ফাইজ তাইয়েব আহমেদ
সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফাইজ তাইয়েব আহমেদ © সংগৃহীত
বাংলাদেশের কূটনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো বিদেশ সফর ও চুক্তির পর প্রয়োজনীয় ফলোআপের অভাব। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সফরে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও চুক্তি হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় সম্ভাবনাগুলো অনেক সময় বাস্তব ফলাফলে রূপ নেয় না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফাইজ তাইয়েব আহমেদ।
মঙ্গলবার (২৪ জুন) নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, ‘বাংলাদেশের কূটনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কী জানেন? সফর হয়। চুক্তি হয়। ছবি ওঠে। তারপর? আর সেভাবে ফলো-আপ হয় না।’
ফাইজ তাইয়েব বলেন, বাংলাদেশের সরকারপ্রধানরা বিদেশ সফরে গিয়ে বৈশ্বিক ব্যবসায়ী, প্রযুক্তি খাতের নেতা ও বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন, সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি স্বাক্ষর করেন। তিনি উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান অধ্যাপক ইউনূস চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সফর করে বিশ্বের শীর্ষ রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করেছেন। তার মতে, এমন উচ্চপর্যায়ের সংযোগ তৈরির জন্য বিশ্বের অনেক দেশ লবিস্টদের পেছনে মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে।
তবে তিনি বলেন, সফরের আসল কাজ শুরু হওয়ার কথা দেশে ফেরার পর। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় ফলোআপ করে না। ফলে এসব সংযোগ ছবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
ফাইজ তাইয়েবের ভাষ্য, কোনো বিনিয়োগকারী বা ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হলে তাকে বাংলাদেশের সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হয়, উৎপাদন খাতে আনতে হয়, দক্ষতা উন্নয়ন, আউটসোর্সিং কিংবা প্রযুক্তি স্থানান্তরের মতো কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করতে হয়। কিন্তু এসব কাজ কাঠামোগত ফলোআপ ছাড়া সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ‘একটা সংযোগ তৈরি হলে সেটাকে নার্চার করতে হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য-পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়/বিডা—এই ৪/৫ জায়গায় সেই ফলো-আপ নিবিড়ভাবে করে না। সংশ্লিষ্ট কোনও ডেস্ক নাই যারা এগুলা করবে, একে অপরকে এসকালেট করবে।’
নিজের বক্তব্যের পক্ষে চারটি উদাহরণও তুলে ধরেন তিনি।
প্রথম উদাহরণ হিসেবে তিনি ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের প্রসঙ্গ টানেন। ফাইজ তাইয়েব জানান, ওই সময় বড় বড় ঋণ চুক্তি ও সমঝোতা হয়েছিল। আইসিটি খাতের একটি প্রকল্পের জন্য ইডিসিকে ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ দেওয়ার কথাও ছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি দেখেন প্রকল্পটি ৬-৭ বছর ধরে চলমান, অধিকাংশ কম্পোনেন্ট অকার্যকর ও পুরোনো হয়ে গেছে। এমনকি তখনও ঋণের সুদের হার নিয়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সমঝোতা হয়নি।
তিনি লেখেন, ইআরডি ২ শতাংশ সুদের হার চাইলেও চীনা এক্সিম ব্যাংক ৩ শতাংশের নিচে যেতে রাজি হয়নি। পরে তিনি চীনা অংশ বাদ দিয়ে প্রকল্পটি পুনর্গঠন করে সংশোধিত ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠান। এ কারণে কিছু কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ভেন্ডর অসন্তুষ্ট হন বলেও দাবি করেন তিনি।
ফাইজ তাইয়েবের মতে, চীনের প্রেসিডেন্টের প্রতিশ্রুত প্রকল্প সময়মতো নিষ্পত্তি না হওয়ায় সেটির কার্যকারিতা হারিয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘একটা ডিজিটাল প্রজেক্ট যদি আপনি ২/৩ বছরে শেষ না করেন, এটার স্পেসিফিকেশন গুলার কার্যকরিতা থাকে না, এই কালেক্টিভ বোধ আমাদের নাই।’
