প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে এই কর্মশালা আয়োজিত হয় © সংগৃহীত
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প। আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব বা পেটেন্ট সুবিধার মেয়াদ শেষ হলে দেশের এই সম্ভাবনাময় খাতটি তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এখনই গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) খাতে বিনিয়োগ না বাড়ালে ওষুধের আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা তো বটেই, অভ্যন্তরীণ বাজারেও ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
আজ বুধবার (১৩ মে) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত ‘এলডিসি উত্তরণ প্রেক্ষাপটে ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক এক কর্মশালায় এসব উদ্বেগজনক তথ্য উঠে আসে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট যৌথভাবে এই কর্মশালার আয়োজন করে।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ। তিনি বলেন, বর্তমানে পেটেন্ট ছাড় সুবিধার কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক লাইসেন্স ছাড়াই সাশ্রয়ী মূল্যে জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন করতে পারছে। কিন্তু উত্তরণ পরবর্তী সময়ে নতুন ওষুধের জন্য আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে চড়া দামে লাইসেন্স ফি দিতে হবে। এতে উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে ভোক্তা পর্যায়ে। বিশেষ করে ক্যানসারসহ জটিল ও নতুন প্রজন্মের জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
আরও পড়ুন: তত্ত্বীয় গবেষণাই সার, পেটেন্ট শূন্যতায় দেশীয় গবেষকরা
কর্মশালায় বিশেষজ্ঞরা জানান, এলডিসি পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স মানা এবং বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা বাধ্যতামূলক হবে। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেরই এখনো এই সক্ষমতা তৈরি হয়নি। বিদেশে গিয়ে এসব পরীক্ষা করাতে হলে বাড়তি অর্থ খরচ হবে। এছাড়া মুন্সিগঞ্জের এপিআই শিল্পপার্ক পুরোপুরি কার্যকর না হওয়া এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘ম্যাচিউরিটি লেভেল-৩’ অর্জনে পিছিয়ে থাকাকেও বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, এলডিসি সুবিধা হারালে পেটেন্ট ছাড় ও কমপ্লায়েন্স ব্যয়ের কারণে ওষুধ শিল্প চ্যালেঞ্জে পড়বে। এ সময় ইন্ডাস্ট্রিকে ‘প্রাইস মেকার’ না হয়ে ‘প্রাইস টেকার’ হতে হবে। তিনি গবেষণা, বায়োটেকনোলজি ও ভ্যাকসিন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে সব ধরনের প্রভাবমুক্ত রাখার তাগিদ দেন।
বাংলাদেশ এপিআই অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএআইএমএ) সভাপতি এস এম সাইফুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ২০১৮ সালে নীতিমালা হলেও তার বাস্তবায়ন অত্যন্ত ধীর। সরকারি নীতিমালার কার্যকর প্রয়োগ ছাড়া কাঁচামাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া সম্ভব নয়।
বক্তারা পরামর্শ দেন, এলডিসি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে গবেষণা সহযোগিতা বৃদ্ধি, বিশেষ গবেষণা তহবিল গঠন এবং নিউক্লিয়ার মেডিসিন খাতে বৈচিত্র্য আনা জরুরি। সঠিক সময়ে প্রস্তুতি না নিলে দেশের রপ্তানি সক্ষমতা কমার পাশাপাশি জাতীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা বলয়ও হুমকির মুখে পড়তে পারে।