ক্যারিয়ারের শেষ সময়ে এসে নতুন এক ঐতিহাসিক মাইলফলকের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন আগেই পূরণ হয়েছে, কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে রানার্সআপ হয়ে ফেরার পর এখন আর্জেন্টাইন মহাতারকার সামনে সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ক্যারিয়ারের হাজারতম গোল। বর্তমান গোল করার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই সেই কীর্তি গড়তে পারেন তিনি।
৩৯ বছর বয়সী মেসি ফুটবলে প্রায় সব বড় শিরোপাই জিতেছেন। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে অপূর্ণ স্বপ্নও পূরণ হয়েছে। যদিও ২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেনের কাছে ফাইনালে হেরে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া হয়নি, তবু তার ব্যক্তিগত অর্জনের তালিকায় যোগ হতে পারে আরেকটি বিরল রেকর্ড।
দীর্ঘদিন ধরেই ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিতর্কগুলোর একটি পেলে ও মেসির তুলনা। এবার সেই আলোচনায় যোগ হয়েছে হাজার গোলের মাইলফলক। ফুটবল ইতিহাসে হাজার গোলের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নাম পেলে। এখন সেই রেকর্ডের দিকেই এগোচ্ছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক।
বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর অফিসিয়াল ম্যাচে মেসির গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯১৯। বার্সেলোনা, প্যারিস সেন্ট জার্মেইন, ইন্টার মায়ামি এবং আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে এই গোলগুলো করেছেন তিনি। ফলে হাজার গোলের মাইলফলক স্পর্শ করতে তার প্রয়োজন আরও ৮১টি গোল।
বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় নিলে এই লক্ষ্য অর্জন করা তার জন্য অসম্ভব নয়। গত আড়াই বছরে ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্সই সেটি প্রমাণ করছে।
যদি একই গতিতে গোল করতে পারেন, তাহলে ২০২৮ সালের মধ্যেই হাজার গোলের স্বপ্ন পূরণ হতে পারে। তখন তার বয়স হবে ৪১ বছর।
গত আড়াই বছরে ইন্টার মায়ামি ও আর্জেন্টিনার হয়ে ১১৭টি ম্যাচ খেলেছেন মেসি। এই সময়ে তিনি করেছেন ৯৮টি গোল। এর মধ্যে ইন্টার মায়ামির হয়ে ৭৯টি এবং আর্জেন্টিনার হয়ে ১৯টি। ম্যাচপ্রতি তার গোলের গড় ০.৮৩। এই গড় ধরে রাখতে পারলে আরও প্রায় ৯৮টি ম্যাচ খেলেই বাকি ৮১টি গোল পূরণ করা সম্ভব।
গত আড়াই বছরে মেসির গোলের হিসাব
২০২৪ সাল
ইন্টার মায়ামি: ২৫ ম্যাচে ২৩ গোল
আর্জেন্টিনা: ১১ ম্যাচে ৬ গোল
মোট: ৩৬ ম্যাচে ২৯ গোল
২০২৫ সাল
ইন্টার মায়ামি: ৪৯ ম্যাচে ৪৩ গোল
আর্জেন্টিনা: ৫ ম্যাচে ৩ গোল
মোট: ৫৪ ম্যাচে ৪৬ গোল
২০২৬ সালের প্রথমার্ধ
ইন্টার মায়ামি: ১৬ ম্যাচে ১৩ গোল
আর্জেন্টিনা: ১১ ম্যাচে ১০ গোল
মোট: ২৭ ম্যাচে ২৩ গোল
হাজার গোলের দৌড়ে মেসির সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। দীর্ঘদিনের এই দুই তারকা এবারও একই লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন। তবে এই দৌড়ে রোনালদোই আগে হাজার গোলের মাইলফলক স্পর্শ করতে পারেন। কারণ অফিসিয়াল ম্যাচে হাজার গোল পূরণ করতে তার প্রয়োজন আর মাত্র ২৪টি গোল।
পেলের গোলসংখ্যা কত?
আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অফিসিয়াল প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে পেলে ৮৩১টি ম্যাচে ৭৬৭টি গোল করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ক্লাবের প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ এবং ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে অন্যান্য জাতীয় দলের বিপক্ষে খেলা ম্যাচ।
তবে পেলের পুরো ক্যারিয়ারের সব ধরনের ম্যাচ বিবেচনায় নিলে তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ২৮২।
এই সংখ্যার মধ্যে রয়েছে অনেক প্রীতি ম্যাচের গোলও। বিভিন্ন ক্লাবের সমন্বিত দল, আঞ্চলিক নির্বাচিত দল এবং ব্রাজিল সেনাবাহিনীর দলের বিপক্ষেও তিনি গোল করেছিলেন। এসব গোল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সেই সময়ের ফুটবল বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। সান্তোস নিয়মিত বিশ্ব সফরে যেত এবং ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার শীর্ষ ক্লাবগুলোর বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলত। এসব ম্যাচে দর্শকে গ্যালারি ভরে যেত এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাও ছিল বেশ তীব্র।
যদি সান্তোসের অন্যান্য পেশাদার ক্লাবের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ এবং ব্রাজিল জাতীয় দলের অন্যান্য জাতীয় দলের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচগুলোও যোগ করা হয়, তাহলে পেলের গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ১৫৯ থেকে ১ হাজার ১৬২-এর মধ্যে। তবে ক্যারিয়ারের শুরুর কিছু ম্যাচের তথ্য নিয়ে মতভেদ থাকায় সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বলা সম্ভব নয়।
তবুও শুধু অফিসিয়াল ম্যাচের ৭৬৭ গোল ধরলেও গোল করার গড়ে পেলে এখনো বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার।
অফিসিয়াল ম্যাচে গোলের গড়
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো: ১ হাজার ৩৩০ ম্যাচে ৯৭৬ গোল (ম্যাচপ্রতি ০.৭৩)
লিওনেল মেসি: ১ হাজার ১৬৪ ম্যাচে ৯১৯ গোল (ম্যাচপ্রতি ০.৭৮)
পেলে: ৮৩১ ম্যাচে ৭৬৭ গোল (ম্যাচপ্রতি ০.৯২)
মেসির প্রথম অফিসিয়াল গোল
২০০৫ সালের ১ মে স্প্যানিশ লিগে আলবাসেতের বিপক্ষে বার্সেলোনার হয়ে প্রথম অফিসিয়াল গোল করেন মেসি। তখন তার বয়স ছিল ১৭ বছর ৯ মাস।
বার্সেলোনার ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে ২০২১ সালে ক্লাব ছাড়েন তিনি। প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে কাতালান ক্লাবটির হয়ে তার গোলসংখ্যা ৬৭২।
এরপর দুই মৌসুমে প্যারিস সেন্ট জার্মেইনের হয়ে করেন ৩২ গোল। ২০২৩ সালে ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর এখন পর্যন্ত অফিসিয়াল ম্যাচে করেছেন ৯০ গোল।
আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ইতিহাসেও সর্বোচ্চ গোলদাতা মেসি। দেশের জার্সিতে ২০৭ ম্যাচে তার গোল ১২৫টি।
প্রীতি ম্যাচ ধরলে মেসির গোল ৯৫৮
অফিসিয়াল গোলের হিসাবে মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ক্ষেত্রে ক্লাবের প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ এবং জাতীয় দলের সব অফিসিয়াল ও প্রীতি ম্যাচের গোল ধরা হয়। তবে ক্লাবের হয়ে খেলা প্রীতি ম্যাচের গোল এই হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।
মেসি বার্সেলোনা, পিএসজি ও ইন্টার মায়ামির হয়ে ক্লাব প্রীতি ম্যাচে মোট ৩৯টি গোল করেছেন। এই গোলগুলো যোগ করলে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ৯৫৮।
অন্যদিকে ক্লাব প্রীতি ম্যাচে করা ৪৬টি গোল যোগ করলে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মোট গোলসংখ্যা ইতোমধ্যেই ১ হাজার ২২-এ পৌঁছে যায়।
মেসি তিনটি ক্লাবের হয়েই প্রীতি ম্যাচে গোল করেছেন। বার্সেলোনার হয়ে প্রথম অফিসিয়াল গোলের আগেই ২০০৪-০৫ মৌসুমের প্রস্তুতি ম্যাচে পালামোস ও কাশিমা অ্যান্টলার্সের বিপক্ষে দুটি গোল করেছিলেন তিনি।
২০২১ সালে বার্সেলোনা ছাড়ার সময় প্রথম দলের হয়ে প্রীতি ম্যাচে তার গোল ছিল ৩২টি। এর মধ্যে বিভিন্ন সমন্বিত দলের বিপক্ষে করা আরও ছয়টি গোল ধরা হয়নি। পরে পিএসজির হয়ে দুটি এবং ইন্টার মায়ামির হয়ে পাঁচটি প্রীতি ম্যাচের গোল করেন। সব মিলিয়ে ক্লাব প্রীতি ম্যাচে তার গোল ৩৯টি।
তবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম হাজার গোলের দৌড়ে এই গোলগুলোকে অফিসিয়াল গোল হিসেবে গণনা করে না।
এ ছাড়া বার্সেলোনার বয়সভিত্তিক দলের হয়ে মেসির ১১টি এবং আর্জেন্টিনার বয়সভিত্তিক ও অলিম্পিক দলের হয়ে ১৬টি গোল রয়েছে। এগুলোও হাজার গোলের হিসাবের মধ্যে ধরা হয় না। আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে শুধু সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে খেলা অফিসিয়াল ও প্রীতি ম্যাচের গোলই এই পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।