প্রতীকী ছবি © টিডিসি ফটো
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে অনেক কম বয়সী কিশোরীর মধ্যে সময়ের আগেই পিরিয়ড শুরু হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, মেয়েদের মাসিক চক্র নিয়ন্ত্রিত হয় মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস, পিটুইটারি ও ওভারি এই তিন গ্রন্থির হরমোনের সমন্বয়ে। এসব হরমোনের নিঃসরণ স্বাভাবিক থাকলে মাসিকও স্বাভাবিক বয়সে শুরু হয়। কিন্তু এই ব্যবস্থার কোথাও ভারসাম্য নষ্ট হলে অল্প বয়সেই মাসিক শুরু হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় রোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে, মেয়েদের ১২ বছরের আগেই মাসিক শুরু হলে তাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় প্রিম্যাচিউর বা প্রিকশাস পিউবার্টি বলা হয়। যার বাংলা হলো সময়ের আগেই বয়ঃসন্ধি। তবে ৯ থেকে ১০ বছর বয়সে মাসিক শুরু হওয়া কিছু ক্ষেত্রে স্বাভাবিক শারীরিক বিকাশের মধ্যেও পড়তে পারে।
গবেষণায় এখন পর্যন্ত এর নির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি। তবে এ ব্যাপারে কিছু 'সম্ভাব্য' কারণ ব্যাখ্যা করেছেন গবেষকরা।
ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের তথ্যমতে, মেয়েদের মাসিক চক্র মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস, পিটুইটারি ও ওভারি থেকে নিঃসরিত হরমোনের সমন্বয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়। এসব হরমোনের নিঃসরণ স্বাভাবিক থাকলে মাসিকও স্বাভাবিক সময়ে শুরু হয়। তবে হাইপোথ্যালামাস, পিটুইটারি বা ওভারিতে টিউমার হলে কিংবা কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি ঘটলে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে অল্প বয়সে মাসিক শুরু হতে পারে। এছাড়া মস্তিষ্কের সংক্রমণ, এনসেফালাইটিস, মাথা বা মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত, রেডিয়েশন, হাইপোথাইরয়েডিজম, ওভারির টিউমার বা সিস্ট, কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা, জন্মগত হাইড্রোসেফালাস বা খিঁচুনির ইতিহাস থাকলেও সময়ের আগে মাসিক হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, হাইপোথ্যালামাস, পিটুইটারি বা ওভারিতে টিউমার, মস্তিষ্কের সংক্রমণ, এনসেফালাইটিস, মাথা বা মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত, হাইপোথাইরয়েডিজম, ওভারিতে সিস্ট বা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের কিছু সমস্যার কারণে সময়ের আগেই মাসিক হতে পারে। তবে অল্প বয়সে মাসিক হওয়া মানেই যে শিশুর বড় কোনো রোগ আছে—তা নয়। সঠিক কারণ নির্ণয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা জরুরি।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন সময়ের আগে মাসিক শুরু হওয়ার একটি বড় কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের এপিডেমিওলজি ও বায়োস্ট্যাটিস্টিকস বিভাগের এক গবেষণা অনুযায়ী, অতিরিক্ত ওজন বা স্থূল মেয়েদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ওজনের মেয়েদের তুলনায় আগে মাসিক হওয়ার প্রবণতা বেশি। শরীরে ফ্যাট বেশি হলে এস্ট্রোজেন ও ‘লেপটিন’ হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়, যা বয়ঃসন্ধির আগেই মাসিক হতে পারে।
চিকিৎসকরা আরও জানান, বর্তমান সময়ে শিশুদের শারীরিক কার্যকলাপ কমে যাওয়া, মোবাইল ও কম্পিউটারনির্ভর জীবনযাপন এবং ট্রান্সফ্যাট ও জাঙ্কফুড খাওয়ার প্রবণতা ওজন বাড়াচ্ছে। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত মানসিক চাপও হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলছে।
এ ছাড়া জাতিগত বৈশিষ্ট্য মাসিক কখন শুরু হবে তার উপর বড় প্রভাব রাখে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে আফ্রিকান, আমেরিকান ও হিস্পানিক বংশোদ্ভূত মেয়েদের তুলনামূলক আগে মাসিক হয়। এরপরই রয়েছে এশীয় অঞ্চলের মেয়েদের অর্থাৎ বাদামী বর্ণের মেয়েদের অবস্থান। ককেশীয়রা অর্থাৎ যারা শ্বেতাঙ্গ তাদের মাসিক তুলনামূলক দেরিতে শুরু হয়। আবার বিরল জেনেটিক রোগ ম্যাককিউন-অ্যালব্রাইট সিনড্রোম বা অ্যাড্রিনাল হাইপারপ্লাসিয়া নামে জেনেটিক সমস্যা থাকলে হরমোনে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়, এতে মাসিক আগে শুরু হয়ে যায়।
আবার যেসব পরিবারের মেয়েদের বিশেষ করে মায়ের যদি বয়সের আগেই মাসিক শুরুর ইতিহাস থাকে, তাদের পরবর্তী প্রজন্মের মেয়েদের ক্ষেত্রেও এমনটা হতে পারে। আর্থ-সামাজিক অবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি আর জীবনযাত্রাও এক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাবক।
সময়ের আগে মাসিক: কী হয়, কেন সতর্কতা জরুরি
১০ বছরের আগে মাসিক শুরু হলে মেয়েদের ভবিষ্যতে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, এতে পিসিওএস, এন্ডোমেট্রিওসিস, টাইপ–২ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক, হাড়ক্ষয়, জরায়ু টিউমার এবং স্তন ও জরায়ু ক্যান্সারের আশঙ্কা বেশি থাকে। ১০ বছরের আগে মাসিক হলে টাইপ–২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
সময়পূর্ব মাসিকের ফলে সারা জীবনে ডিম্বস্ফোটনের সংখ্যা বেড়ে যায়, এতে দীর্ঘদিন শরীরে এস্ট্রোজেন নিঃসরণ চলতে থাকে, যা ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। বিপরীতে, সময়মতো মাসিক হলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি ৪ থেকে ৮ শতাংশ কমে।
করণীয়
বয়সের আগেই মাসিক হওয়া মানেই যে বড় রোগ এটিও নয়। এতে আতংকিত না হয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। শৈশব থেকেই সুষম খাবার, খেলাধুলা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করতে হবে। এস্ট্রোজেনযুক্ত প্রসাধনী ও ওষুধ এড়িয়ে চলা জরুরি।