কোলাজ ছবি © টিডিসি ফটো
ইনজুড হওয়া, প্রতিপক্ষের টার্গেটে পরিণত হওয়া, পেনাল্টিতে ব্যর্থতা এবং একের পর এক হৃদয়ভাঙা বিদায়—এভাবেই কেটেছে ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমারের শেষ তিনটি বিশ্বকাপ। এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে তার সামনে সুযোগ এসেছে সেই অতীতের যন্ত্রণার জবাব দেওয়ার।
নেইমারের ফুটবলজীবনে বিশ্বকাপ মানে যেন চরম আবেগ, চরম চাপ আর চরম নাটক। ফুটবলের স্বর্গ রাজ্য ব্রাজিলে, সাফল্য কাউকে রাজা বানায়, আর সামান্য ভুলই কাউকে ভিলেন বানাতে যথেষ্ট। কঠিন পরিবেশ সামলাতে এবার কোচ কার্লো আনচেলত্তি আস্থা রেখেছেন নেইমারের ওপর। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বড় ভরসা হয়ে ফিরছেন নেইমার।
৩৪ বছর বয়সে এই আসরটিই হতে পারে নেইমারের শেষ বিশ্বকাপ। ২০১০ সাল থেকে জাতীয় দলে থাকা এই তারকা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন—‘একমাত্র রাজা আছেন, তিনি পেলে।’
২০১০: দুঙ্গার সিদ্ধান্তে বাদ
২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে কোচ দুঙ্গা তাকে দলে নেননি। তখন চাপ থাকা সত্ত্বেও তিনি রোনালদিনহোকে ফেরানোর দিকে ঝুঁকেছিলেন, আর নেইমার ছিলেন সান্তোসে নতুন তারকা হিসেবে উঠে আসা এক বিস্ময় প্রতিভা।
১৯৯৪ বিশ্বকাপজয়ী মিডফিল্ডার দুঙ্গা ২০১০ সালে দল গড়েছিলেন কাকাকে কেন্দ্র করে। ফরোয়ার্ড লাইনে ছিলেন রোবিনহো, লুইস ফাবিয়ানো, নিলমার ও গ্রাফিতে। তবে ব্রাজিল শেষ পর্যন্ত নেদারল্যান্ডসের কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেয়।
২০১৪: অভিষেকে বিশ্বকাপে ভয়াবহ আঘাত
নেইমারের বিশ্বকাপে অভিষেক হয় ২০১৪ সালে ঘরের মাঠে ব্রাজিল বিশ্বকাপে। বার্সেলোনার জার্সিতে দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন নেইমার, কোচ ফেলিপে স্কোলারির অধীনে তিনিই ছিলেন দলের মূল ভরসা। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ৪-১ জয়ে জোড়া গোল করেন নেইমার। এরপর মেক্সিকোর সঙ্গে ড্র এবং ক্যামেরুনের বিপক্ষে আরেকটি জয়ে জোড়া গোল। তবে সবাই বুঝতে পারছিল, তাকে লক্ষ্য করে আক্রমণ বাড়ছে।
স্কোলারি বলেছিলেন, 'নেইমারকে টার্গেট করা হচ্ছিল, আগের ম্যাচগুলোতেই এটা দেখা গেছে। এখনো পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে একটি হলুদ কার্ডও হয়নি।'
কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের ৮৮তম মিনিটে নেইমারের জীবনে কাল হয়ে আসে। কলম্বিয়ার ফুটবলার জুয়ান সুনিগার হাঁটুতে আঘাত লাগে নেইমারের পিঠে। মাঠে লুটিয়ে পড়েন তিনি, স্ট্রেচারে করে মাঠ ছাড়েন। চিকিৎসকেরা জানান, তার তৃতীয় লাম্বার ভার্টিব্রা ভেঙে গেছে। বিশ্বকাপ সেখানেই শেষ।
নেইমার পরে বলেন, ‘এটা আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে খারাপ মুহূর্তগুলোর একটি। আমার স্বপ্ন ভেঙে গেছে। আমি চেষ্টা করেছিলাম উঠতে, কিন্তু পারিনি।’
তিনি আরও জানান, ‘হাসপাতালে আমার পা বাঁকা ছিল, ডাক্তাররা সোজা করছিলেন। আমি ঝাঁকুনি অনুভব করি। আমি পা নাড়াতে পারছিলাম না। আমি কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম।’
ডাক্তাররা জানান, মাত্র দুই সেন্টিমিটার কম হলে তিনি আজীবনের জন্য হুইলচেয়ারে যেতে পারতেন।
এরপর জার্মানির বিপক্ষে সেমিফাইনালে ৭-১ গোলে হেরে যায় ব্রাজিল, যা ইতিহাসে “মিনেইরাও বিপর্যয়” নামে পরিচিত।
২০১৮: আরেকটি ব্যর্থতা
২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপে আবারও স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামে ব্রাজিল। রেকর্ড ২২২ মিলিয়ন ইউরোতে বার্সেলোনা ছেড়ে পিএসজিতে যোগ দিয়েছিলেন যোগ দিয়েছিলেন নেইমার । রাশিয়া বিশ্বকাপে কোচ টিতে দলে ছিলেন কাসেমিরো, আলিসন, কৌতিনহো ও গ্যাব্রিয়েল জেসুস।
শুরুটা ভালো হয়নি সেবারও। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ ১-১ ড্র করলেও নেইমারকে ৯ বার ফাউল করা হয়। এরপর কোস্টারিকা ও সার্বিয়ার বিপক্ষে জয় পেয়ে ব্রাজিল গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়।
কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের কাছে ২-১ গোলেও হেরে বিদায় নেয় ব্রাজিল। ডি ব্রুইনা ও হ্যাজার্ডদের সামনে থেমে যায় নেইমারের স্বপ্ন।
২০২২: কাতার বিশ্বকাপে আবারও কান্না
কাতার বিশ্বকাপেও টিতে ছিলেন প্রধান কোচ। নেইমারের সাথে ছিলেন ভিনিসিয়ুস, রাফিনহা, রদ্রিগো ও কাসেমিরো। শুরুতেই সার্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে ৯ বার ফাউলের শিকার হয়ে গোড়ালির চোট পান নেইমার এবং গ্রুপ পর্বেই ছিটকে যান।
তিনি বলেন, ‘এটা আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলোর একটি। আবারও একই ঘটনা ঘটছে।’
তবে ব্রাজিল এগিয়ে যায় এবং তিনি ফিরে এসে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ৪-১ জয়ে একটি গোল করেন।
কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ ০-০ ড্র হয়। অতিরিক্ত সময়ে নেইমারের অসাধারণ গোলেও জয় ধরা দেয়নি। ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়ায় এবং ব্রাজিল ৪-২ গোলে হেরে যায়।
নেইমার নিজের শটও নিতে পারেননি, কারণ তিনি শেষ শুটার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ম্যাচ শেষে তিনি কাঁদতে থাকেন।
নতুন কোচ কার্লো আনচেলত্তি বলেন, ‘আমি চাই না তারকারা আলাদা কিছু হোক। নেইমারের দায়িত্ব অন্যদের মতোই—দলকে সাহায্য করা।’
২০২৬ বিশ্বকাপ সামনে রেখে আবারও দলে ডাক পেয়েছেন নেইমার। অনেকেই ভেবেছিল তার সময় শেষ, কিন্তু তিনি আবার ফিরে এসেছেন।
বিশ্বকাপ দলে ডাক পেয়ে নেইমার বলেছেন,‘আমি এখন দলে আছি, আমি আছি।’