ঝালকাঠির দুই আসন
ঝালকাঠি-১ ও ২ আসনের বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থীরা © টিডিসি সম্পাদিত
একসময় ঝালকাঠিকে নিরঙ্কুশভাবে ‘ধানের শীষের ঘাঁটি’ হিসেবে ধরা হতো। এবারের নির্বাচনি সমীকরণে সেই চিত্র আর একমাত্রিক নেই। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা, নতুন জোটের মাঠে নামা এবং তরুণ ভোটারদের ভূমিকা—সব মিলিয়ে ঝালকাঠি জেলার দুই আসনে ভোটের হিসাব নতুন করে লিখছে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক। ফলে বিএনপির শক্ত ঘাঁটিতেই বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে জামায়াত। এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়তে ইসলামীর সঙ্গে ভোট যুদ্ধে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।
সাধারণ ভোটারদের ধারণা, ঝালকাঠি এখন পর্যন্ত ধানের শীষের ঘাঁটি হলেও এবারের নির্বাচনে সেই ঘাঁটিতে বড় ফ্যাক্টর হবে দাঁড়িপাল্লা। এ ছাড়া দুই আসনেই বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত প্রভাবশালী অন্তত চার নেতা এখনো দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্যে মাঠে নামেননি। তাদের কেউ কেউ ঢাকায় অবস্থান করে দলের ভেতরে ভিন্ন হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত। ফলে তাদের অনুসারীদের ভোট ধানের শীষে যাবে কী না—তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আর এই আসন দুইটি যদি জামায়াতে নিতে পারে তাহলে বিএনপির অস্থিত হারাবে।
এদিকে জেলার প্রায় ৫ লাখ ৯৩ হাজার ৮২৬ জন ভোটারের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ তরুণ ভোটার। এই তরুণ ভোটারদের সিদ্ধান্তও ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
আরও পড়ুন : জামায়াত আমিরকে ভোট দিতে চান ৩৯.৫% ভোটার, মিল্টনকে কত?
জানা গেছে, ঝালকাঠি জেলায় সংসদীয় আসন রয়েছে দুটি—ঝালকাঠি-১ ও ঝালকাঠি-২। চারটি উপজেলা (ঝালকাঠি সদর, নলছিটি, রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া) নিয়ে গঠিত এই জেলার আয়তন প্রায় ৭৫৮.০৬ বর্গকিলোমিটার এবং এখানে ৩২টি ইউনিয়ন ও শতাধিক গ্রাম রয়েছে।
এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচনের ভোটার তালিকায় দেশের মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি; এর মধ্যে ঝালকাঠি-১ আসন দেশের সবচেয়ে কম ভোটারসংখ্যার আসনগুলোর একটি, যেখানে প্রায় ২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩৬জন ভোটার রয়েছেন।
ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া)
এ আসনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন পেয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় ধর্মবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জামাল। জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী ড. ফয়জুল হক। ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকে ইব্রাহীম আল হাদী, বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পেয়ে (বিএনপির বিদ্রোহী) স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে হাঁস প্রতীকে ব্যারিস্টার মঈন ফিরোজসহ মোট ১০ প্রার্থী থাকলেও মূল লড়াই হবে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে রফিকুল ইসলাম জামাল পরাজিত হলেও তিনি বরাবরই রাজনীতিতে সক্রিয়। হামলা-মামলা ও কারাবরণসহ দীর্ঘ সময় রাজপথে ছিলেন তিনি।
জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী এই বিএনপির মনোনীত এমপি প্রার্থী রফিকুল ইসলাম জামাল বলেন, ‘ঝালকাঠি -১ আসন বিএনপির ঘাঁটি নামে পরিচিত সুতরাং এই আসনের জনগণ ধানের শীষে ভোট দিয়ে বিপুল ভোটের মাধ্যমে আমাকে বিজয় করবে। রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া নদীভাঙনকবলিত এলাকা হওয়া সত্ত্বেও গত ১৭ বছরে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। নির্বাচিত হলে বেড়িবাঁধ নির্মাণ, হাসপাতাল স্থাপন, সড়ক উন্নয়ন ও মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার অঙ্গীকার করেন তিনি।’
