করোনা: ল্যাবে নমুনা পৌঁছানোর আগেই নেগেটিভ রিপোর্ট!

২১ আগস্ট ২০২০, ১২:১৯ PM

© বিবিসি

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ চীনের উহান থেকে যখন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল, এরকম অবস্থায় বাংলাদেশে গত ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে করোনাভাইরাস শনাক্তকরণের নমুনা পরীক্ষা শুরু হয়েছিল। এরপর ছয়মাস পার হয়েছে। কিন্তু শুরুর দিকে পরীক্ষা নিয়ে যেসব অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেরকম অভিযোগ এখনো রয়েছে।

ঢাকার গুলশানের একজন বাসিন্দা তার স্ত্রী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন কিনা জানতে বেসরকারি একটি নামি প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। বাড়ি থেকে নমুনা সংগ্রহ করার জন্য একটি মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করার পরের দিন নমুনা সংগ্রহের জন্য একজন আসেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি বলছেন, ‘বিকেল পাঁচটার দিকে এসে বাসা থেকে নমুনা নিয়ে গেল। ঠিক সাড়ে ছয়টায় নেগেটিভ রিপোর্টের একটা মেসেজ এলো। আমি বেশ খুশি হয়ে আমার স্ত্রীর কাছে গেলাম। সে জানালো ওরা বলেছিল রিপোর্ট ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা লাগবে।’

এর পরের ঘটনা তিনি যা বর্ণনা করলেন সেটি হল, নমুনা সংগ্রহকারী ল্যাব পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই তার কাছে রিপোর্টের ফল চলে এসেছে। ঘটনা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রী বিষয়টা আমাকে বলার পর আমি হাসপাতালের কল সেন্টারে ফোন করে বিষয়টা জানতে চাইলাম। আমাকে জানানো হল কোভিড-১৯ পরীক্ষাকে তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমার তবুও সন্দেহ হল। তখন আমি নমুনা সংগ্রহকারীকে ফোন দিয়ে জানলাম সে নমুনা নিয়ে এখনো ল্যাবে পৌঁছায়নি।’ তিনি প্রশ্ন করেন, এমন ঘটনা কীভাবে ঘটতে পারে? তিনি সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলো কি আদৌ নমুনা পরীক্ষা করে কিনা।

ওই ব্যক্তি বলেন, ‘আমার পরীক্ষার ফল কী - তার উপর নির্ভর করেই না আমি সিদ্ধান্ত নেবো। একটা ভুল ফলাফল অনেক কিছু বদলে দিতে পারে। বাংলাদেশের সবাই জানে না করোনাভাইরাসের পরীক্ষা করতে কতদিন লাগে। পজিটিভ হওয়া পরও নেগেটিভ রেজাল্ট নিয়ে একজন ব্যক্তি অন্যদের আক্রান্ত করে বেড়াবে।’

জাপান প্রবাসী একজন বাংলাদেশি ১৯ আগস্ট ফেসবুকে বড় করে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, কীভাবে তার স্ত্রীর দুটি পরীক্ষায় দুই রকম ফল এসেছে। তার লেখা থেকে কিছুটা অংশ তুলে দেয়া হল।

‘এক ফ্লাইটে আমার বউ জাপানে আসার কথা ছিল। নিয়মানুযায়ী বিমানে উঠার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কোভিড-১৯ নেগেটিভ সনদ থাকা বাধ্যতামূলক করেছে জাপান। ফ্লাইটের ঠিক ৭২ ঘণ্টা আগে আমার বউ গত ১৬ আগস্ট নমুনা দেয়। যার ফলাফল ১৭ তারিখ বিকেলে নেগেটিভ আসে। যেহেতু ফলস পজিটিভ/নেগেটিভ রেজাল্ট হরহামেশায় হচ্ছে, সেই জন্য বাড়তি সাবধানতার অংশ হিসেবে ১৭ তারিখের ওই ফল আসার আগে সকালে ফের ঢাকায় ডিএনসিসিতে নমুনা দেয়ার ব্যবস্থা করি।’

