আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচ © সংগৃহীত
অবশেষে শেষ হলো মহারণ। বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে বিদায় নিল ইংল্যান্ড। আর দুর্দান্ত জয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করল বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
রোমাঞ্চকর সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন আরও একধাপ এগিয়ে নিল লিওনেল মেসির দল। নির্ধারিত সময়ের শেষ পর্যন্ত লড়াই চললেও শেষ হাসি হাসে আর্জেন্টিনাই।
ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ হবে স্পেন। বিশ্বকাপের শিরোপার লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে দুই শক্তিশালী ফুটবল পরাশক্তি, একদিকে মেসির আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা স্পেন।
গোলশূন্য প্রথমার্ধের পর দ্বিতীয়ার্ধে জমে ওঠে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনার সেমিফাইনাল। দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই আক্রমণে গতি বাড়ায় ইংল্যান্ড। ৫৫তম মিনিটে হ্যারি কেইনের প্রচেষ্টা প্রতিহত হলেও বল চলে যায় ডেকলান রাইসের কাছে। দ্রুত বল বাড়িয়ে দেন মরগান রজার্সের দিকে। অ্যাস্টন ভিলার এই মিডফিল্ডারের নিখুঁত ক্রসে ডিফেন্ডার নাহুয়েল মোলিনাকে পেছনে ফেলে দারুণ ফিনিশিংয়ে গোল করেন অ্যান্থনি গর্ডন। চলতি বিশ্বকাপে এটি তার দ্বিতীয় গোল।
পিছিয়ে পড়ার পর আক্রমণের ধার বাড়াতে একের পর এক পরিবর্তন আনেন আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি। নিকো গঞ্জালেস, রদ্রিগো ডি পল, নিকোলাস ওতামেন্দি, গঞ্জালো মন্তিয়েল ও লাউতারো মার্তিনেজকে মাঠে নামিয়ে আক্রমণ শক্তিশালী করেন তিনি।
অন্যদিকে ৭২তম মিনিটে গোলদাতা গর্ডনকে তুলে এজরি কনসাকে নামিয়ে রক্ষণাত্মক কৌশলে যান ইংল্যান্ড কোচ থমাস টুখেল। পরে ড্যান বার্ন ও নিকো ও’রাইলিকেও মাঠে নামান তিনি। কিন্তু রক্ষণে অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের জন্য বিপদ ডেকে আনে। ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় আর্জেন্টিনার হাতে।
৮৫তম মিনিটে ম্যাচে সমতা ফেরান এনজো ফার্নান্দেজ। দূরপাল্লার শটে আর্জেন্টিনার এই মিডফিল্ডারের প্রচেষ্টা দুর্দান্তভাবে কর্নারের বিনিময়ে ঠেকিয়ে দেন ইংল্যান্ড গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড। সেই কর্নার থেকেই আক্রমণ গড়ে ওঠে। বল ফিরে পেয়ে লিওনেল মেসি নিখুঁতভাবে পাস দেন ফার্নান্দেজকে। প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে নেওয়া বাঁকানো শটে পিকফোর্ডকে পরাস্ত করে ম্যাচে সমতা ফেরান চেলসি মিডফিল্ডার।
সমতা ফেরানোর পরও থামেনি আর্জেন্টিনার আক্রমণ। নির্ধারিত সময় শেষে যোগ করা ৯ মিনিটের দ্বিতীয় মিনিটে আসে ম্যাচের নাটকীয় মুহূর্ত। অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের দূরপাল্লার শট প্রতিহত হওয়ার পর বল পেয়ে যান মেসি। বক্সের ভেতর অসাধারণ এক চিপ পাসে বল তুলে দেন লাউতারো মার্তিনেজের উদ্দেশে। দৌড়ে এসে শক্তিশালী হেডে পিকফোর্ডকে পরাস্ত করেন এই বদলি ফরোয়ার্ড।
ইন্টার মিলানের স্ট্রাইকার লাউতারো এর আগেও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে গোল করেছিলেন। এবার তার এই গোলেই ভেঙে যায় ইংল্যান্ডের স্বপ্ন। আরও একবার বদলি হিসেবে নেমে দলের জয়ের নায়ক হয়ে ফাইনালে পৌঁছে দিলেন আর্জেন্টিনাকে।
