বাংলাদেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত নারীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে © সংগৃহীত
বিশ্বজুড়ে নারীদের ক্যান্সারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হারের দিক থেকে স্তন ক্যান্সার সর্বোচ্চ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থার সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ২৪ লাখ নারী নতুন করে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। প্রায় ৬ লাখ ৯৪ হাজার এই মরণব্যাধিতে প্রাণ হারাচ্ছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি ১৪ সেকেন্ডে বিশ্বের কোথাও না কোথাও একজন নারী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মোট ক্যান্সার আক্রান্ত নারীদের মধ্যে এই হার প্রায় ১১ দশমিক ৮ শতাংশ। সাধারণত উন্নত বিশ্বে ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এই ঝুঁকি বেশি থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী নারীদের মধ্যেও স্তন ক্যানসারের বিস্তার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি কি
বাংলাদেশেও ক্যান্সারজনিত আক্রান্তের তালিকায় স্তন ক্যানসার এখন প্রথম স্থানে (১৬ দশমিক ৮ শতাংশ) অবস্থান করছে। দেশের সর্বশেষ চিকিৎসা প্রতিবেদন ও গ্লোবোক্যানের তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১২ থেকে ১৩ হাজার নারী নতুন করে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং সচেতনতা ও চিকিৎসার অভাবে তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক রোগীই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
উন্নত বিশ্বে আক্রান্তদের সুস্থতার হার প্রায় ৯০ শতাংশ হলেও, বাংলাদেশে উপযুক্ত স্ক্রিনিংয়ের অভাব, সামাজিক লজ্জা এবং সংকোচের কারণে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ রোগীই ক্যান্সারের তৃতীয় বা চতুর্থ ধাপে চিকিৎসকের কাছে আসেন। এর ফলে এ দেশে সুস্থতার হার মাত্র ৪০ থেকে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে।
চিকিৎসকদের মতে শুরুতে এ রোগের তেমন কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। পরে স্তনে নতুন গুটি, ত্বক বা স্তনের আকারে পরিবর্তন, নিপল থেকে অস্বাভাবিক নিঃসরণ কিংবা বগলের নিচে ফোলা দেখা দিতে পারে। তাই স্তনে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে তা অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১২ থেকে ১৩ হাজার নারী নতুন করে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং সচেতনতা ও চিকিৎসার অভাবে তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক রোগীই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। উন্নত বিশ্বে আক্রান্তদের সুস্থতার হার প্রায় ৯০ শতাংশ হলেও, বাংলাদেশে উপযুক্ত স্ক্রিনিংয়ের অভাব, সামাজিক লজ্জা এবং সংকোচের কারণে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ রোগীই ক্যান্সারের তৃতীয় বা চতুর্থ ধাপে চিকিৎসকের কাছে আসেন। এর ফলে এ দেশে সুস্থতার হার মাত্র ৪০ থেকে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে।
স্তন ক্যান্সারের লক্ষণ
