জটিল আইন, দাতা সংকট ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব
রোগীরা বিদেশমুখী
কিডনি ফাউন্ডেশনের সেমিনারে অতিথিরা © সংগৃহীত
দেশে প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার মানুষের কিডনি বিকল হচ্ছে, যার মধ্যে অন্তত ১০ হাজার রোগীর জরুরি ভিত্তিতে কিডনি প্রতিস্থাপন (ট্রান্সপ্লান্ট) প্রয়োজন। তবে আইনি জটিলতা, দাতা সংকট এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাবে দেশে বছরে গড়ে মাত্র ২৫০ জনের কিডনি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে প্রতি বছর ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ রোগী বিপুল অঙ্কের টাকা খরচ করে ভারত, থাইল্যান্ড কিংবা সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমাচ্ছেন।
আজ সোমবার (২৯ জুন) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘৬ষ্ঠ বাংলাদেশ কোরিয়া ফ্রেন্ডশিপ কনফারেন্স’-এর এক সেমিনারে দেশের কিডনি চিকিৎসার এই ভয়াবহ চিত্র ও সমস্যার কথা তুলে ধরেন দেশী-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে ১৯৯৯ সালের ‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন’ ২০১৮ সালে সংশোধন করা হলেও তা এখনো যুগের চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি সীমাবদ্ধ। বর্তমান আইন অনুযায়ী, কেবল ২৩ জন নির্দিষ্ট নিকটাত্মীয়ের বাইরে অন্য কেউ চাইলেও স্বেচ্ছায় কোনো রোগীকে কিডনি দান করতে পারেন না।
অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে আত্মীয়তার সম্পর্ক না থাকলেও আইনি প্রক্রিয়া মেনে কিডনি দানের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে এই আইনি কড়াকড়ির কারণে শত শত রোগী তীব্র দাতা সংকটে ভুগছেন এবং চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিদ্যমান আইন আরও কিছুটা শিথিল বা সংশোধন করা হলে দেশেই এই বিপুল সংখ্যক রোগীর প্রতিস্থাপন সম্ভব।
সেমিনারে জানানো হয়, উন্নত বিশ্বে মোট কিডনি প্রতিস্থাপনের ৭০ শতাংশই সম্পন্ন হয় মরণোত্তর (ক্যাডাভেরিক) কিডনি দাতার মাধ্যমে। জীবিত নিকটাত্মীয়ের কাছ থেকে কিডনি নিলে দাতার ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে যায়, তাই মরণোত্তর অঙ্গদানই সেখানে প্রধান বিকল্প। উন্নত দেশগুলোতে ‘ব্রেইন ডেথ’ হওয়া রোগীদের অঙ্গ সংরক্ষণের সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো, বিশ্বমানের হাসপাতাল সুবিধা এবং মৃত্যুর আগে অঙ্গদানের অঙ্গীকার করার ব্যাপক সামাজিক প্রচলন রয়েছে।
দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশে মরণোত্তর প্রতিস্থাপনের হার এখনও খুবই সামান্য। দেশে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ কিডনি বিকল হয়ে মারা গেলেও আইনি জটিলতা ও সচেতনতার অভাবে মরণোত্তর অঙ্গদান বা ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্ল্যান্টের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৮৫ কোটিরও বেশি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত, যার মধ্যে ৭৫ কোটি রোগীই জানেন না যে তাদের কিডনি নীরবে বিকল হচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০৪০ সালের মধ্যে ৫০ লাখের বেশি কিডনি বিকল রোগী চিকিৎসার অভাবে মারা যাবেন। প্রতিবছর ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ আকস্মিক কিডনি বিকলে আক্রান্ত হন, যার ৮৫ শতাংশই বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের মানুষ।
সেমিনারে কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন উর রশিদ, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন রুবেল, কোরিয়ান কিডনি বিশেষজ্ঞ ডা. কুরি এন ও অস্ট্রেলিয়ান বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জেরিমি চ্যাপম্যান উপস্থিত ছিলেন। তারা দেশের কিডনি রোগীদের জীবন বাঁচাতে দ্রুত আইনি সংস্কার ও মরণোত্তর অঙ্গদানে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জোর দাবি জানান।