দীর্ঘ ৩৫ বছর পর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ কাল

শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে শপথ

১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৯:১৯ PM
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও কর্নেল অলি আহমদ

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও কর্নেল অলি আহমদ © টিডিসি সম্পাদিত

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর দেশের তেইশতম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ আগামীকাল (বৃহস্পতিবার)। এদিন দুপুর ২টা থেকে টানা বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ হবে। নতুন রাষ্ট্রপতি পরদিন শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে শপথ গ্রহণ করবেন বলে সংসদ ভবনে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সংসদীয় দলের সভা শেষে সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন। নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও সংসদ উভয়ে মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নির্বাচন শুরুর ৫ মিনিট আগে ভোটের সরাসরি সম্প্রচার শুরু হবে।

রাষ্ট্রপতি পদে দুইজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ক্ষমতাসীন দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের পক্ষ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন। অপরদিকে, বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী-জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন অলি আহমদ। তিনি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপির চেয়ারম্যান। রাজনীতিতে তিনি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ নামে পরিচিত এক সময়ের বিএনপির সাবেক নেতা ও সাবেকমন্ত্রী।

নির্বাচন কমিশন প্রতিদ্বন্দ্বি দুই প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেউ প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় তফসিল অনুযায়ী জাতীয় সংসদ কক্ষে আগামী কাল এ ভোট গ্রহণ হবে। সংসদ ভবনের নির্ধারিত কক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সংসদ সদস্যরা ভোট দেবেন।

নির্বাচনে ভোটার হচ্ছেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্যরা। সংসদ সদস্যরা বিশেষ ব্যালট পেপারে স্বাক্ষর ও পছন্দক্রমের মাধ্যমে ভোট দেবেন। ভোট গ্রহণ শেষে সংসদ কক্ষেই ব্যালট গণনা করে আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করবেন নির্বাচনী কর্তা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।

এদিকে, দেশের তেইশতম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঐতিহাসিক নির্বাচন দাবি করে নির্বাচন অত্যন্ত সুন্দর ও সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিইসি। বুধবার রাজধানীর আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে এক ব্রিফিংয়ে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা বলেন।

আরও পড়ুন: চমক আসছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে, আলোচনায় জাতীয় কাউন্সিলও

প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আমাদের যতরকম প্রস্তুতি প্রয়োজন তা আমরা সম্পন্ন করেছি। আমাদের প্রস্তুতির মধ্যে কোনো ঘাটতি নেই। এই নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা পাচ্ছি। আমাদের বিশ্বাস, সুন্দর একটা নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারব।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিকে বিশ্ববাসী তাকিয়ে আছে। সুতরাং এটা একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এটা আমার জন্য একটা ভাগ্যের ব্যাপার।

সিইসি বলেন, দেশবাসী, পুরা জাতি এবং বিশ্ববাসী জানে আমাদের একজন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। আপনারা সবাই জানেন, ১৯৯১ সালে প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছিল। এরপরে কিন্তু আর হয়নি। একারণে আমরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে অভ্যস্ত না। সংসদ সচিবালয় যেখানে গভীরভাবে ইনভলভ থাকেন উনারাও এই ধরনের কার্যক্রম করে অভ্যস্ত না। তারপরও আমরা যত রকমের এক্সারসাইজ সম্ভব এবং দরকার সেটা করেছি। যাতে করে আমাদের পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে কোনো গ্যাপ না হয়।

তিনি বলেন, ১৯৯১ সালের আইনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিধিমালা আছে। আইন এবং বিধিমালার আলোকে আমরা দেখেছি যে কয়েকটা স্তরে এই কার্যক্রমটাকে ভাগ করা যায়। এক নম্বর হচ্ছে যদি জাতীয় সংসদের সেশনে থাকে তাহলে এক ধরনের ব্যবস্থা। আর যদি সেশন না থাকে তা হলে আরেক ধরনের ব্যবস্থা। এখন আমাদের জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলছে না। অধিবেশন ডাকতে হবে, এমনও না। শুধু নির্বাচনের জন্য একটা বৈঠক আহ্বান করলেই চলে। আইনের আছে এটা নির্বাচনী কর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া আছে। উনি একটা বৈঠক আহ্বান করবেন। সংসদ সদস্যরা ভোট দিবেন।

আরও পড়ুন: দেশের তেইশতম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে বিএনপিতে চলছে নানা সমীকরণ

সিইসি আরও বলেন, আমরা এই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছি। আমাদের ভোটার সংখ্যা হচ্ছে ৩৪৯ জন। ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট হবে। এখানে আমাদের রাষ্ট্রপতি একজন ভোটার। প্রধানমন্ত্রী ভোটার, স্পিকার ভোটার, তেমনি বিরোধী দলের নেতাও ভোটার।

সিইসি জানান, প্রথম দিকে যখন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার এবং বিরোধীদলীয় নেতা ভোট দিবেন তখন লাইভ টেলিকাস্ট হবে। তারপরে আমরা ৫টার সময় ভোট গণনা শুরু করলে আবারও লাইভ টেলিকাস্ট হবে। সংসদ সদস্যরা যেহেতু ভোটার, ভোট দিয়েই চলে যাবেন এমন না, তারা উপস্থিত থাকতে পারবেন। এমনকি উনারা ভোট গণনার সময়ও থাকতে পারবেন। এটা খুব স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হবে। সুতরাং এখানে কারোও কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। কোন প্রার্থী কতটি ভোট পেল, কতটি ভোট বাতিল বা নষ্ট হলো, সংখ্যাগুলো সব বিস্তারিত আমি ঘোষণা করব। যিনি বিজয়ী হবেন বা যিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পাবেন, তার নাম ঘোষণা করে দিব। এরপর গেজেট প্রকাশ করব।

