ড্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী
বক্তব্য রাখছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান © সংগৃহীত
স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের যে লক্ষ্য সরকার নিয়েছে, সেটি সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য চিকিৎসকদের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বলেছেন, এই বরাদ্দের মাধ্যমে দেশের মানুষ যাতে বাস্তব সুফল পায়, সে জন্য সরকারের পাশাপাশি চিকিৎসকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা যেন পেশাগত দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি না করে, সেটিও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি।
আজ শনিবার (৮ আগস্ট) জাতীয় সংসদের এলডি হলে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত চিকিৎসক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, দেশের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাব্যবস্থাকে আধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে সরকার প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্য খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ করেছে। তবে শুধু বাজেট ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে স্বাস্থ্য খাতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। সরকারি ও বেসরকারি সব চিকিৎসককে সরকারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
স্বাস্থ্য খাতে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যত দ্রুত সম্ভব ই-হেলথ চালু করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তবে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ ও হাসপাতালের শয্যা বাড়ালেই স্বাস্থ্য খাতের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হবে না। চিকিৎসকদের সেবার মানসিকতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে। চিকিৎসকরা যদি নিজেদের দায়িত্বের প্রতি নিবেদিত না থাকেন, তাহলে অবকাঠামোগত উন্নয়নও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যনীতির অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর’। রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মানুষের মধ্যে রোগের কারণ, প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন সম্পর্কে শুরু থেকেই সচেতনতা তৈরি করা গেলে অনেক রোগের প্রকোপ কমানো সম্ভব।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার আরও এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব স্বাস্থ্যকর্মী সাধারণ মানুষকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়ে সচেতন করবেন। স্বাস্থ্যকর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের নেতৃত্ব দিতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
চিকিৎসকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাজনীতি যেন বাধা না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত মানুষের জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে। তাই শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিভিন্ন পেশাজীবী নিজেদের মতাদর্শ অনুযায়ী রাজনৈতিকভাবে সচেতন বা সংগঠিত থাকবেন এটি অযৌক্তিক নয়।
রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা যেন পেশাগত দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি না করে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি। ড্যাবের চিকিৎসকদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, চিকিৎসকদের মূল দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত বিভিন্ন দাবির প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে দ্রুত পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ, সরকারি চাকরিতে চিকিৎসকদের বয়সসীমা ৩২ থেকে ৩৪ বছর করা, অবসরের বয়স ৬১ থেকে ৬৫ বছরে উন্নীত করা এবং চিকিৎসক ও রোগী উভয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সময়োপযোগী স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবি এসেছে।
এ ছাড়া উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য বিশেষ ভাতা ও প্রণোদনা, বেসরকারি খাতে কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য সুনির্দিষ্ট ও ন্যায্য বেতনকাঠামো এবং বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবিও চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, চিকিৎসকদের এসব দাবি পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। তবে একই সঙ্গে সরকারের বর্তমান বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় একটি দুর্বল অর্থনীতি, বিভাজিত প্রশাসন এবং ভঙ্গুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ চিকিৎসকদের কাছ থেকে আরও দায়িত্বশীল ও মানবিক ভূমিকা প্রত্যাশা করে। চিকিৎসাসেবায় রোগীর প্রতি মানবিক আচরণ, দায়িত্বশীলতা ও পেশাগত নিষ্ঠা নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকার ও চিকিৎসকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এমন একটি চিকিৎসাবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি মানুষকে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। উন্নত চিকিৎসার জন্য যেন দেশের মানুষকে বিদেশমুখী হতে না হয়, সেই লক্ষ্যেও সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।