আলফারো © সংগৃহীত
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে বর্তমান রানার্সআপ ফ্রান্সের বিপক্ষে কঠিন লড়াইয়ের অপেক্ষায় প্যারাগুয়ে। প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তা নিয়ে কোনো রাখঢাক করছেন না কোচ গুস্তাভো আলফারো। বরং ফ্রান্সকে তিনি তুলনা করেছেন ‘বৈদ্যুতিক ঝড়’-এর সঙ্গে। তবে একই সঙ্গে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, প্যারাগুয়ে বিশ্বকাপে শুধু অংশ নিতে আসেনি, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেই মাঠে নামবে।
শনিবার ফিলাডেলফিয়ায় শেষ ষোলোর ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে আলফারো বলেন, জার্মানিকে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করার আনন্দ এখন অতীত। নকআউট পর্বে প্রতিটি ম্যাচই নতুন চ্যালেঞ্জ, তাই আগের সাফল্যে আত্মতুষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
প্রতিপক্ষ ফ্রান্সের শক্তি বোঝাতে নিজের শৈশবের একটি স্মৃতি তুলে ধরেন এই আর্জেন্টাইন কোচ। তিনি বলেন, ‘আমি গ্রামের মানুষ। আমরা যখন রাফায়েলায় বৈদ্যুতিক ঝড় দেখতাম, তখন যেখানেই পারতাম আশ্রয় নিতাম। সেখানে বজ্রনিরোধক ছিল না। ফ্রান্সও ঠিক তেমন একটি বৈদ্যুতিক ঝড়। তাদের বজ্রপাত যেকোনো দিক থেকে আসে, আর সেগুলো সরাসরি জালে গিয়ে পড়ে। আমরা জানি সামনে একটি বৈদ্যুতিক ঝড় আসছে। এখন আমাদের খুঁজে বের করতে হবে কীভাবে সেই বজ্রপাত এড়ানো যায়।’
ফ্রান্সের আক্রমণভাগের ফুটবলারদেরও উঁচু প্রশংসা করেন আলফারো। তিনি বলেন, ‘তাদের সামনে খেলা চারজন ফুটবলারের সামর্থ্য অসাধারণ। শুধু ব্যক্তিগত দক্ষতাই নয়, তারা নিজেদের প্রতিভা পুরো দলের জন্য কাজে লাগায়। একজন কোচের জন্য এটিই সবচেয়ে আদর্শ বিষয়। দলের জন্য উজ্জ্বল হওয়া এই প্রতিভাই অন্য দলগুলোর তুলনায় ফ্রান্সকে আলাদা করে তোলে।’
জার্মানির বিপক্ষে ১২০ মিনিট খেলে টাইব্রেকারে জয়ের কারণে শারীরিকভাবে কিছুটা পিছিয়ে থাকার কথাও স্বীকার করেন প্যারাগুয়ে কোচ। তিনি বলেন, ‘আমাদের ১২০ মিনিট খেলতে হয়েছে, এরপর টাইব্রেকারও খেলেছি। আর ফ্রান্স মাত্র ৬০ মিনিটেই ম্যাচ শেষ করে ফেলেছে। তারা আগেভাগেই পাঁচটি পরিবর্তনও করে ফেলেছিল। আগামী ম্যাচে এটিও আমাদের জন্য বাড়তি চাপ হয়ে থাকবে।’
তবে অতীত নিয়ে ভাবতে নারাজ আলফারো। তিনি বলেন, ‘জার্মানির বিপক্ষে যা হয়েছে, সেটি সেখানেই শেষ। আগামীকালের ম্যাচ সম্পূর্ণ নতুন একটি গল্প।’
জার্মানিকে হারানোর পর অনেকেই প্যারাগুয়েকে নতুন চোখে দেখছেন। কিন্তু এতে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়নি বলে জানান তিনি। আলফারো বলেন, ‘জার্মানিকে হারিয়েছি বলে আমি বদলে যাইনি। তৃতীয় হয়ে নকআউটে উঠেছি বলেও বদলাইনি। ফ্রান্সকে হারাতে পারলেও বদলাব না, আবার বিদায় নিলেও বদলাব না। কারণ আমি জানি আমরা কোথা থেকে শুরু করেছিলাম। এক বছর নয় মাস আগে এই দল সবকিছুর বাইরে ছিল। ১৮ পয়েন্টের মধ্যে মাত্র ৫ পয়েন্ট ছিল, একটি গোল করেছিল এবং কোপা আমেরিকায় টানা তিনটি ম্যাচ হেরেছিল।’