এদিকে, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকায় কোনো সংসদ সদস্যের দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে সংসদের সদস্য সংখ্যার বিন্যাসই জয়-পরাজয়ের মূল নির্ণায়ক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সংরক্ষিত নারী আসনসহ সংসদে মোট ভোটার সংখ্যা ৩৪৯ জন। বিএনপি দলীয় প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলীয় একক প্রার্থী। পরদিকে, বিরোধীদলীয় জোট প্রার্থী অলি আহমদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও ১১-দলীয় ঐক্য।

এদিকে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে সরকার দলীয় সভাকক্ষে সংসদীয় দলের বৈঠক করেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে দলীয় প্রার্থী মির্জা ফখরুলকে ভোটদিতে দলের সকল সদস্যকে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

বৈঠক শেষে সরকার দলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আমরা বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেবো। দুপুর ২টা থেকে ভোট শুরু হবে, চলবে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। চিফ হুইপ বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি, স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধী দলীয় নেতা এবং আমাদের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলামের ভোট প্রদান সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।’

তিনি আরও জানান, তাদের ভোট দেওয়া শেষ হলে পরের পুরো ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া রেকর্ড করা হবে। নির্বাচন শেষ হবার পাঁচ মিনিট আগে আমরা আবারও লাইভ টেলিকাস্ট শুরু করব। এরপর ফলাফল ঘোষণাটিও সরাসরি দেখাব। আগামীকাল ইতিহাসের একটি মাহেন্দ্রক্ষণ তৈরি হবে। গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরু হবে।’ মনি জানান, ‘আগামী শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ নেবেন।’

আরও পড়ুন: কপাল পুড়তে পারে অলস, স্থবির ও বিতর্কিত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের

চিফ হুইপ বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কিভাবে ভোটগ্রহণ হয়, এদেশের মানুষ সেটা আবারও প্রত্যক্ষ করবে দেশের মানুষ। এর মাধ্যমে আমরা নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করব।’

সর্বশেষ, ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সময়ে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন আব্দুর রহমান বিশ্বাস এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন বদরুল হায়দার চৌধুরী। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বদরুল হায়দার চৌধুরীকে (৯২ ভোট) পরাজিত করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন আব্দুর রহমান বিশ্বাস। তিনি পেয়েছিলেন ১৭২ ভোট।

সংবিধানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা
১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর পর থেকেই বাংলাদেশে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চলমান রয়েছে। যেখানে রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে এবং রাষ্ট্রপতি হন রাষ্ট্রের প্রধান। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলা আছে যে, রাষ্ট্রপতি কেবল প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ-এই দুটি কাজ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে করতে পারেন।

বাকি সব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ীই তাকে কাজ করতে হয়, যা সংবিধানের ৫৬(৩) অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ সংসদ আহ্বান করা, স্থগিত করা ও ভেঙে দেওয়া, সংসদে পাস হওয়া বিলে সম্মতি দেওয়া, জরুরি অবস্থা ঘোষণা এবং রাষ্ট্রদূত নিয়োগ, যুদ্ধ ঘোষণা, শান্তি চুক্তি অনুমোদন, ক্ষমা প্রদর্শনসহ সব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ীই কাজ করবেন রাষ্ট্রপতি।

যদিও প্রধানমন্ত্রী আসলেই রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিয়েছেন কিনা, তা নিয়ে কোনো আদালত প্রশ্ন তুলতে পারবে না বলেও সংবিধানে উল্লেখ আছে। অর্থাৎ দুটি ক্ষেত্র ছাড়া বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা মূলত আনুষ্ঠানিক। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার পরামর্শ অনুযায়ীই তাকে কাজ করতে হয়। প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রেও মূলত সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান বা তাদের পছন্দ অনুযায়ী ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিয়ে থাকেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের সর্বোচ্চ নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হচ্ছে রাষ্ট্রপতি, যদি তিনি কাজ করতে পারেন। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তা করতে দেওয়া হয় না। দলগুলোই রাষ্ট্রপতিকে পদে বসায়, তাই তিনি স্বাধীন নন।

শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ৭ কলেজের অধ্যক্ষরা
  • ১৯ আগস্ট ২০২৬
ভুয়া পুলিশ পরিচয়ে প্রতারণা, গাজীপুরে যুবক আটক
  • ১৯ আগস্ট ২০২৬
মহিলা লীগ নেত্রীর দখলে থাকা ৮ একর জমি ৮ বছর পর উদ্ধার করলেন…
  • ১৯ আগস্ট ২০২৬
‎জাকসু ও হল সংসদের আবাসনসংক্রান্ত প্রস্তাবনা বাতিলসহ চার দা…
  • ১৯ আগস্ট ২০২৬
অডিটর নিয়োগ দেবে বাংলাদেশ স্কাউটস, আবেদন ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন…
  • ১৯ আগস্ট ২০২৬
স্কুল রক্ষায় বারবার আশ্বাস, শেষ পর্যন্ত তিস্তার গর্ভে ‘ভোরে…
  • ১৯ আগস্ট ২০২৬