প্রতি পাঁচজনে ৪ জনই ভুগছেন মেরুদণ্ডের ব্যথায়

১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৭ PM
নিউরোসার্জারি বিভাগের বর্ণাঢ্য র‌্যালি

নিউরোসার্জারি বিভাগের বর্ণাঢ্য র‌্যালি © সংগৃহীত

দেশে প্রতি ৫ জনের ৪ জনই কোনো না কোনো সময়ে মেরুদণ্ডের ব্যাথায় ভোগেন বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে মেরুদণ্ডের সমস্যা ও কোমরব্যথা প্রতিরোধে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সঠিক শারীরিক ভঙ্গি এবং আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা। বলেছেন, নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্যাভ্যাস ও ওজন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মেরুদণ্ডের সুস্থতা বজায় রাখা সম্ভব। আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে দক্ষ জনবল, আধুনিক অস্ত্রোপচার সরঞ্জাম ও উন্নত প্রশিক্ষণসুবিধা বাড়ানোর আহ্বানও জানিয়েছেন তারা।

আজ রবিবার (১৮ অক্টোবর) ‘বিশ্ব মেরুদণ্ড দিবস’ উপলক্ষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ের প্রশিক্ষণ কমপ্লেক্স গ্যালারিতে নিউরোসার্জারি বিভাগ আয়োজিত বৈজ্ঞানিক আলোচনায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এমন কথা বলেন। এর আগে একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালি অনুষ্ঠিত হয়।

বৈজ্ঞানিক আলোচনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নাই যে তার মেরুদণ্ডের নেই। স্পাইন বা মেরুদণ্ড এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যার সঙ্গে আমাদের দৈনন্দিন জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মেরুদণ্ডের সমস্যা ছাড়া জীবনযাপন করেন, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাই মেরুদণ্ডের সুস্থতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অধ্যাপক জাহিদ রায়হান বলেন, মেরুদণ্ড সুস্থ ও সবল রাখতে আমাদের যা যা করা প্রয়োজন, তার অনেক কিছুই আমরা জানি না। অথচ জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম এবং শারীরিক পরিশ্রমের মতো বিষয়গুলো মেরুদণ্ডের সুস্থতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তিনি আরও বলেন, আমরা যদি এসব বিষয়ে সচেতন হই এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করি, তাহলে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক ক্ষয়জনিত পরিবর্তন ও এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার ক্ষেত্রে ৮০–৯০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নতি সম্ভব হতে পারে, অনেক ক্ষেত্রেই অস্ত্রোপচার বা অন্যান্য আক্রমণাত্মক চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োজন ছাড়াই।

আলোচনায় ঢামেক নিউরোসার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আ ফ ম মোমতাজ হক বলেন, আমরা একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ জাতি গড়ে তুলতে চাই। আর একটি জাতিকে গড়ে তুলতে হলে সেই জাতির সুস্থ থাকা অপরিহার্য। দুর্বল ও ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে কোনো জাতির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই জনগণকে স্বাস্থ্যশিক্ষায় শিক্ষিত করা, স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং সুস্থ জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করার কোনো বিকল্প নেই। স্বাস্থ্যশিক্ষার মাধ্যমেই আমরা একটি সুস্থ, সচেতন ও কর্মক্ষম জাতি গড়ে তুলতে পারি।

ডা. আ. ফ. ম. মোমতাজ হক আরও বলেন, ঢামেকের প্রেক্ষাপটে বলতে চাই, আমরা দীর্ঘদিন ধরে মেরুদণ্ডের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারসেবা দিয়ে আসছি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। এ জন্য দক্ষ জনবল তৈরির পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, উন্নত প্রশিক্ষণব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

তিনি আরও বলেন, আজকের যেসব শিক্ষার্থী নিউরোসার্জারি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, তাঁরাই আগামী দিনে এই বিভাগের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং দেশের চিকিৎসাসেবাকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। তাঁদের আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা প্রদানের উপযোগী করে গড়ে তুলতে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। যদিও এ ক্ষেত্রে আমরা কিছুটা এগিয়েছি, তবু কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাতে এখনো অনেক কাজ বাকি।

ডা. মোমতাজ হক বলেন, আমাদের প্রত্যাশা ছিল, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিদ্যমান সমস্যাগুলো তুলে ধরতে পারব, যাতে সেগুলোর কার্যকর সমাধান করা যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এন্ডোস্কোপিক মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচার শুরু করতে গিয়ে আমাদের চিকিৎসকদের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এ ধরনের অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত সি-আর্ম যন্ত্র, উপযুক্ত অস্ত্রোপচার টেবিল এবং অন্যান্য আধুনিক সরঞ্জামের পর্যাপ্ত সুবিধা সব সময় পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অস্ত্রোপচারের সময় একসঙ্গে বিভিন্ন দিক থেকে এক্স-রে চিত্র পাওয়া এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

এন্ডোস্কোপিক মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি অত্যন্ত ব্যয়বহুল উল্লেখ করে বিভাগীয় চেয়ারম্যান বলেন, একজন তরুণ চিকিৎসককে এই আধুনিক পদ্ধতিতে দক্ষতা অর্জনের জন্য অনেক সময় নিজের অর্থ ব্যয় করে বিদেশে প্রশিক্ষণ নিতে হচ্ছে। কিন্তু প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে সেই দক্ষতা কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিগত সুবিধা না থাকলে তার অর্জিত জ্ঞান যথাযথভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না। সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থায় এই সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা তাই অত্যন্ত জরুরি।

