ের প্রায় চারটিই চলছে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই।
একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শুধু প্রশাসনিক দায়িত্বই পালন করেন না; একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনাতেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসছেন কি না, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান সঠিকভাবে হচ্ছে কি না, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি, বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ও শিক্ষা কার্যক্রম—এসব তদারকির দায়িত্বও প্রধান শিক্ষকের। ফলে দীর্ঘদিন পদটি শূন্য থাকলে বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব ও তদারকি ব্যবস্থায় ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ভোলার ৪২৮টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানে বিকল্প ব্যবস্থায় কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। বিভাগীয় তথ্য অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকলেও বিভাগের ৩ হাজার ৬৪৪টি বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যে ১ হাজার ১৪ জন রয়েছেন চলতি দায়িত্বে।
প্রধান শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি ভোলায় সহকারী শিক্ষক সংকটও রয়েছে। জেলায় ৪৬৪টি সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য থাকায় কর্মরত শিক্ষকদের ওপর বাড়তি দায়িত্ব পড়ছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকলে নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষা কার্যক্রমে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান শাহিন বলেন, ২০০৯ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি বন্ধ রয়েছে। ২০১৭ সালে কিছু জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হলেও তাদের স্থায়ীভাবে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। এর মধ্যে অনেকে অবসরে গেছেন, অনেকে মারা গেছেন। কিন্তু শূন্য পদ পূরণে নতুন করে পদোন্নতির উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, বছরের পর বছর প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য থাকায় বিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত পদোন্নতির মাধ্যমে শূন্য পদ পূরণ করা প্রয়োজন।
বিদ্যালয়ের বাইরেও প্রাথমিক শিক্ষার তদারকি ব্যবস্থায় রয়েছে জনবল সংকট। বিভাগের ছয় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৭০টি পদের মধ্যে ৩১টি এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসগুলোতে ৫৩৯টি পদের মধ্যে ৩১৩টি পদ শূন্য রয়েছে। বিভাগীয় উপপরিচালকের কার্যালয়েও ১৪টি পদের মধ্যে পাঁচটি পদ শূন্য।
মাঠপর্যায়ের শিক্ষা প্রশাসনেও বড়সংখ্যক পদ শূন্য থাকায় বিদ্যালয় পরিদর্শন, শিক্ষকদের জবাবদিহি এবং পাঠদানের মান পর্যবেক্ষণ কতটা কার্যকরভাবে হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিদ্যালয়ের ভেতরে শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি তদারকি ব্যবস্থায় জনবল ঘাটতি থাকলে সমস্যাগুলো দ্রুত চিহ্নিত ও সমাধান করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সুজন বরিশাল জেলার সাধারণ সম্পাদক রনজিৎ দত্ত বলেন, বিষয়টিকে শুধু শূন্য পদের হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে একটি প্রজন্মের শিক্ষার ওপর। দ্রুত প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষা অফিসের শূন্য পদ পূরণ, নিয়মিত বিদ্যালয় পরিদর্শন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বরিশাল বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মীর জাহিদুল কবির তুহিন বলেন, পুরো বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হলে সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে।
ভোলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক পদে দীর্ঘস্থায়ী এই শূন্যতা এখন শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়। বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের তদারকি—তিন ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়তে পারে। শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করাই এখন জেলার প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।