তিনি লিখেছেন, ‘ডিএনসিসির ওই নমুনার ফলাফল ঢাকার ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারাল সেন্টারের ল্যাবে করা হয়। ১৮ আগস্ট দুপুরে তাদের ফলাফল আসে পজিটিভ।’

এই একই ঘটনার বর্ণনা পাওয়া গেছে আরও একের অধিক ব্যক্তির কাছ থেকে, ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শ্বশুরকে নিয়ে গিয়েছিলেন পরীক্ষার জন্য। পরীক্ষার ফল দিতে তিনদিন নিয়েছিলো হাসপাতালটি। রিপোর্ট পাননি এরকম অনেকের অভিযোগের পরই সেই রিপোর্ট মিলেছিল। রিপোর্টে বলা হয়, ডেঙ্গু এবং করোনাভাইরাস পজিটিভ। রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দেয়া হয়।

মনের মধ্যে সন্দেহ নিয়ে আরেকটি বেসরকারি হাসপাতালে গিয়েছিলেন দুদিনের মাথায়। কিন্তু তাতে দেখা গেলো কোভিড-১৯ নেগেটিভ। দেশে করোনাভাইরাসের পরীক্ষা শুরু হওয়ার প্রথম দিকেই বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাংলাদেশে যে আরটি-পিসিআর পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা হয়, সেই পদ্ধতিতে পরীক্ষার ফলে অন্তত ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ‘ফলস নেগেটিভ’ আসতে পারে।

অর্থাৎ নমুনায় করোনাভাইরাসের উপস্থিতি থাকলেও তা শনাক্ত না হওয়া। কিন্তু একজনের নমুনা পরীক্ষার ফল আরেকজনকে পাঠানো, নমুনা দেয়া ব্যক্তির তথ্য হারিয়ে ফেলা, দুই সপ্তাহ পার হওয়ার পরে পরীক্ষার ফল পাওয়া, দুই ল্যাবে পরীক্ষার দুই রকম ফল, ল্যাবে নমুনা পৌঁছানোর আগেই রিপোর্ট, এসব যে ‘ফলস নেগেটিভ’ নয় তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের পরিচালক তাহমিনা শিরিন বলেন, ‘নমুনা পরীক্ষার বেশ কয়েকটি ধাপ রয়েছে। নমুনা সঠিকভাবে সংগ্রহ করা, নির্ধারিত তাপমাত্রায় নমুনা সংরক্ষণ, সেই নমুনা সঠিকভাবে পরিবহন এবং মেশিনে পরীক্ষা। এর কোন একটা ধাপে সমস্যা হলে ভুল ফল আসতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘হয়ত নমুনা নেয়ার জন্য যে পর্যন্ত ঢুকিয়ে ন্যাজাল সোয়াব নিতে হয় সেটা নেয়া হয়নি। সেরকম ঠাণ্ডা তাপমাত্রায় রাখার কথা সেটা হয়নি। কর্মীদের সক্ষমতাও একটা বড় ব্যাপার। ল্যাবের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। যে ল্যাব অল্প সময় হল পরীক্ষা শুরু করেছে তাদের গুছিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সময় লাগবে পারে।’

তিনি আরো বলেন, ‘একটি নতুন টেকনিক অ্যাডাপ্ট করা, প্রশিক্ষিত কর্মী তারা পেয়েছে কিনা, পরীক্ষার জন্য যে রি-এজেন্ট দরকার হয় সেটার মান কেমন, হয়ত খরচ কমাতে নিম্নমানের রি-এজেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে। অনেক রকমের ব্যাপার এখানে কাজ করে।’

তাহমিনা শিরিন জানিয়েছেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর নমুনা পরীক্ষার ল্যাবগুলোর মান কেমন, সঠিকভাবে কাজ হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে তাদের একটি প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। আইডিসিআরের একটি দল বেশ কটি বেসরকারি হাসপাতাল পরিদর্শন করে একটি প্রতিবেদন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে দিয়েছে।

