ফ্রিজে রান্না করা খাবার © টিডিসি ছবি
রান্না করা খাবার ফ্রিজে রেখে বারবার গরম করে খাওয়া নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে খাবার থেকে সংক্রমণের ঝুঁকি কমে। তবে দীর্ঘ সময় ফ্রিজে রেখে বারবার গরম করলে খাবারের পুষ্টিগুণ কমে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে ভিটামিন ও প্রোটিনের ক্ষতি হতে পারে। নিয়মিত এমন খাবার খেলে হজমের সমস্যা ও শরীরে প্রদাহের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
রান্না করা খাবার সংরক্ষণে সতর্কতা জরুরি
খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের অভিযানের মুখে অনেক রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ দাবি করেছেন, রান্না করা খাবার দুই দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। তবে খাবারটি সঠিকভাবে প্যাকেটজাত করতে হবে। একই সঙ্গে তাপমাত্রা হতে হবে মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
ক্রেতাদের খাবার পরিবেশনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। একে বলা হয় লিফো মডেল। অর্থাৎ লাস্ট ইন ফার্স্ট আউট (এলআইএফও)। সহজ কথায়, আগের দিন রাতে যে খাবার বেঁচে গেছে, অর্ডার অনুযায়ী পরের দিন সেটিই আগে পরিবেশন করতে হবে। যদিও সব ধরনের খাবারের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়।
শুধু হোটেল-রেস্তোরাঁ নয়, বাড়িতেও এমন অভ্যাস রয়েছে। অনেকেই একদিনের রান্না করা খাবার দুই-তিন দিন ধরে খান। কখনো এর চেয়েও বেশি সময় খাবার সংরক্ষণ করা হয়।
দৈনন্দিন ব্যস্ততার কারণে অনেককেই এমন পদ্ধতি বেছে নিতে হয়। কিন্তু রান্না করা খাবার ফ্রিজে রাখার পর আবার বের করে গরম করে খাওয়া কতটা স্বাস্থ্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এতে শরীরে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা জানতে বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. রুদ্রজিৎ পাল ও পুষ্টিবিদ অরিজিৎ দের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
পুষ্টিগুণ কমতে পারে
ডা. পাল জানান, রান্না করা খাবার ফ্রিজে রেখে পরে গরম করে খাওয়ার পদ্ধতি এখন সারা বিশ্বেই প্রচলিত। তবে এতে খাবারের পুষ্টিগুণ অনেকটাই কমে যেতে পারে।
তিনি বলেন, ‘এতে আপাতদৃষ্টিতে কোনও সমস্যা না থাকলেও, খাবারের পুষ্টিগুণ অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়। খাবারের মধ্যে যে প্রোটিন থাকে, তা ভেঙে গিয়ে গুণ কিছুটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। খাবারে থাকা ভিটামিনের প্রভাব নষ্ট হতে পারে।’
ফ্রিজে রাখা খাবারে সংক্রমণের ঝুঁকি কতটা
ডা. পাল জানান, সঠিক তাপমাত্রায় ভালোভাবে প্যাক করে খাবার সংরক্ষণ করলে ফাঙ্গাস হওয়ার ঝুঁকি কমে। ফলে খাবার থেকে সংক্রমণের আশঙ্কাও অনেকটা কম থাকে।
তবে খাবার সংরক্ষণের পদ্ধতি সঠিক না হলে ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই রান্না করা খাবার ফ্রিজে রাখার ক্ষেত্রে তাপমাত্রা ও সংরক্ষণের নিয়ম মেনে চলা জরুরি।
বারবার গরম করলে কী হয়
পুষ্টিবিদ অরিজিৎ বলেন, ‘এতে খাবারের পুষ্টিগুণ অর্থাৎ ভিটামিন, প্রোটিন ভেঙে অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু স্বাদে কোনও পার্থক্য হয় না বলে বিষয়টাকে খুব একটা গুরুত্ব দিই না। রান্না করা খাবার গরম করতে গেলেই তা ওভারকুকড হয়ে যায়। এই কারণে আমরা বলি, খাবার ফ্রিজ থেকে বার করে খানিকক্ষণ ঘরের তাপমাত্রায় রেখে তারপর গরম করা উচিত। সরাসরি মাইক্রোওভেনে গরম করা আরও ক্ষতিকর।’
অর্থাৎ ফ্রিজ থেকে খাবার বের করেই সরাসরি গরম না করে কিছুক্ষণ স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখা ভালো। এরপর খাবার গরম করা উচিত।
বারবার গরম করা খাবার খেলে শরীরে কী হয়
সংরক্ষণের কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি কম থাকলেও ফ্রিজে রাখা খাবার নিয়মিত খাওয়া ভালো নয়। বিশেষ করে যাদের অম্বল, গ্যাস বা হজমের সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য এমন খাবার নিয়মিত খাওয়া একেবারেই ভালো নয়।
এ ধরনের খাবার খেলে হজমের সমস্যা ও শরীরে প্রদাহ হতে পারে। সময়ের সঙ্গে এই প্রদাহ গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
ডা. পাল বলেন, ‘ফ্রিজ় করে রাখা খাবার রি-হিট করার সময় অনেক ক্ষেত্রে কিছু ফ্রি ব়্যডিক্যাল জন্মতে পারে। যা দীর্ঘ দিন শরীরে গেলে প্রদাহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যার ফলে খাবারের পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়। তাই হজমের সমস্যার সঙ্গেই অ্যানিমিয়া, অস্টিওপোরেসিসের মতো রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।’
ফ্রিজে রাখা খাবার কতদিন খাওয়া নিরাপদ
ফ্রিজে রাখা খাবার কতদিন নিরাপদ থাকবে, তা নিয়ে ডা. পাল বলেন, ‘ফ্রোজ়েন ফুডের ক্ষেত্রে বিষয়টা আলাদা, সেখানে গায়েই লেখা থাকে কত দিন অবধি ওই খাবার খাওয়া নিরাপদ। যত বেশি দিন রান্না করা খাবার ফ্রিজ়ে থাকে, তত তার কেমিক্যাল কম্পোনেন্ট বদলাতে থাকে। একটা সময় পরে যে ভাবেই সংরক্ষণ হোক না কেন, ফাঙ্গাস গ্রো করেই।’
পুষ্টিবিদ অরিজিৎ বলেন, ‘সাধারণত রান্না করা খাবার ৬-৮ ঘণ্টা ফ্রিজ়ে রাখা নিরাপদ। বড়জোর ১২ ঘণ্টা। কিন্তু তার বেশি নয়।’
অর্থাৎ রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় ফ্রিজে রেখে খাওয়ার বদলে যতটা সম্ভব তাজা খাবার খাওয়াই ভালো।
কী করবেন
মাঝেমধ্যে ফ্রিজে রাখা খাবার খাওয়া ক্ষতিকর নয়। তবে এটিই যদি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়, তাহলে সমস্যা হতে পারে।
একই সঙ্গে তাজা ফল ও তাজা রান্না করা খাবার খাওয়াও জরুরি। এতে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ পায়।