‘হেপাটাইটিস জানুন, পরীক্ষা করুন, চিকিৎসা নিন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অতিথিরা © সংগৃহীত
দেশে বর্তমানে প্রায় এক কোটি মানুষ মারাত্মক হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত। হেপাটাইটিসজনিত অকালমৃত্যুর বৈশ্বিক তালিকায় শীর্ষ ১০টি দেশের একটি বাংলাদেশ। এমন উদ্বেগজনক বাস্তবতায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিস নির্মূলের লক্ষ্য অর্জনে জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক (এনআইডি) সর্বজনীন স্ক্রিনিং, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, টিকা নিশ্চিতকরণ এবং আধুনিক চিকিৎসা সহজলভ্য করার তাগিদ দিয়েছেন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে টাইমস্ মিডিয়া ভবনে সমকাল কার্যালয়ে আয়োজিত ‘হেপাটাইটিস জানুন, পরীক্ষা করুন, চিকিৎসা নিন’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন। বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস ২০২৬ উপলক্ষে অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য স্টাডি অব লিভার ডিজিজেস বাংলাদেশ (এএসএলডিবি), পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি ও সমকাল যৌথভাবে এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী।
বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে এএসএলডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বারডেম জেনারেল হাসপাতালের লিভার ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. গোলাম আযম বলেন, বিশ্বজুড়ে হেপাটাইটিস বি ও সি-জনিত লিভার সিরোসিস এবং ক্যান্সারে প্রতিবছর ১০ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হলেও রোগ দুটি শতভাগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসাযোগ্য।
সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) লিভার বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. সাইফুল ইসলাম এলিন জানান, ২০০৩ সালে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) হেপাটাইটিস বি যুক্ত হওয়ার পর সংক্রমণ ৯.৭% থেকে ৫.১%-এ নেমে এলেও এখনও প্রায় ৮৫ লাখ মানুষ হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত।
তিনি আরও বলেন, স্পর্শ বা পাশাপাশি খেলে এই রোগ ছড়ায় না। অথচ সামাজিক বিভ্রান্তি ও তথ্যের ঘাটতির কারণে অনেকেই বৈষম্যের শিকার হন। বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি পজিটিভ ব্যক্তিদের চাকরির জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা বৈজ্ঞানিকভাবে একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের লিভার বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. এ বি এম শাকিল গনি জানান, সন্তান জন্মদানে সক্ষম দেশের প্রায় ১৮ লাখ নারী হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত, যাদের অধিকাংশেরই এ বিষয়ে কোনো ধারণা নেই। মা থেকে শিশুতে সংক্রমণ রোধে সকল অন্তঃসত্ত্বা নারীর পরীক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য দিয়ে জানান, ১৯-২০ বছর বয়সীদের মধ্যে টিকা নেওয়ার পরও পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে মাত্র ২৮% মানুষের এবং প্রতি ২০০ জনে একজন হেপাটাইটিস বি পজিটিভ। এছাড়া হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের ৭৬.৬% হেপাটাইটিস এ-তে আক্রান্ত হওয়ায়, হেপাটাইটিস এ-র টিকাকেও জাতীয় কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান তিনি।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের লিভার বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. আবদুল্লাহ আল ফারুক এবং অর্থ সম্পাদক ডা. মো. শাহেদ আশরাফ সেতু উল্লেখ করেন, হেপাটাইটিস বি-র আজীবন চিকিৎসা ও জটিলতার ব্যয় বহু পরিবারকে নিঃস্ব করে দেয়। অথচ সচেতনতা, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, জীবাণুমুক্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং একবার ব্যবহারযোগ্য সিরিঞ্জ নিশ্চিত করতে পারলে এই বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি থেকে বাঁচা সম্ভব।
পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসির জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক মো. আহসানুর রহমান জানান, দেশে এখন মানসম্মত টিকা উৎপাদন হলেও ২০০৫ সালের আগে জন্মগ্রহণ করা বিপুল জনগোষ্ঠী টিকার সুরক্ষার বাইরে রয়েছে। তাই প্রাপ্তবয়স্কদের দ্রুত পরীক্ষার আওতায় এনে ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করা দরকার।
বৈঠকের সমাপনীতে এএসএলডিবির সভাপতি ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম মিসর ও তাইওয়ানের সফলতার উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, হেপাটাইটিস বি ও সি-র প্রয়োজনীয় আধুনিক চিকিৎসা ও ওষুধ এখন দেশেই সবচেয়ে সুলভ মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে। এনআইডিভিত্তিক স্ক্রিনিং চালু করে সাধারণ মানুষকে পরীক্ষার আওতায় আনা গেলে ২০৩০ সালের আগেই বাংলাদেশকে হেপাটাইটিস মুক্ত করা সম্ভব।