তিনি জানিয়েছেন, অনেক হাসপাতালে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই, কোথাও কাজের গতি যেমন হওয়া উচিৎ সেটি নেই, প্রশিক্ষিত কর্মী নেই, একই যন্ত্রপাতি বিভিন্ন যায়গায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব হাসপাতালের ল্যাবে এরকম নানা রকম সমস্যা তারা দেখতে পেয়েছেন বলে তিনি জানিয়েছেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলছেন, ‘যে কোন মেডিকেল পরীক্ষার নির্ভুল ফল পাওয়ার জন্য মান নিয়ন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমার জানা মতে করোনাভাইরাসের পরীক্ষার ক্ষেত্রে কোথায় কীভাবে মান নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে সেটি যাচাই করার মতো কোন ব্যবস্থা কোথাও নেই।’

তিনি বলেন, ‘নমুনা সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন এটি একটি চেইনের মতো। সেখানেও নজরদারি নেই। যন্ত্রে নমুনা লোড করা পর্যন্ত এই চেইন ঠিকমতো কাজ না করলে নির্ভুল পরীক্ষার হার কমে আসে। যন্ত্র পর্যন্ত যাওয়ার আগে যে ব্যবস্থা, সেখানেই সম্ভবত কোন ঘাটতি রয়েছে।’

তিনি মনে করেন, করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানোর জন্য যে প্রচেষ্টা বাংলাদেশে দেখা গেছে, এর মান নিয়ন্ত্রণে সেরকম প্রচেষ্টা নেই।

একদম শুরুতে শুধুমাত্র সরকারের আইইডিসিআরের ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা করা হতো। এখন ল্যাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯০টি। অনেক বেসরকারি হাসপাতালও এখন সরকার নির্ধারিত ফি’র বিনিময়ে নমুনা পরীক্ষা করছে। স্বভাবতই মনে হতে পারে, ছয় মাস পরে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা অনেক বাড়বে।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে সরকারি ও বেসরকারি দুই ধরনের ল্যাব থেকেই নানা ভুলের ঘটনা ঘটছে। ছয়মাস পার হওয়ার পরও এরকম অনিয়ম কীভাবে ঘটছে? করোনাভাইরাস সম্পর্কিত সরকারের গঠিত ক্লিনিকাল ম্যানেজমেন্ট কমিটির একজন উপদেষ্টা ডা. এম এ ফয়েজ।

তিনি বলেন, পরীক্ষার কোন ধাপগুলো কীভাবে হবে, সকল ল্যাবকে একটি সেব্যাপারে একটি ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসেডিওর’ দেয়া আছে। সেটা ঠিকমতো অনুসরণ করা না হলে ভুল হতে পারে। নমুনা অনেকবার হাত-বদল হয়, যে পদ্ধতিতে পরীক্ষা হচ্ছে তা বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বেই নতুন, কিছু কাজ মেশিনে, কিছু কাজ হাতে করতে হয়। পুরো প্রক্রিয়ার মেকানিজম আরও জোরদার করা দরকার। আমরা চাই না একটা পরীক্ষায়ও যেন গলদ না হয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলেও এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা সূত্র জানিয়েছে, তারাও এ ধরনের অভিযোগ পেয়েছেন এবং পরীক্ষার মান নিয়ন্ত্রণে তারা ব্যবস্থা নিচ্ছেন। খবর: বিবিসি বাংলা।

এলাকা ছাড়া আ.লীগ চেয়ারম্যানকে ফেরানোর দাবি বিএনপি নেতার
  • ২৩ মার্চ ২০২৬
দেশের তিন বিভাগে বৃষ্টির আভাস
  • ২৩ মার্চ ২০২৬
বিশ্ব পানি দিবস সরকারি উদ্যোগে পালনের আহ্বান
  • ২৩ মার্চ ২০২৬
পরিবারের দাবি ‘মানসিকভাবে অসুস্থ’, ঢাবি ছাত্রীকে বেঁধে রাখা…
  • ২৩ মার্চ ২০২৬
নতুন সংযোজনে জমজমাট সাফারি পার্ক, ঈদে দর্শনার্থীদের রেকর্ড …
  • ২৩ মার্চ ২০২৬
ঈদের ছুটিতেও ঢাকার বাতাস ‘অস্বাস্থ্যকর’, বায়ুদূষণে আজ শীর্ষে
  • ২৩ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence