লিওনেল স্কালোনি © সংগৃহীত
আর্জেন্টিনার ডাগআউটে দাঁড়িয়ে শততম ম্যাচ পরিচালনার অপেক্ষায় লিওনেল স্কালোনি। এই বিশেষ মুহূর্তের আগেই এসেছে আরও বড় সুখবর। বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সফল এই কোচের সঙ্গে নতুন করে পাঁচ বছরের চুক্তি করতে চায় আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)। বিশ্বকাপের মঞ্চে কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচেই কোচ হিসেবে নিজের ১০০তম ম্যাচে দায়িত্ব পালন করবেন তিনি।
৪৮ বছর বয়সী স্কালোনি গত কয়েক বছরে আর্জেন্টিনা ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল অধ্যায়গুলোর একটি রচনা করেছেন। টানা সাফল্য, আন্তর্জাতিক শিরোপা এবং লিওনেল মেসিকে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করে তিনি নিজেকে দেশের অন্যতম সফল কোচ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে কোনো কোচিং অভিজ্ঞতা ছাড়াই অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হিসেবে দায়িত্ব পান স্কালোনি। মাত্র ছয় মাসের জন্য শুরু হওয়া সেই দায়িত্বই পরে স্থায়ী রূপ নেয়। এরপর তার হাত ধরেই ২০২১ ও ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। ২০২২ সালে জেতে ফিনালিসিমা এবং একই বছর কাতারে দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়ে বিশ্বকাপ ট্রফিও ঘরে তোলে আলবিসেলেস্তেরা।
দোহার লুসাইল স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে লিওনেল মেসির সেই মুহূর্ত আর্জেন্টিনা ফুটবলের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখেছিল। এর আগে সর্বশেষ ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বে বিশ্বকাপ জিতেছিল দলটি।
তবে শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না স্কালোনির। ২০১৮ সালে তাকে কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছিলেন কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনা।
ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘স্কালোনি ছেলে হিসেবে ভালো, কিন্তু সে রাস্তার ট্রাফিকও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।’
তিনি সে সময় স্কালোনির পরিবর্তে জেরার্দো মার্তিনোকে আবারও জাতীয় দলের দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষেও মত দিয়েছিলেন।
স্কালোনি নিজে আর্জেন্টিনার হয়ে সাতটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে তরুণ লিওনেল মেসির সতীর্থও ছিলেন তিনি। পরে ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে হোর্হে সাম্পাওলির সহকারী কোচ হিসেবে কাজ করেন। সেই বিশ্বকাপে শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা।
অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব দিয়ে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে ‘লা স্কালোনেতা’ বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সফল জাতীয় দলে পরিণত হয়েছে।
আর্জেন্টিনার কোচ হিসেবে প্রথম ৯৯ ম্যাচে স্কালোনির রেকর্ডও ঈর্ষণীয়। এই সময়ে তিনি ৭২টি ম্যাচে জয় পেয়েছেন, ১৮টি ড্র করেছেন এবং মাত্র ৯টি ম্যাচে হেরেছেন। এছাড়া ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ডও গড়েছেন তিনি।
কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচের আগে নিজের শততম ম্যাচ নিয়ে অনুভূতি জানাতে গিয়ে স্কালোনি বলেন, ‘আমি আসলেই এটা নিয়ে ভাবিনি। মানুষ কী বলবে তা নিয়ে আমি বিশেষ চিন্তিত নই। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মানুষ এই দলের দর্শনের সাথে নিজেদের মেলাতে পেরেছে এবং তারা অনুভব করেছে যে এটি এমন এক জাতীয় দল যা নিজের দেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। যদি তা হয়ে থাকে, তবে সেটাই আমার জন্য যথেষ্ট।’
তিনি আরও বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমি আমার জীবনে জাতীয় দলের হয়ে ১০০টি ম্যাচে পৌঁছানোর কথা কখনোই কল্পনা করিনি। এটি একটি বিশাল সংখ্যা, বিশেষ করে এই জার্সির জন্য। যখন এই মুহূর্তটি আসবে, সেটি হবে অত্যন্ত স্পেশাল।’
নম্র ও শান্ত স্বভাবের স্কালোনি লিওনেল মেসিকে ঘিরে একটি ঐক্যবদ্ধ ও ভারসাম্যপূর্ণ দল গড়ে তুলেছেন। তার কৌশলগত পরিকল্পনাই মেসিকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সেই সাফল্য এনে দিয়েছে, যা দীর্ঘদিন তার অধরা ছিল।
বর্তমানে ৩৯ বছর বয়সী মেসি চলতি বিশ্বকাপে ছয় গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন। স্কালোনির অধীনে তিনি ৭৪ ম্যাচে ৫৮ গোল করেছেন। ম্যাচপ্রতি তার গোলের গড় ০.৭৮। অথচ স্কালোনি দায়িত্ব নেওয়ার আগে ১২৮ ম্যাচে মেসির গোল ছিল ৬৫টি, যেখানে ম্যাচপ্রতি গোলের গড় ছিল ০.৫১।
স্কালোনির সাফল্যে সন্তুষ্ট আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও। স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান চুক্তির মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার আগেই তার সঙ্গে আরও পাঁচ বছরের নতুন চুক্তি করতে চায় এএফএ।
যদিও ২০২৩ সালের নভেম্বরে মারাকানায় ব্রাজিলকে হারানোর পর দায়িত্ব ছাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন স্কালোনি। তবে গত মাসে তিনি জানান, নতুন চুক্তি করতে তার কোনো আপত্তি নেই।
তবে এই মুহূর্তে চুক্তি নবায়ন নয়, বিশ্বকাপই তার একমাত্র লক্ষ্য।
স্কালোনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিশ্বকাপের দিকে মনোযোগ দেওয়া। এটি আমার কাছে কোনো জরুরি বিষয় নয় এবং আমি মনে করি এএফএ-র কাছেও নয়। তবে আমরা সবাই যদি একমত হই এবং সবকিছু ঠিকঠাক থাকে, তবে চুক্তি নবায়নে কোনো সমস্যা হবে বলে আমি মনে করি না।’