শেষ মুহূর্তে সমতা ফেরানোর আশায় ইভান টনি ও মার্কাস রাশফোর্ডকে মাঠে নামান টুখেল। তবে আর্জেন্টিনার শক্তিশালী রক্ষণ ভেদ করতে পারেনি ইংল্যান্ড। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই আর্জেন্টাইন শিবিরে শুরু হয় উল্লাস, আর ৬০ বছরের শিরোপা-খরা কাটানোর স্বপ্ন নিয়ে মাঠ ছাড়ে হতাশ ইংল্যান্ড।
এর আগে কিক অফের বাঁশি বাজার পর প্রথমার্ধজুড়ে আলোচনায় ছিল একের পর এক শক্ত ট্যাকল, উত্তেজনা, হলুদ কার্ড এবং লিওনেল মেসিকে ঘিরে ইংল্যান্ডের কড়া মার্কিং।
প্রথম ৪৫ মিনিটে দুই দল মিলিয়ে মোট ১৯টি ফাউল হয়েছে। এর মধ্যে আর্জেন্টিনা করেছে ১২টি, আর ইংল্যান্ড ৭টি। মাঝমাঠের লড়াইয়ে একে অপরকে থামাতে বারবার কঠোর ট্যাকলের আশ্রয় নিয়েছে দুই দল।
আক্রমণভাগেও খুব বেশি কার্যকর হতে পারেনি কোনো দল। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড—দুই দলই কয়েকটি শট নিলেও কোনোটিই লক্ষ্যে রাখতে পারেনি। ফলে দুই গোলরক্ষককে বড় কোনো পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়নি।
ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে প্রথমার্ধে সতর্ক ফুটবল খেলেছে দুই দলই। এখন দ্বিতীয়ার্ধে কে কৌশল বদলে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে পারে, সেটিই হতে পারে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণের মূল চাবিকাঠি।
ম্যাচের ২০ মিনিট পার হলেও কোনো দলই উল্লেখযোগ্য আক্রমণ গড়ে তুলতে পারেনি। ফলে গোলের চেয়ে শারীরিক লড়াই ও কৌশলগত ফুটবলই বেশি দেখা যায়।
৩২তম মিনিটে প্রথম বড় সুযোগ তৈরি করে ইংল্যান্ড। জুড বেলিংহামের দারুণ দৌড়ে আদায় করা ফ্রি-কিক থেকে ডেকলান রাইসের ভাসানো বলে জন স্টোনস লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে হারিয়ে হেড নেন। তবে তার প্রচেষ্টা অল্পের জন্য পোস্টের পাশ দিয়ে বাইরে চলে যায়।
৩৭তম মিনিটে লিওনেল মেসি একাধিক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় অ্যান্ডারসনের ট্যাকলে মাটিতে পড়ে যান। ঘটনাটি ঘিরে দুই দলের খেলোয়াড়রা রেফারি ইসমাইল এলফাথকে ঘিরে ধরেন। কিছুক্ষণ উত্তেজনা তৈরি হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন রেফারি। ওই ফাউলের জন্য ম্যাচের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন অ্যান্ডারসন।
৩৯তম মিনিটে আসে আর্জেন্টিনার সেরা সুযোগ। মেসির দ্রুত নেওয়া ফ্রি-কিক থেকে পারেদেসের সঙ্গে ওয়ান-টু পাস খেলে ফের বল পান তিনিই। পরে তার শট হ্যারি কেইনের গায়ে লেগে ফিরে গেলে দূরপাল্লা থেকে জোরালো শট নেন এনজো ফার্নান্দেস। তবে বল অল্পের জন্য গোলবারের ওপর দিয়ে বেরিয়ে যায়।
৪২তম মিনিটে পাল্টা আক্রমণে উঠতে থাকা মর্গান রজার্সকে টেনে থামিয়ে দেন লিসান্দ্রো মার্তিনেজ। এই ফাউলের জন্য ম্যাচে আর্জেন্টিনার প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে হলুদ কার্ড দেখেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই ডিফেন্ডার।
রেফারি তিন মিনিট অতিরিক্ত সময় যোগ করলেও কোনো দলই গোলের দেখা পায়নি। ফলে উত্তেজনাপূর্ণ প্রথমার্ধ শেষে গোলশূন্য সমতায় বিরতিতে যায় আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড।