অন্ধকারে ভূত আছে ভেবে ভয়ে অনেকে আতঙ্কিত থাকেন © সংগৃহীত
রাতের অন্ধকারে হঠাৎ কোনো শব্দ, জানালার পাশে অচেনা ছায়া কিংবা নির্জন ঘরে একা থাকার অভিজ্ঞতা—এমন পরিস্থিতিতে অনেকেরই গা ছমছম করে ওঠে। বুক ধড়ফড় করে, হাত-পা কাঁপতে থাকে, কখনো ভয়ে মুখ দিয়ে কথাও বের হয় না। ভূতে বিশ্বাস করেন কি না, সেটি আলাদা বিষয়। তবে ভূতের ভয় মানুষের মনে যে আতঙ্ক তৈরি করে, তার প্রভাব পড়ে শরীরেও।
ভূত বা অতিপ্রাকৃত কোনো সত্তার প্রতি তীব্র ও অস্বাভাবিক ভয়কে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ফ্যাসমোফোবিয়া’। অন্ধকার ঘর, নির্জন জায়গা, পুরোনো বাড়ি কিংবা ভূতের গল্প ও সিনেমা এই ভয়ের কারণ হতে পারে। তবে সাধারণ ভয় আর ফোবিয়া এক নয়। ভয় যখন দৈনন্দিন জীবনকে বাধাগ্রস্ত করে, তখন সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ভয় পেলে শরীরে কী ঘটে?
ভয় পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ক সম্ভাব্য বিপদের সংকেত পেয়ে শরীরকে সতর্ক করে। এ সময় শরীরের সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম সক্রিয় হয়ে ওঠে। শুরু হয় ‘ফাইট, ফ্লাইট অ্যান্ড ফ্রিজ’ প্রতিক্রিয়া। অর্থাৎ বিপদ মনে হলে কেউ মোকাবিলা করতে চান, কেউ পালিয়ে যেতে চান, আবার কেউ ভয়ে স্থির হয়ে যান।
মনোরোগ চিকিৎসক সৌভিক চক্রবর্তীর মতে, ভূতের ভয় কিংবা অন্য কোনো তীব্র ভয়ের ক্ষেত্রে শরীরে প্রায় একই ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এ সময় হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, বুক ধড়ফড় করা, হাত-পা কাঁপা, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, গলা শুকিয়ে যাওয়া এবং কথা বলতে সমস্যা হতে পারে।
কারও বমি বমি ভাব, পেটে মোচড় কিংবা হজমের সমস্যাও দেখা দেয়। তীব্র ভয়ের সময় শরীরে স্ট্রেস হরমোনের প্রভাব বেড়ে যায়। ফলে শরীর গরম লাগা বা ঠান্ডা অনুভব করার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘদিন ভয় পেলে ঘুমেও প্রভাব পড়ে?
যাদের ভূতের ভয় বেশি, তাদের অনেকেই রাতে একা ঘুমাতে পারেন না। বারবার দরজা-জানালা পরীক্ষা করেন। ঘরের কোণে রাখা কাপড় কিংবা আসবাবের ছায়াকেও সন্দেহজনক মনে হয়। এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে ঘুমের সমস্যা, ক্লান্তি, বিরক্তি ও মনোযোগের অভাব দেখা দিতে পারে। এতে পড়াশোনা, চাকরি ও প্রতিদিনের কাজেও প্রভাব পড়ে।
ঘুম ভেঙে কাউকে দেখার অনুভূতি যেমন
অনেকেই ঘুম ভাঙার পর ঘরের মধ্যে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন বলে অনুভব করেন। কেউ কেউ মনে করেন, বুকের ওপর ভারী কিছু চেপে বসেছে। অথচ হাত-পা নাড়াতে বা চিৎকার করতে পারেন না।
আরও খবর: ভয় পেলেই কি ফোবিয়া? বুঝবেন যেভাবে
এ ধরনের অভিজ্ঞতার কারণ হতে পারে ‘স্লিপ প্যারালাইসিস’ বা ঘুমের মধ্যে সাময়িক পক্ষাঘাত। ঘুম ও জেগে ওঠার মাঝামাঝি সময়ে মস্তিষ্ক সচেতন হয়ে উঠলেও শরীরের পেশি কিছুক্ষণের জন্য নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে। তখন ঘরে অদৃশ্য কারও উপস্থিতি অনুভব করার মতো অভিজ্ঞতাও হতে পারে। এটি ঘুমের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত, ভূতের উপস্থিতির কোনো প্রমাণ নয়।
ভয় কমাবেন যেভাবে
ভয় কমাতে কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করা জরুরি। ঘুমানোর আগে ভয়ের সিনেমা দেখা ও ভূতের গল্প পড়া বন্ধ করা, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস করা, ভয় পেলে ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়া এবং নিজেকে শান্ত রাখা, অন্ধকারে একা থাকতে ভয় লাগলে হালকা আলো জ্বালিয়ে রাখা, ধীরে ধীরে ভয় কাটানোর চেষ্টা করা, কোনো শব্দ বা ছায়া দেখলে আতঙ্কিত না হয়ে আগে তার স্বাভাবিক কারণ খুঁজে দেখা।
এভাবে ভয় অনেকটা কমাননো সম্ভব। তবে ভয় যদি এতটাই বেড়ে যায় যে একা থাকা, ঘুমানো কিংবা দৈনন্দিন কাজকর্মে সমস্যা হচ্ছে, তাহলে মনোবিদ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি ও এক্সপোজার থেরাপির মাধ্যমে এ ধরনের ভয় কমানো সম্ভব। ভূত আছে কি নেই, সেই বিতর্কের বাইরে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, ভয় কেবল মনের অনুভূতি নয়, এর প্রভাব শরীরেও পড়ে। (সূত্র: আনন্দবাজার)