স্তনে নতুন গুটি বা টিস্যুতে অস্বাভাবিক পুরুত্ব, স্তনে ব্যথা, ত্বকের রঙ বা গঠনে পরিবর্তন, স্তন ফুলে যাওয়া এবং স্তনের আকার বা আকৃতিতে হঠাৎ পরিবর্তন এ রোগের সম্ভাব্য লক্ষণ। এ ছাড়া নিপল থেকে দুধ ছাড়া অন্য ধরনের বা রক্তাক্ত নিঃসরণ, নিপল ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া, স্তনের ত্বকে খসখসে ভাব বা পরিবর্তন এবং বগলের নিচে গুটি বা ফোলা দেখা দিতে পারে। তবে এসব লক্ষণ দেখেই ক্যান্সার হয়েছে বলে ভয়ের কিছু নেই। তবু অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ধরন ও ঝুঁকির কারণ
স্তন ক্যান্সার প্রধানত নন-ইনভেসিভ ও ইনভেসিভ ধরনের। এর মধ্যে ইনভেসিভ ডাক্টাল কার্সিনোমা সবচেয়ে সাধারণ। ইনফ্ল্যামেটরি ব্রেস্ট ক্যানসার বিরল হলেও আক্রমণাত্মক ধরনের এবং মোট স্তন ক্যানসারের প্রায় ১ থেকে ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়। ট্রিপল-নেগেটিভ ব্রেস্ট ক্যানসার মোট স্তন ক্যানসারের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ।
বয়স বাড়া, ঘন স্তন টিস্যু, বিআরসিএ১ ও বিআরসিএ২-এর মতো জিনগত পরিবর্তন এবং ঘনিষ্ঠ নারী আত্মীয়ের স্তন ক্যান্সারের ইতিহাস ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অ্যালকোহল পান, পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম না করা এবং মেনোপজের পর নির্দিষ্ট হরমোন থেরাপিও ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে এসব ঝুঁকি থাকলেই ক্যানসার হবে এমন নয়।
কীভাবে শনাক্ত করা হয়
স্তন ক্যান্সার শনাক্ত করতে শারীরিক পরীক্ষার পাশাপাশি ম্যামোগ্রাম ও আল্ট্রাসাউন্ড করা হতে পারে। সন্দেহজনক কোনো অংশ পাওয়া গেলে বায়োপসির মাধ্যমে টিস্যুর নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এতে ক্যানসার আছে কি না এবং থাকলে এর ধরন নির্ধারণ করা যায়।
ক্যান্সারের স্টেজ
ক্যান্সার কতটা ছড়িয়েছে তার ভিত্তিতে স্তন ক্যান্সারকে ০ থেকে ৪ এই পাঁচটি স্টেজে ভাগ করা হয়। স্টেজ ০-তে ক্যান্সার কোষ নির্দিষ্ট টিস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকে। স্টেজ ১ ও ২-এ সাধারণত ছোট বা মাঝারি আকারের টিউমার থাকে এবং কিছু ক্ষেত্রে কাছাকাছি লিম্ফ নোডে ছড়ায়। স্টেজ ৩-এ ক্যান্সার আরও বেশি লিম্ফ নোড, বুকের দেয়াল বা স্তনের ত্বকে ছড়াতে পারে। স্টেজ ৪-এ ক্যান্সার দূরের লিম্ফ নোড বা অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।
আরও খবর: গ্যাস-বুকজ্বালা কমাতে খালি পেটে কুসুম গরম পানি খাচ্ছেন, উপকার পেতে কত গ্লাস খাবেন?
চিকিৎসা পদ্ধতি ও প্রতিরোধ
ক্যান্সারের ধরন ও স্টেজ অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী রেডিয়েশন থেরাপি, কেমোথেরাপি ও হরমোন থেরাপি দেওয়া হতে পারে। কখনো অস্ত্রোপচারের আগে টিউমার ছোট করতে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়।
সব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা বা কমানোর মাধ্যমে কিছু ঝুঁকি কমানো যেতে পারে।
দ্রুত ধরা পড়লে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি
আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ স্তন ক্যান্সারে পাঁচ বছরের আপেক্ষিক বেঁচে থাকার হার ৯৯ শতাংশ। আঞ্চলিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়লে তা ৮৬ শতাংশ এবং দূরবর্তী অঙ্গে ছড়িয়ে পড়লে ৩১ শতাংশ। সব স্টেজ মিলিয়ে হার ৯১ শতাংশ।
সুতরাং স্তনে নতুন গুটি, অস্বাভাবিক ফোলা, নিপল থেকে অস্বাভাবিক নিঃসরণ কিংবা স্তনের ত্বক ও আকারে পরিবর্তন দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে চিকিৎসার ফলাফল তুলনামূলক ভালো হওয়ার সুযোগ থাকে।