তিনি বলেন, আমরা চাই, ভবিষ্যতে দেশের প্রতিটি যোগ্য নিউরোসার্জন এন্ডোস্কোপিক মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচারসহ আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতিতে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন। একইভাবে, এন্ডোভাসকুলার নিউরোসার্জারির মতো উন্নত চিকিৎসাপদ্ধতিতেও দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

রোগীবান্ধব চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি আরও বলেন, আমাদের লক্ষ্য শুধু আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি চালু করা নয়; বরং এমন একটি চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে দক্ষ চিকিৎসক ও উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়ে রোগীরা নিরাপদ, কার্যকর ও আন্তর্জাতিক মানের সেবা পাবেন।

নিউরোসার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কানিজ ফাতেমা ইশরাত জাহান (রিফাত) বলেন, আজীবন মেরুদণ্ডের সুস্থতা বজায় রাখতে হলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সঠিক শারীরিক ভঙ্গি ও কর্মপদ্ধতি মেনে চলতে হবে। প্রকৃতপক্ষে, কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সঠিক শারীরিক ভঙ্গি বজায় রাখা জরুরি। এমনকি দাঁড়ানো বা বসার ক্ষেত্রেও মেরুদণ্ড সোজা রাখা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের অনেকেরই একটি বদভ্যাস রয়েছে—বসলেই অজান্তে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ি বা বাঁকা হয়ে বসি। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে বসার অভ্যাস মেরুদণ্ডের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যার ফল অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদে বোঝা যায়।

বৈজ্ঞানিক গবেষণার বরাত দিয়ে তিনি বলেন, মেরুদণ্ডের দুটি কশেরুকার মধ্যবর্তী আন্তঃকশেরুকা চাকতির (ইন্টারভার্টিব্রাল ডিস্ক) ওপর চাপ শারীরিক ভঙ্গি ও নড়াচড়ার ধরন অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। বিশেষ করে, অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসে থাকার পর সামনের দিকে ঝুঁকে কোনো কিছু তুলতে গেলে এই চাকতির ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রায়ই ছোটখাটো জিনিস মেঝেতে পড়ে যায়। যেমন, কলম বা অন্য কোনো বস্তু তুলতে গিয়ে আমরা অনেক সময় চেয়ারে বসেই কোমর বাঁকিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ি। এভাবে ভুল ভঙ্গিতে ভার তোলার ফলে মেরুদণ্ডের ওপর চাপ বেড়ে যেতে পারে এবং আন্তঃকশেরুকা চাকতিতে আঘাত লাগার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর পরিণতিতে দীর্ঘদিন কোমরব্যথায় ভুগতে হতে পারে।

মেরুদণ্ডের সুস্থতায় ব্রেইন অ্যান্ড স্পাইন সার্জন কানিজ ফাতেমা বলেন, কোন কিছু তোলার সময় কোমর বাঁকিয়ে বা কুঁজো হয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়া এড়িয়ে চলতে হবে। সম্ভব হলে উঠে দাঁড়িয়ে, হাঁটু ভাঁজ করে এবং পিঠ যথাসম্ভব সোজা রেখে বস্তুটি তুলতে হবে। বস্তুটি তোলার সময় সেটি শরীরের কাছাকাছি রাখতে হবে এবং কোমরের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এমন নড়াচড়া পরিহার করতে হবে। এটাই হলো ‘আজীবন মেরুদণ্ডের সুস্থতা’ নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়—দৈনন্দিন জীবনে সঠিক শারীরিক ভঙ্গি ও নিরাপদ কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করা।

তিনি আরও বলেন, প্রতি পাঁচজন মানুষের মধ্যে প্রায় চারজন জীবনের কোনো না কোনো সময় মেরুদণ্ডের ব্যথা বা কোমরব্যথায় ভুগতে পারেন। তাই মেরুদণ্ডের সুস্থতা বজায় রাখতে সচেতনতা, সঠিক অভ্যাস এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের প্রত্যেকের লক্ষ্য হওয়া উচিত—সচেতন জীবনযাপনের মাধ্যমে আজীবন মেরুদণ্ডের সুস্থতা বজায় রাখা।

অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢামেক হাসপাতালের আবাসিক সার্জন ডা. আশিক ইহসান ও নিউরো সার্জারি বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. মো. ইমাম হোসেন খান। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. মাযহারুল শহীন, ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন নিউরোসার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. খালেদ আহমেদুর রহমান।

মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
  • ১৮ অক্টোবর ২০২৬
জামায়াত নেতার মেয়ের সঙ্গে প্রেম, স্কুলছাত্রকে গাছে বেঁধে রা…
  • ১৮ অক্টোবর ২০২৬
জুনিয়র অফিসার নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকে,…
  • ১৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রেমিকার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ১৯০০ কিলোমিটার পাড়ি , পরে জা…
  • ১৮ অক্টোবর ২০২৬
নেপালকে হারিয়ে স্বস্তির জয় বাংলাদেশের
  • ১৮ অক্টোবর ২০২৬
এখন থেকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাদকের আখড়া ধ্বংস করব: প্রতিমন্…
  • ১৮ অক্টোবর ২০২৬