মরক্কো দল © সংগৃহীত
ধৈর্যের ফল যে শেষ পর্যন্ত মিষ্টিই হয়, হিউস্টনে তারই দারুণ উদাহরণ দেখাল মরক্কো। রুদ্ধশ্বাস ও গোলশূন্য প্রথমার্ধের পর দ্বিতীয়ার্ধে দুর্দান্ত ফুটবল উপহার দিয়ে কানাডাকে ৩-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে অ্যাটলাস লায়ন্সরা। শেষ আটে তাদের প্রতিপক্ষ হবে ফ্রান্স ও প্যারাগুয়ে ম্যাচের বিজয়ী দল।
অন্যদিকে কানাডার জন্য এটি হতাশার বিদায়। স্কোরলাইন ৩-০ হলেও পুরো ম্যাচের চিত্র ছিল ভিন্ন। বিশেষ করে প্রথমার্ধে একাধিক নিশ্চিত গোলের সুযোগ তৈরি করেও সেগুলো কাজে লাগাতে পারেনি উত্তর আমেরিকার দলটি। সেই ব্যর্থতার মূল্যই শেষ পর্যন্ত দিতে হয় তাদের।
ম্যাচের শুরু থেকেই দারুণ আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দেয় কানাডা। প্রথম বাঁশি থেকেই মরক্কোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে একের পর এক আক্রমণ চালায় কানাডিয়ানরা। সেই চাপ থেকে প্রথমার্ধের পুরোটা সময়ই যেন বের হতে পারেনি মরক্কো। এলোমেলো আক্রমণের পাশাপাশি সৃজনশীলতারও স্পষ্ট অভাব দেখা গেছে অ্যাটলাস লায়ন্সদের।
পঞ্চম মিনিটেই এগিয়ে যাওয়ার দারুণ সুযোগ পেয়েছিল কানাডা। লুক দে ফুজেরোলেসের হেড থেকে বল পেয়ে একাই মরক্কোর রক্ষণ ভেঙে এগিয়ে যান জনাথন ডেভিড। গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনুকে কাটিয়েও বাঁ পায়ের শট নেন তিনি। তবে অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় বাম হাত বাড়িয়ে নিশ্চিত গোল রুখে দেন বুনু।
১১তম মিনিটে আবারও গোলের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে কানাডা। মাঝমাঠে বল কেড়ে নিয়ে আলি আহমেদ তা বাড়িয়ে দেন তানি ওলুওয়াসেয়ির কাছে। হালহালকে কাটিয়ে বাঁ পায়ের জোরালো শট নিলেও এবারও বাম পা বাড়িয়ে দুর্দান্ত সেভ করেন বুনু। তার অসাধারণ গোলরক্ষণে দ্বিতীয়বারের মতো নিশ্চিত গোল থেকে বঞ্চিত হয় কানাডা।
অন্যদিকে ১৫তম মিনিটে প্রথম উল্লেখযোগ্য আক্রমণে মরক্কো। তবে সেই আক্রমণ থেকে কানাডার রক্ষণে বড় কোনো হুমকি তৈরি করতে পারেনি আফ্রিকার দলটি। এক মিনিট পর ইসমাইল সাইবারি বল জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হয়। পরে চোটে পড়ে ২২তম মিনিটেই মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন সাইবারি।
প্রথমার্ধের শেষদিকে ম্যাচে উত্তেজনা আরও বাড়ে। ৩৯তম মিনিটে আশরাফ হাকিমি ও রিচি লারিয়ার মধ্যে বাকবিতণ্ডা হলে দুই দলের খেলোয়াড়রা মুখোমুখি অবস্থানে চলে যান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে রেফারি মাইকেল অলিভার হাকিমি ও লারিয়াকে হলুদ কার্ড দেখান। এরপর জনাথন ডেভিড, আজেদিন ওউনাহি এবং এল খান্নুসও হলুদ কার্ড দেখেন। পরে যোগ করা ছয় মিনিটেও গোলের দেখা পায়নি কোনো দলই। ফলে গোলশূন্য সমতায় প্রথমার্ধ শেষ হয়।
বিরতির পর যেন একেবারেই নতুন রূপে ফিরে আসে মরক্কো। ৫০তম মিনিটে ফ্রি-কিক থেকেই আসে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি। অধিনায়ক আশরাফ হাকিমি নিচু পাসে বল বাড়িয়ে দেন আজ্জেদিন উনাহির দিকে। বক্সের ঠিক বাইরে থেকে প্রথম স্পর্শেই নিখুঁত ও জোরালো শটে বল জালে পাঠিয়ে দেন এই মিডফিল্ডার। মুহূর্তেই ম্যাচের গতি বদলে যায়।
গোল হজমের পর সমতায় ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে কানাডা। মরক্কোর রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করে তারা। তবে ৭৯তম মিনিটে বুকানানের দূরপাল্লার এক শক্তিশালী শট দুর্দান্ত ডাইভে রুখে দেন ইয়াসিন বুনু। সেটিই ছিল কানাডার সবচেয়ে বড় সুযোগ।
এর আগে ৬৪তম মিনিটে এক দারুণ আক্রমণ গড়ে তোলে মরক্কো। লম্বা বল থেকে শেষ তৃতীয়াংশে ফাঁকা জায়গায় দৌড়ে ঢুকে পড়েন ব্রাহিম দিয়াজ। বক্সে প্রবেশ করে সতীর্থকে কাটব্যাক দেওয়ার চেষ্টা করলেও কানাডার ডিফেন্ডার শেষ মুহূর্তে বল কেটে বিপদ দূর করে দেন।
৮২তম মিনিটে নিজেদের বক্স থেকে বল নিয়ে দুর্দান্ত এক কাউন্টার অ্যাটাক শুরু করেন তালবি। মাঝমাঠ পেরিয়ে ডান প্রান্তে থাকা ব্রাহিম দিয়াজকে নিখুঁত থ্রু পাস দেন তিনি। দিয়াজ বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বক্সে ঢুকে আবারও উনাহির উদ্দেশে পাস বাড়ান। প্রথম স্পর্শেই শক্তিশালী শটে বল জালে জড়ান উনাহি, সম্পন্ন করেন নিজের জোড়া গোল।
যোগ করা সময়েও লড়াই চালিয়ে যায় কানাডা। তবে ইয়াসিন বুনুর দৃঢ় গোলরক্ষণের সামনে তারা আর কোনো পথ খুঁজে পায়নি। বরং ৯০+৮ মিনিটে দ্রুত এক পাল্টা আক্রমণ থেকে তৃতীয় গোলটি করে মরক্কো। ইলিয়াস দিয়াজের পাস পেয়ে গোলরক্ষক ম্যাক্সিম ক্রেপোকে পরাস্ত করেন বদলি খেলোয়াড় আবদেররাজাক রাহিমি।
এই জয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে যায় মরক্কো। অন্যদিকে স্বাগতিক কানাডার বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয় শেষ ষোলোতেই।