ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ করার অভ্যাস © এই নির্মিত ছবি
সকালে ঘুম থেকে উঠেই দাঁত ব্রাশ করে নাশতা করবেন, নাকি নাশতা সেরে তারপর ব্রাশ করা ভালো? এ নিয়ে আমাদের অনেকের মনেই দ্বিধা কাজ করে। কেউ সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ করেন তো কেউ নাশতা শেষে দাঁত ব্রাশ করেন। একদল মনে করেন, সকালে ঘুম ভাঙার পরপরই ব্রাশ করলে রাতে মুখে জমা হওয়া ব্যাকটেরিয়া ও প্লাক পরিষ্কার হয়ে যায়। আবার অন্য দলের মতে, নাশতায় যদি টক জাতীয় খাবার থাকে, তবে খাওয়ার পরপরই ব্রাশ করলে দাঁতের ওপরের শক্ত আবরণ ‘এনামেল’ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাহলে কোনটা সঠিক, এ বিষয়ে বিজ্ঞানের কোনো ব্যাখ্যা আছে কী? ডেন্টাল বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য সংস্থার মতামত বিশ্লেষণ করে দেখে নেওয়া যাক কোনটি তুলনামূলক উপকারী।
নাশতার আগে ব্রাশ করা কেন ভালো:
রাতে ঘুমানোর সময় আমাদের মুখে লালা তৈরির পরিমাণ কমে যায়। লালা না থাকায় মুখে ব্যাকটেরিয়া বেড়ে যায় এবং দাঁতের গায়ে ‘প্লাক’ নামক অদৃশ্য আস্তরণ তৈরি হয়। সকালে উঠে ব্রাশ করলে এই প্লাক ও ব্যাকটেরিয়া দূর হয় এবং মুখে সতেজতা আসে।
দাঁতের সুরক্ষা আবরণ: যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের (এডিএ) মতে, নাশতার আগে ফ্লুরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে ব্রাশ করলে দাঁতের ওপর একটি প্রতিরক্ষামূলক আবরণ তৈরি হয়।
অ্যাসিড থেকে রক্ষা: কমলার রস, ফল বা টক জাতীয় নাশতা খাওয়ার আগেই যদি ফ্লুরাইড দাঁতের সংস্পর্শে আসে, তবে অম্লীয় বা অ্যাসিডিক খাবারের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দাঁত তুলনামূলক বেশি সুরক্ষিত থাকে।
নাশতার পরপরই ব্রাশ করলে কী সমস্যা?
কমলা, লেবু, ফলের রস বা কোমল পানীয়ের মতো অম্লীয় খাবার খাওয়ার পর দাঁতের ওপরের এনামেল সাময়িকভাবে কিছুটা নরম ও দুর্বল হয়ে পড়ে। ঠিক ওই মুহূর্তেই শক্ত ব্রাশ দিয়ে দাঁত ঘষলে এনামেল ক্ষয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
আমেরিকান জার্নাল অব ডেন্টিস্ট্রি-তে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, অম্লীয় খাবার বা পানীয় গ্রহণের আগেই ব্রাশ করা হলে দাঁতের ক্ষয় কম হয়।
২০২৪ সালে কারিজ রিসার্চ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনামূলক গবেষণায় ১৭টি বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে প্রতিদিনের স্বাভাবিক ফ্লুরাইড টুথপেস্ট ব্যবহারে খাওয়ার পরপর ব্রাশ করলেও এনামেল ক্ষয়ের সুস্পষ্ট ঝুঁকি সবসময় পাওয়া যায়নি। তবে চিকিৎসকদের মতে, ঝুঁকি এড়াতে খাওয়ার পরপরই জোরে ব্রাশ না করে পানি দিয়ে কুলকুচি করা সবচেয়ে নিরাপদ অভ্যাস।
মেসওয়াক ও পরিচ্ছন্নতা সংক্রান্ত ধারণা
ইসলামে মুখ ও দাঁতের পরিচ্ছন্নতাকে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে হজরত হুযাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে মহানবী (সা:) রাতে ঘুম থেকে উঠলে মেসওয়াক দিয়ে মুখ পরিষ্কার করতেন। ঘুমানোর আগে ও ঘুম থেকে উঠে মুখ পরিষ্কার রাখা একটি অত্যন্ত ভালো ও পরিচ্ছন্ন অভ্যাস।
দাঁত সুস্থ রাখতে ডেন্টিস্টদের মূল পরামর্শ
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থার (এনএইচএস) মতে, ব্রাশ করার নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে নিয়মিত ও সঠিক উপায়ে দাঁত পরিষ্কার রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দাঁত ভালো রাখতে কিছু অভ্যাস মেনে চলতে পারেন:
দিনে দুবার ব্রাশ: প্রতিদিন অন্তত দুই মিনিট করে দুবার ফ্লুরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে ব্রাশ করুন। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগের ব্রাশটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নরম ব্রাশ ব্যবহার: শক্ত ব্রাশ দিয়ে জোরে জোরে দাঁত ঘষবেন না, এতে মাড়ি ও এনামেলের ক্ষতি হয়। নরম ব্রিসলের টুথব্রাশ ব্যবহার করুন।
ফ্লসিং ও কুলি: ব্রাশের পাশাপাশি প্রতিদিন অন্তত একবার ‘ডেন্টাল ফ্লস’ দিয়ে দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা খাবার পরিষ্কার করুন। যেকোনো খাবার খাওয়ার পর পানি দিয়ে কুলি করার অভ্যাস বানান।
আপনি যদি নাশতার পরই ব্রাশ করতে অভ্যস্ত হন, তবে অম্লীয় খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণ পর ব্রাশ করুন। অথবা খাওয়ার পরপরই পানি দিয়ে ভালো করে কুলি করে নিতে পারেন।
সকালে ঘুম থেকে উঠে নাশতার আগেই ব্রাশ করা একটি ভালো অভ্যাস। আর যদি নাশতার পরে ব্রাশ করতেই হয়, তবে রাতে ঘুমানোর আগে ব্রাশ করা ভালো।