দ্বিতীয় উদাহরণে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের পর ডিজিটাল খাতে আইটি ইনকিউবেটর ও স্কুল অব ফিউচার প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেন। তার দাবি, ভারতীয় ঋণ ছাড়ে অনিয়মিততা থাকায় প্রকল্পগুলো মাঝপথে আটকে আছে। অনেক ভবন এখনো আধা-সম্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। ২০২৪ সালের পর ভারতীয় পরামর্শকরা চলে গেছেন এবং ঠিকাদারও পলাতক।
তিনি জানান, ভারতীয় দূতাবাসের কর্মকর্তাদের তিনি প্রকল্পগুলো সচল বা বন্ধ করার বিষয়ে উদ্যোগ নিতে অনুরোধ করেছিলেন, যাতে সেগুলো অনিশ্চয়তায় ঝুলে না থাকে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আলোচনা ও বাস্তবায়নে দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশের বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় বৈদেশিক ঋণের দায় বেড়েছে, প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা কমেছে এবং নতুন প্রযুক্তিভিত্তিক প্রকল্প নিয়ে আলোচনার সুযোগও সংকুচিত হয়েছে।
তৃতীয় উদাহরণ হিসেবে নেদারল্যান্ডসের ব্রেইনপোর্টের কথা উল্লেখ করেন ফাইজ তাইয়েব। তিনি বলেন, সেমিকন্ডাক্টর, থ্রিডি প্রিন্টিং এবং শিল্প-শিক্ষা-সরকারের মধ্যে সমন্বয় তৈরিতে কাজ করা এই প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশ সফর করেছিল। মাত্র দেড় থেকে দুই কোটি টাকার একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রয়োজন থাকলেও বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আগ্রহ দেখা যায়নি।
তার মতে, ব্রেইনপোর্টের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তৈরি হলে সৌদি আরব বা তাইওয়ানের মতো দেশের বিভিন্ন প্রকল্পে বাংলাদেশের জন্য সম্পদ ও দক্ষতা সরবরাহের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারত।
চতুর্থ উদাহরণে তিনি বলেন, ডাচ ও জার্মান টেলিকম নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি বিনিময়ভিত্তিক সহযোগিতা বাড়াতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু একাধিকবার বলার পরও বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি।
অথচ একই সময়ে বিটিআরসি প্রায় ৩০০ কোটি টাকার নিয়ন্ত্রক যন্ত্রপাতি কেনার আগ্রহ দেখিয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ফাইজ তাইয়েবের ভাষ্য, বাংলাদেশের টেলিকম নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা এখনো দ্বিতীয় প্রজন্মের পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে ডাচ ও জার্মান নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো পঞ্চম প্রজন্মের সক্ষমতা অর্জন করেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা বিদেশ ভ্রমণ চাই, জ্ঞান ও দক্ষতা ট্র্যান্সফারে নজর নাই।’
ফাইজ তাইয়েবের মতে, কূটনীতি, ব্যবসা, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে কাঠামোগত সমাধান প্রয়োজন। কে বিষয়গুলো তদারকি করবে, কে ফলোআপ করবে এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে কী জবাবদিহি থাকবে এসব বিষয়ও নির্ধারণ করা জরুরি।
তিনি বলেন, ‘ফলাফল কী হচ্ছে? ভূরাজনৈতিক অ্যালাইনমেন্ট আসছে, কিন্তু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে ভ্যালু যোগ হচ্ছে না। চুক্তি ফাইলে থাকছে, বাস্তবে নামছে না।’
স্ট্যাটাসের শেষাংশে ফাইজ তাইয়েব আহমেদ বলেন, কূটনীতির সাফল্য শুধু চুক্তি বা সমঝোতা স্মারকে সীমাবদ্ধ নয়। বরং কত বিনিয়োগ এসেছে, কত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং কী ধরনের প্রযুক্তি দেশে প্রবেশ করেছে এসব সূচক দিয়েই কূটনীতির সফলতা মূল্যায়ন করা উচিত।
তার ভাষায়, ‘কূটনীতির সাফল্য স্বাক্ষরে নয়, কতটা বিনিয়োগ এলো, কত মানুষের কর্মসংস্থান হলো, কোন প্রযুক্তি দেশে ঢুকল, সেই হিসেবে। কূটনীতির সাফল্য চুক্তির পাতায় নয়, মাঠে মাপতে হবে।’