আরও পড়ুন : বিএনপি প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে এবার আপিল বিভাগে আবেদন নাহিদের
জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত এমপি প্রার্থী ড. ফয়জুল হক দিন-রাত প্রচার চালাচ্ছেন। তার সঙ্গে মাঠে রয়েছেন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেত্রী ডা. মাহামুদা মিতু। ফয়জুল হক বলেন, ‘জনগণ হামলাবাজ, চাঁদাবাজ ও মামলাবাজ রাজনীতি থেকে মুক্তি চায়। মানুষ শান্তি চায়, তাই কাদের ভোট দিয়ে বিজয় করলে মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারবে সেটা ১২ তারিখ ভোট দিয়ে জনগণ দেখিয়ে দিবে। তরুণ ভোটার পরিবর্তন চায় তাই এবার তরুণ ভোটারদের মাধ্যমে দেশ পরিবর্তন হবে। নতুন বন্দোবস্তের বাংলাদেশ গড়তে দাঁড়িপাল্লাই বিজয়ী হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।’
ঝালকাঠি-২ (সদর ও নলছিটি)
এই আসনে ৮ প্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো ও জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী শেখ নেয়ামুল করিমের মধ্যে। ইলেন ভুট্টো ২০০১ সালে এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। অন্যদিকে শেখ নেয়ামুল করিম বরিশাল বিএম কলেজের সাবেক এজিএস। এই আসনে জামায়াতের পক্ষে এবি পার্টির প্রার্থী শেখ জামাল হোসেন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে দাঁড়িপাল্লার সমর্থনে মাঠে নেমেছেন। এনসিপিও সক্রিয়ভাবে জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম সিরাজীও মাঠে রয়েছেন।
ধানের শীষের প্রার্থী ইলেন ভুট্টোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে মনোনয়নবঞ্চিত হেভিওয়েট নেতাদের অনুসারীদের ভোট নিশ্চিত করা। এদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি ও সাবেক সদর উপজেলা চেয়ারম্যান সৈয়দ রাজ্জাক আলী সেলিম। মোটরসাইকেল প্রতীকে নির্বাচন করা এই প্রার্থীর সদর উপজেলার উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি ইউনিয়নে শক্ত ভোটব্যাংক রয়েছে, যেখানে প্রায় ৩০ হাজার সংখ্যালঘু ভোটার আছেন।
আরও পড়ুন : জয়-পুতুলের রাজনীতিতে ফেরা নিয়ে যা বললেন তারেক রহমান
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজ্জাক সেলিম মাঠে থাকায় যে ভোট বিভাজন হবে—তার সুফল যেতে পারে জামায়াতের ঘরে। কেননা, রাজ্জাক সেলিম সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চলে যে ভোটব্যাংকে ভাগ বসাবেন বলে মনে করা হচ্ছে, সেই ভোট ধানের শীষেই যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তবে সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে জুলাই গণহত্যার অভিযোগে যে মামলা হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি মাঠ ছাড়লে পরিস্থিতি বিএনপির অনুকূলে যেতে পারে। সব মিলিয়ে ঝালকাঠি-২ আসনে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে।
ইলেন ভুট্টো বলেন, ‘এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হবেন এবং ঝালকাঠি-২ আসন তাকে উপহার দেওয়া হবে।’
শেখ নেয়ামুল করিম বলেন, ‘অতীতের জনপ্রতিনিধিরা উন্নয়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। নির্বাচিত হলে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, নদীভাঙন রোধ, মেডিকেল কলেজ ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেব। এ ছাড়া বেকার ছাত্র-যুবকরা যাতে উদ্যোক্তা হতে পারে, সে ব্যাপারেও প্রচেষ্টা থাকবে আমার। এলাকার সব মানুষই পরিবর্তন চায়। ঝালকাঠি-২ আসনের মানুষ আমাকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করবে ইনশাআল্লাহ।’
উল্লেখ্য, ঝালকাঠি-২ আসনটি ঝালকাঠি সদর ও নলছিটি উপজেলা নিয়ে গঠিত। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী এ আসনে ভোটারসংখ্যা প্রায় ৩লাখ ৬৫ হাজার, ২৯০জন ভোটার।