স্পেন-ফ্রান্স ম্যাচ © সংগৃহীত
বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা ফ্রান্সকে সেমিফাইনালে থামিয়ে দিল স্পেন। টুর্নামেন্টজুড়ে দাপুটে ফুটবল খেলা দিদিয়ের দেশমের দলটি শেষ চারে এসে নিজেদের সেরাটা দিতে ব্যর্থ। ফলে স্পেনের কাছে ২-০ গোলে হেরে সেমিফাইনাল থেকেই বিদায় নিতে হলো ফরাসিদের।
পুরো আসরে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দিয়ে ফাইনালের অন্যতম দাবিদার হয়ে উঠেছিল ফ্রান্স। সেমিফাইনালেও অনেকের চোখে ফেবারিট ছিল কিলিয়ান এমবাপ্পেদের দল। তবে স্পেনের গতিময় আক্রমণ ও নিয়ন্ত্রিত ফুটবলের সামনে শুরু থেকেই চাপে ছিল তারা। এতে দারুণ সমন্বিত পারফরম্যান্সে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখে দুই গোলের ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে ফাইনালের টিকিট পেয়ে গেল স্পেন।
ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল নিয়ে নিজেদের ছন্দে খেলতে থাকে স্পেন। অন্যদিকে রক্ষণ গুছিয়ে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ওঠার কৌশল বেছে নেয় ফ্রান্স। তৃতীয় মিনিটেই লামিন ইয়ামালকে শক্ত ট্যাকলে থামিয়ে দেন আদ্রিয়াঁ রাবিও। পরের আক্রমণে কিলিয়ান এমবাপ্পের অগ্রযাত্রাও রুখে দেন ফাবিয়ান রুইজ।
নবম মিনিটে বক্সের ঠিক বাইরে ফ্রি-কিক পায় স্পেন। দানি ওলমোকে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখেন রাবিও। তবে দারুণ অবস্থান থেকে পাওয়া সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি লা রোজারা।
ম্যাচের ২০তম মিনিটে কাঙ্ক্ষিত ব্রেক-থ্রু পেয়ে যায় স্পেন। বক্সের ভেতরে উঁচু বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে লামিন ইয়ামালকে ফাউল করেন ফরাসি ডিফেন্ডার লুকা দিনিয়ে। সঙ্গে সঙ্গেই পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। স্পট কিক থেকে জোরালো শটে মাইক মেনিয়াঁকে পরাস্ত করে স্পেনকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন মিকেল ওইয়ারসাবাল।
গোলের পরও আক্রমণের ধার কমায়নি স্পেন। অ্যালেক্স বায়েনা, দানি ওলমো ও লামিন ইয়ামালের সমন্বিত আক্রমণে একের পর এক চাপে পড়ে ফরাসি রক্ষণ। ৩৮তম মিনিটে মেনিয়াঁর ভুল পাস থেকে তৈরি হওয়া আক্রমণে দ্বিতীয় গোলের দারুণ সুযোগ পেয়েছিল স্পেন। ওলমোর ব্যাকহিল থেকে ইয়ামাল বল বাড়িয়ে দেন ফাবিয়ান রুইজের দিকে, কিন্তু শেষ মুহূর্তে দায়োতের ট্যাকলে রক্ষা পায় ফ্রান্স।
অন্যদিকে ৩০তম মিনিটে বড় ধাক্কা খায় দিদিয়ের দেশমের দল। পিঠে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন উইলিয়াম সালিবা। তার পরিবর্তে মাঠে নামেন ম্যাকসাঁস লাক্রোয়া।
৩৭তম মিনিটে দূরপাল্লার শটে ভাগ্য পরীক্ষা করেন পেদ্রো পোরো, তবে বল লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। তিন মিনিট পর রাবিওর নিখুঁত থ্রু পাসে স্পেনের রক্ষণ ভেঙে এগিয়ে যান এমবাপ্পে। তবে দ্রুত বক্স ছেড়ে বেরিয়ে এসে দুর্দান্ত দক্ষতায় বিপদ সামাল দেন গোলরক্ষক উনাই সিমন।
প্রথমার্ধে রেফারির কয়েকটি সিদ্ধান্তও আলোচনার জন্ম দেয়। শুরুতেই হলুদ কার্ড দেখা রাবিও পরে আরেকটি কঠিন ট্যাকল করলেও দ্বিতীয় হলুদ থেকে বেঁচে যান। অন্যদিকে রদ্রির ওপর মাইকেল অলিসের স্টাডস-আপ ট্যাকল নিয়েও লাল কার্ডের দাবি ওঠে। শেষ পর্যন্ত আর কোনো গোল না হওয়ায় ১-০ ব্যবধানের লিড নিয়েই বিরতিতে যায় ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন।
বিরতির পরও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে স্পেন। দ্বিতীয়ার্ধের ৫৮তম মিনিটে দানি ওলমোর সঙ্গে দুর্দান্ত ওয়ান-টু পাস খেলে বক্সে ঢুকে নিচু শটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন পেদ্রো পোরো। তার গোলেই ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় লা রোজা।
এর কিছুক্ষণ পর লামিন ইয়ামাল বল জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হয়ে যায়। অন্যদিকে ৬৭তম মিনিটে বক্সের সামনে থেকে এমবাপ্পের কোনাকুনি শট স্পেনের এক ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে অল্পের জন্য পোস্টের বাইরে চলে যায়।
ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম এরপর একাধিক পরিবর্তন আনেন, কিন্তু তাতেও ম্যাচের চিত্র বদলাতে পারেনি দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। বরং ৭৯তম মিনিটে ফের সুযোগ তৈরি করে স্পেন। অ্যালেক্স বায়েনার ক্রসে বক্সে মাথা ছোঁয়ান ফেরান তোরেস, তবে বল চলে যায় পোস্টের পাশ দিয়ে।
ম্যাচের শেষ দিকে স্পেনের রক্ষণে চাপ বাড়ায় ফ্রান্স। একের পর এক আক্রমণে গোলের চেষ্টা করলেও গোলরক্ষক উনাই সিমন ও ডিফেন্ডার মার্ক কুকুরেয়ার দৃঢ়তায় সফল হতে পারেনি তারা।
৮২তম মিনিটে বক্সের বাইরে এসে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে ভুল করেন সিমন, তবে দ্রুত ফিরে এসে প্রতিপক্ষের শট ঠেকিয়ে দেন তিনি। পরের মিনিটে হার্নান্দেজের প্রচেষ্টাও রুখে দেন স্প্যানিশ গোলরক্ষক। ৮৯তম মিনিটে এমবাপ্পের শট চলে যায় গোলবারের ওপর দিয়ে। এরপর তার আরেকটি প্রচেষ্টা পেনাল্টি বক্সের ভেতর থেকে ক্লিয়ার করেন কুকুরেয়া।
শেষ পর্যন্ত আর কোনো গোল না হওয়ায় ২-০ ব্যবধানের জয় নিয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে স্পেন। ২০১০ সালের পর প্রথমবার এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে উঠল লা রোজারা। অন্যদিকে টানা তৃতীয়বার বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন ভেঙে হতাশ হয়ে বিদায় নিল ফ্রান্স।