প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত
বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তির দখলে। বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যখাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে, যা চিকিৎসা পদ্ধতিতে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নত এআই মডেল জরুরি রোগ শনাক্ত করতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের চেয়েও বেশি পারদর্শী। সাইন্স জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় ৭৬টি জরুরি রোগীর কেস বিশ্লেষণে এআইয়ের সঠিক নির্ণয়ের হার ছিল প্রায় ৬৭ শতাংশ, যেখানে চিকিৎসকদের ছিল ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ।
গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে স্বাস্থ্যখাতে এআই বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে, এবং এটি বার্ষিক প্রায় ৩৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগ নির্ণয়ের নির্ভুলতা বৃদ্ধি, চিকিৎসা ব্যয় কমানো এবং রোগীর সন্তুষ্টি বাড়ানোর ক্ষেত্রে এআই ইতোমধ্যে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এআই ব্যবহারের মাধ্যমে ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত রোগ নির্ণয়ের উন্নতি, ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ খরচ কমানো এবং রোগীসেবায় অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে।
স্বাস্থ্যখাতে নতুন দিগন্ত
স্বাস্থ্যখাতে এআইয়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে ডায়াগনস্টিক ইমেজিং বা রোগ নির্ণয়ে। এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, এমআরআই বিশ্লেষণে এআই এখন অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সমান বা তার চেয়েও বেশি নির্ভুলতা দেখাচ্ছে। নিউমোনিয়া, ফুসফুসের সমস্যা কিংবা স্তন ক্যান্সার শনাক্তে এই প্রযুক্তি দ্রুত ও নির্ভুল ফল দিচ্ছে।
ফলে জরুরি রোগ শনাক্তে সময় কমে যাচ্ছে এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে।
ওষুধ আবিষ্কারে গতি
ঐতিহ্যগতভাবে একটি নতুন ওষুধ আবিষ্কারে ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লাগলেও এআই প্রযুক্তি সেই সময় অনেকাংশেই কমিয়ে এনেছে। নতুন ওষুধের সম্ভাব্য উপাদান শনাক্ত, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ডিজাইন এবং বিদ্যমান ওষুধের নতুন ব্যবহার খুঁজে বের করতে বড় ভূমিকা রাখছে। এতে গবেষণা খরচও কমছে এবং দ্রুত চিকিৎসা সমাধান পাওয়া যাচ্ছে।
ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা
এআই রোগীর জেনেটিক তথ্য, জীবনযাপন ও চিকিৎসা ইতিহাস বিশ্লেষণ করে ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করতে সক্ষম। এতে চিকিৎসার সাফল্যের হার বাড়ছে এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমছে। ক্যান্সার চিকিৎসায় এআই ভিত্তিক সিদ্ধান্ত সহায়ক প্রযুক্তি ইতোমধ্যে উন্নত চিকিৎসা পরিকল্পনায় সহায়তা করছে।
এআই চালিত সিস্টেম রোগীর শারীরিক তথ্য বিশ্লেষণ করে আগেভাগেই গুরুতর অবস্থার পূর্বাভাস দিতে পারে। যেমন হৃদরোগ, সংক্রমণ বা সেপসিসের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি আগে থেকেই শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।এতে হাসপাতালের জরুরি পরিস্থিতি কমছে এবং মৃত্যুহারও হ্রাস পাচ্ছে।
চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি
যদিও সম্ভাবনা ব্যাপক, তবুও স্বাস্থ্যখাতে এআই ব্যবহারে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
এখানে রোগীর তথ্য সুরক্ষা একটি বড় উদ্বেগের কারণ। এ ছাড়া অনুমোদন পেতে সময় ও ব্যয় বেশি লাগে বেশি। এর সবচেয়ে বড় সমস্যা বা চ্যালেঞ্জ হলো-প্রযুক্তি সংযুক্তি সমস্যা। বিদ্যমান সিস্টেমের সঙ্গে এআই একীভূত করা কঠিন। অনেকসময় এটি ভুল হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই চিকিৎসকদের প্রতিস্থাপন করবে না, বরং সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। এটি চিকিৎসকদের সময় বাঁচাবে এবং জটিল সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে। এখানে চিকিৎসকদের বিকল্প হবে না বরং সহযোগী হয়ে কাজ করবে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০৩০ সালের মধ্যে অধিকাংশ হাসপাতালেই এআই প্রযুক্তির ব্যবহার হবে। রোগ নির্ণয়, ওষুধ আবিষ্কার এবং রোগীদের সেবায় এআই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।