চা কিংবা কফি বেশি গরম পান করলে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে © এআই সৃষ্ট ছবি
চা কিংবা কফি একটু বেশি গরম না হলে অনেকেরই তৃপ্তি হয় না। তবে ধোঁয়া ওঠা গরম পানীয় পান করার এই অভ্যাস স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকির কারণ হতে পারে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, খুব গরম চা বা কফি পানকারীদের খাদ্যনালির একটি নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি হতে পারে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকী ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ক্যানসার-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। যুক্তরাজ্যের প্রায় ১০ লাখ মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এই সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন।
গবেষণায় যুক্তরাজ্যের দুটি বড় গবেষণা ‘মিলিয়ন উইমেন স্টাডি’ ও ‘ইউকে বায়োব্যাংক’-এর তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এতে ৩৭ থেকে ৭৩ বছর বয়সী প্রায় ১০ লাখ মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের চা বা কফি সাধারণত কতটা গরম পান করেন, তা জানতে ‘উষ্ণ’, ‘গরম’ ও ‘খুব গরম’ এই তিনটি বিকল্প দেওয়া হয়। পাশাপাশি দিনে কত কাপ গরম পানীয় পান করেন, সেটিও জানতে চাওয়া হয়।
এরপর এক দশকের বেশি সময় ধরে তাদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষকেরা বয়স, ধূমপান, অ্যালকোহল গ্রহণ ও শারীরিক গঠনের মতো অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিয়ে গরম পানীয়ের তাপমাত্রার সঙ্গে খাদ্যনালির ক্যানসারের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন।
‘খুব গরম’ পানীয়তে ঝুঁকি তিন গুণের বেশি
গবেষণার সময় ‘মিলিয়ন উইমেন স্টাডি’-তে গড়ে প্রায় ১৪ বছর এবং ‘ইউকে বায়োব্যাংক’-এ প্রায় ১১ বছর অংশগ্রহণকারীদের তথ্য অনুসরণ করা হয়। এই সময়ে মোট ২ হাজার ৩ ৪৮ জনের খাদ্যনালির ক্যানসার শনাক্ত হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ৪৫টি ছিল খাদ্যনালির ওপরের বা মাঝের অংশের ক্যানসার স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা (এসসিসি) এবং ১ হাজার ৩০৩টি ছিল খাদ্যনালির নিচের অংশের ক্যানসার অ্যাডেনোকার্সিনোমা (এসি)।
গবেষণায় দেখা যায়, যারা চা বা কফি ‘খুব গরম’ অবস্থায় পান করতে পছন্দ করেন, তাদের এসসিসি হওয়ার ঝুঁকি ‘উষ্ণ’ পানীয় পানকারীদের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। দুই গবেষণার তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই ঝুঁকি প্রায় ২১৭ শতাংশ বেশি।
এ ছাড়া যারা হালকা ‘গরম’ পানীয় পান করতেন, তাদেরও এসসিসি হওয়ার ঝুঁকি ‘উষ্ণ’ পানীয় পানকারীদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ছিল। তবে খাদ্যনালির অন্য ধরনের ক্যানসার অ্যাডেনোকার্সিনোমার ক্ষেত্রে পানীয়ের তাপমাত্রার সঙ্গে এমন সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
দিনে ছয় কাপের বেশি খেলেও বাড়ে ঝুঁকি
গবেষণায় শুধু পানীয়ের তাপমাত্রা নয়, দিনে কতবার গরম পানীয় পান করা হয়, সেটিও বিবেচনা করা হয়েছে। দেখা গেছে, যারা দিনে ছয় কাপ বা তার বেশি গরম পানীয় পান করেন, তাদের এসসিসি হওয়ার ঝুঁকি ছয় কাপের কম পানকারীদের তুলনায় ৭১ শতাংশ বেশি। পানীয়ের তাপমাত্রার বিষয়টি আলাদা হিসাব করার পরও এই বাড়তি ঝুঁকির তথ্য পাওয়া গেছে।
তাপই কি মূল কারণ?
গবেষকেরা দেখেছেন ধূমপান, অ্যালকোহল গ্রহণ কিংবা চায়ে দুধ মেশানোর মতো বিষয়গুলো হিসাবের মধ্যে নেওয়ার পরও খুব গরম পানীয়ের সঙ্গে খাদ্যনালির এসসিসি ক্যানসারের বাড়তি ঝুঁকির সম্পর্ক বজায় ছিল। গবেষকদের ধারণা, দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত গরম তরল পান করলে খাদ্যনালির ভেতরের সূক্ষ্ম আবরণে তাপজনিত ক্ষতি হতে পারে। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি হয়ে পরবর্তী সময়ে ক্যানসার তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
গবেষণায় যুক্ত না থাকা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, উদ্বেগের বিষয় চা বা কফি নয়, বরং অতিরিক্ত তাপ। মুখ ও জিহ্বার তুলনায় খাদ্যনালিতে তাপের অনুভূতি কম থাকায় মানুষ অনেক সময় অতিরিক্ত গরম তরলও বুঝতে না পেরে গিলে ফেলেন।
৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা নিয়ে সতর্কতা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ক্যানসার গবেষণা সংস্থা ‘আইএআরসি’ ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার পানীয়কে মানুষের জন্য ‘সম্ভবত ক্যানসার সৃষ্টিকারী’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, চা বা কফি তৈরি করার পর সঙ্গে সঙ্গে পান না করে কিছুটা ঠান্ডা হতে দেওয়া ভালো। তাপমাত্রা যাতে অন্তত ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে আসে, সে পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত।
অন্য খবর: বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ-সংঘাতের মধ্যেই এল শান্তি দিবস, এটি কেন পালন করা হয়
অন্যান্য ঝুঁকিও গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গরম পানীয়ের তাপমাত্রা কমানো উপকারী হলেও খাদ্যনালির ক্যানসারের অন্যান্য প্রধান ঝুঁকির বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। এর মধ্যে ধূমপান ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ অন্যতম। এ ছাড়া স্থূলতা এবং দীর্ঘস্থায়ী অ্যাসিড রিফ্লাক্সও (বুকে জ্বালাপোড়া) ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
গবেষণায় আরও জানানো হয়েছে, যুক্তরাজ্যে বর্তমানে যারা চা-কফি খুব গরম অবস্থায় পান করেন, তারা যদি তাপমাত্রা কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনেন, তবে দেশটিতে খাদ্যনালির এসসিসি ক্যানসারের প্রায় ১৪ শতাংশ ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব। এতে বছরে প্রায় ৪৪০ জন ক্যানসার আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা পেতে পারেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই গবেষণা পানীয়ের তাপমাত্রা ও খাদ্যনালির ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক দেখিয়েছে। তার মানে এই নয় যে, খুব গরম চা বা কফি পান করলেই ক্যানসার হবে। তবে সুরক্ষার স্বার্থে পানীয় কিছুটা ঠান্ডা করে পান করা এবং ধূমপান ও মদ্যপানের মতো অভ্যাস ত্যাগ করা অত্যন্ত জরুরি। (সূত্র: হেল্থলাইন)