তার মতে, সবচেয়ে বড় সাফল্য ১৬ বছর পর প্যারাগুয়েকে আবার বিশ্বকাপে ফিরিয়ে আনা। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে খেলোয়াড়দের দেওয়া নিজের বার্তাও তুলে ধরেন তিনি। আলফারো বলেন, ‘আমি তাদের বলেছিলাম, তোমরা ইতোমধ্যেই জিতে গেছ। এখানে এসে তোমাদের আর কিছু প্রমাণ করার নেই। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমরা এখানে ঘুরতে এসেছি। আমরা এসেছি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে।’
দলের সাফল্যে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস দেখাতেও রাজি নন এই কোচ। তিনি বলেন, ‘এখন মনে হচ্ছে আমরা সবাই নীল চোখের স্বর্ণকেশী মানুষ হয়ে গেছি। বিষয়টি এমন নয়। আমরা যেমন অতটা নিখুঁত নই, তেমনি অতটা খারাপও নই। আগে উত্তেজনা কমতে দিন। তারপর শান্তভাবে বসে দেখব কোথায় আরও ভালো করা যেত এবং কীভাবে নিজেদের উন্নত করা যায়।’
দলের মানসিক দৃঢ়তাকেও সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি বলে মনে করেন আলফারো। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ৪-১ গোলের হারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘ওই ম্যাচের পর থেকেই আমি মানসিকভাবে মুক্ত ছিলাম। এর মানে এই নয় যে আমি জিততে চাই না। আমি খেলোয়াড়দেরও সেটাই বোঝানোর চেষ্টা করেছি। তারা যদি মানসিকভাবে মুক্ত না থাকত, তাহলে ওই হারের পর আর ঘুরে দাঁড়াতে পারত না। আগামীকালের ম্যাচ সাধারণ কোনো ম্যাচ নয়। এটি বিশ্বকাপের শেষ ষোলো, আর প্রতিপক্ষ বিশ্বের এক নম্বর দল।’
সংবাদ সম্মেলনের শেষদিকে প্রতিপক্ষকে হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। আলফারো বলেন, ‘ফ্রান্সের ভাগ্যে আমাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করব তাদের জীবন যতটা সম্ভব কঠিন করে তুলতে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের ম্যাচ খেলার সুযোগ পাওয়া আমাদের জন্য সৌভাগ্যের। সাধারণত বড় দলগুলো প্রীতি ম্যাচ খেলতে রাজি হলে তবেই আমরা এমন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পাই। কিন্তু এটি কোনো প্রীতি ম্যাচ নয়।’
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন দলের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার জুনিয়র আলোনসোও। তিনি মনে করেন, ফিলাডেলফিয়ার আবহাওয়া প্যারাগুয়ের জন্য কিছুটা সুবিধা এনে দিতে পারে। আলোনসো বলেন, ‘এখানকার তাপমাত্রা অন্য শহরগুলোর চেয়ে আলাদা। আমরা এমন আবহাওয়ায় খেলতে অভ্যস্ত। আশা করছি আগামীকালও একটু গরম থাকবে।’
বাইরের সমালোচনা বা প্রশংসা কোনোভাবেই দলকে প্রভাবিত করছে না বলেও জানান এই ডিফেন্ডার। তিনি বলেন, ‘আমরা পেশাদার খেলোয়াড়। তাই জানি, মানুষের মতামত বা সাংবাদিকদের মন্তব্য আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। আমরা জানতাম শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নিজেদের সামর্থ্য নিয়েই লড়তে হবে। সমালোচনা বা প্রশংসা—কোনোটাই আমাদের বদলে দেয় না। প্যারাগুয়েকে সর্বোচ্চ জায়গায় নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়েই আমরা কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছি।’