অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী © সংগৃহীত
বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ১৯ কোটি ৩২ লাখ পেরিয়ে গেছে, যার মধ্যে সিংহভাগই সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ী হিসাব। আজ বুধবার (২৪ জুন) জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া অধিবেশনে টেবিলে উপস্থাপিত প্রশ্নোত্তর পর্বে চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই তথ্য জানান।
সংসদে অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুসারে দেশে মোট ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ১৯ কোটি ৩২ লাখ ৫১ হাজার ২৩২টি। এর মধ্যে সঞ্চয়ী হিসাব ১৭ কোটি ৭৯ লাখ ৫০... হাজার ৪৬৫টি এবং ঋণ হিসাবের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ৭৬৭টি। ২০২৬ সালের মধ্যে দেশের শতভাগ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনার লক্ষ্যে সরকার ‘জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশল’ (এনএফআইএস) বাস্তবায়ন করছে, যার ফলে বর্তমানে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার দাঁড়িয়েছে ৬৪ দশমিক ৫০ শতাংশে।
সংসদ অধিবেশনে বিভিন্ন সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, ব্যাংক খাতের সংস্কার, খেলাপি ঋণ ও পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। কুড়িগ্রাম-১ আসনের আনোয়ারুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ব্যাংকিং সেক্টরে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩০টি ব্যাংক তাদের খেলাপি ঋণ ও অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের জন্য জোরদার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এ লক্ষ্যে ব্যাংকগুলো বিশ্বের ৯টি শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানের সাথে ‘নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট’ (এনডিএ) স্বাক্ষর করে ‘নো উইন নো ফি’ (সাফল্য পেলেই কেবল ফি পরিশোধ) শর্তে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
প্রথম পর্যায়ে দেশের বড় ৬টি করপোরেট গ্রুপ ও ব্যক্তির (সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস. আলম, বেক্সিমকো, সিকদার, নাসা ও ওরিয়ন গ্রুপ) বিদেশে থাকা অবৈধ অর্থ-সম্পদ চিহ্নিতকরণ এবং তা দেশে ফেরত আনার আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যা পরবর্তীতে আরও সম্প্রসারিত হবে।
জামালপুর-৩ আসনের মুস্তফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, গত মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ২৩৩ দশমিক ৪৪৮ মিলিয়ন (৭,৮২৩.৩৪ কোটি) মার্কিন ডলার। এর মধ্যে কনসেশনাল (সহজ শর্তের) ঋণ ৬১ দশমিক ৯৭ শতাংশ ও নন-কনসেশনাল (কঠিন শর্তের) ঋণ ৩৮ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
ময়মনসিংহ-৮ আসনের লুৎফুল্লাহেল মাজেদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে রাজস্ব প্রদানকারী নিবন্ধিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১ কোটি ৩৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৬টি, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া গাইবান্ধা-৪ আসনের মোহাম্মদ শামীম কায়সারের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, চলতি অর্থবছরে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের আওতায় ১ হাজার৫৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে দেশের ১৪ লাখ ১৪ হাজার ৪৩১ জন কৃষক সরাসরি উপকৃত হয়েছেন।
সরকারি ও বিরোধী দলের বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী সংকটে থাকা ৫টি ইসলামী ব্যাংক একীভূতকরণ ও গ্রাহকদের আমানত ফেরতের বিষয়ে কথা বলেন। তিনি জানান, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসি-কে ‘ব্যাংক রেজোলিউশন স্কিম, ২০২৫’-এর আওতায় নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬ অনুযায়ী সুরক্ষিত আমানতের সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। রেজোলিউশনের আওতায় থাকা এই ৫ ব্যাংকের ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অর্থ তহবিল থেকে ফেরত দেওয়া শুরু হয়েছে এবং প্রথম ধাপে গ্রাহকেরা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা করে পাচ্ছেন।”
তিনি আরও জানান, অর্থ সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়ার সুবিধার্থে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জরুরি তারল্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ২০২৬ সালের ১৫ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংককে মোট ৭৫ হাজার ৯০৩ কোটি ১১ লাখ টাকা জরুরি তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশে মোট ৬৩টি ব্যাংক ১১ হাজার ৩২৬টি শাখা এবং ৪ হাজার ৯২৯টি উপশাখার মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এক বড় নীতিগত পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়ে জানান, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে মুদির দোকান ও বিউটি পার্লারসহ বেশ কিছু নতুন খাতকে ভ্যাটের (মূল্য সংযোজন কর) আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার।
ভ্যাটের আওতায় আসতে যাওয়া অন্যান্য খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে—তৈরি পোশাক বা কাপড়ের বিক্রেতা, কনফেকশনারি, কসমেটিক্সের দোকান, প্লাস্টিক ও সিরামিকের গৃহস্থালি পণ্য, জুতার দোকান, হার্ডওয়্যার পণ্য, ডেকোরেটরস, মোবাইল ফোন, এসি, ফ্রিজ, ওভেন ও ইলেকট্রনিক্স পণ্যের শোরুম, পেইন্ট, স্যানিটারি ও ফিটিংস, টাইলস, ঢেউটিন, রড ও সিমেন্টের দোকান, ফার্নিচার, মিষ্টান্ন ভাণ্ডার এবং রেস্টুরেন্ট। বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভ্যাট বাবদ মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে বলে অর্থমন্ত্রী সংসদকে অবহিত করেন।