৯০ দিন নিয়মিত তোকমা খেলে শরীরে যেসব পরিবর্তন আসবে

১৬ আগস্ট ২০২৬, ০৯:০০ AM
 তোকমা

তোকমা © সংগৃহীত

নিয়মিত ও পরিমিত পরিমাণে তোকমা খেলে ৯০ দিনের মধ্যে শরীরে বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে এতে থাকা খাদ্যআঁশ, পলিফেনল ও উদ্ভিজ্জ ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড হজমের উন্নতি, দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখা এবং কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। তবে তোকমা খাওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক পরিমাণ ও পদ্ধতি মেনে চলা জরুরি। শুকনো তোকমা খেলে হজমের সমস্যা হওয়ার পাশাপাশি গলায় আটকে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকতে পারে।

রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেড়ে গেলে হৃদ্‌রোগসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। এ কারণে স্বাস্থ্যকর খাবারের পাশাপাশি প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবারের দিকে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। তোকমা বা বাসিল সিডও এমন একটি খাবার, যাতে প্রচুর খাদ্যআঁশসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে।

তবে শুধু তোকমা খেলেই কোলেস্টেরল বা ট্রাইগ্লিসারাইড নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম ও ওজন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এটি খাদ্যতালিকায় যুক্ত করলে উপকার পাওয়া যেতে পারে।

তোকমা কী?

তোকমা বা বাসিল সিড ছোট কালো রঙের বীজ। পানিতে ভিজিয়ে রাখলে এটি দ্রুত ফুলে ওঠে এবং বীজের চারপাশে জেলির মতো আবরণ তৈরি হয়। এ কারণে শরবত, দই, স্মুদি ও বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে তোকমা খাওয়ার প্রচলন রয়েছে।

তোকমায় খাদ্যআঁশ, পলিফেনল, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, উদ্ভিজ্জ ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড এবং ম্যাগনেশিয়াম ও ক্যালসিয়ামের মতো খনিজ রয়েছে।

ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর) ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউট্রিশন (এনআইএন) প্রণীত ইন্ডিয়ান নিউট্রিশন টেবিলস অনুযায়ী, ১০০ গ্রাম তোকমায় প্রায় ৪৪২ ক্যালরি শক্তি, ১৪-১৫ গ্রাম প্রোটিন, ১৩-১৪ গ্রাম ফ্যাট এবং ৪৪-৪৫ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট থাকে। এতে খাদ্যআঁশের পরিমাণ প্রায় ২২-২৬ গ্রাম। এ ছাড়া ক্যালসিয়াম ৩৫০-৪০০ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেশিয়াম ২৫০-৩০০ মিলিগ্রাম, আয়রন ৯-১২ মিলিগ্রাম এবং পটাশিয়াম ৬০০-৭০০ মিলিগ্রাম থাকতে পারে।

প্রথম মাসে যেসব পরিবর্তন আসতে পারে

তোকমা নিয়মিত খাওয়ার প্রথম মাসেই কিছু পরিবর্তন অনুভব করতে পারেন। পানিতে ভিজলে তোকমা জেলির মতো হয়ে যায়। এতে থাকা খাদ্যআঁশ হজম প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে পারে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে পারে।

ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে। যারা খাবারের মধ্যবর্তী সময়ে বারবার নাশতা করেন, তাদের ক্ষেত্রেও তোকমা পেট ভরা রাখার মাধ্যমে খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।

এ সময় হজমেরও কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে যাদের আগে থেকেই হজমের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে তোকমা খেলে উল্টো পেট ফাঁপা, অস্বস্তি বা অন্যান্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।

প্রথম মাসে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের ওপরও কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। তবে এর পাশাপাশি চিনি ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট কম খাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয় মাসে ওজন ও খাবারের অভ্যাসে পরিবর্তন

দ্বিতীয় মাসে নিয়মিত খাদ্যআঁশ গ্রহণের কারণে ওজন নিয়ন্ত্রণ সহজ হতে পারে। তোকমা পানিতে ভিজে ফুলে যাওয়ায় অল্প পরিমাণ খেলেও পেট ভরা অনুভূতি তৈরি হয়।

এর ফলে অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। একই সঙ্গে অস্বাস্থ্যকর নাশতা ও অতিরিক্ত খাবারের প্রতি আকাঙ্ক্ষাও কিছুটা কমতে পারে। খাদ্যাভ্যাসে এ ধরনের পরিবর্তন ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।

ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকলে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। দ্বিতীয় মাসে মোট কোলেস্টেরলের মাত্রা কমার প্রাথমিক পরিবর্তন এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের উন্নতি দেখা যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তৃতীয় মাসে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডে প্রভাব

নিয়মিত তোকমা খাওয়ার তৃতীয় মাসে এর খাদ্যআঁশের প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে। তোকমায় থাকা দ্রবণীয় খাদ্যআঁশ পরিপাকতন্ত্রে জেলির মতো স্তর তৈরি করে। এটি খাবার থেকে কোলেস্টেরল শোষণের পরিমাণ কমাতে সহায়তা করতে পারে।

একই সঙ্গে শরীর থেকে পিত্ত অ্যাসিড বের হওয়ার প্রক্রিয়াতেও খাদ্যআঁশ ভূমিকা রাখতে পারে। এসব কারণে নিয়মিত তোকমা খেলে রক্তের কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রায় কিছুটা উন্নতি হতে পারে।

তবে এই পরিবর্তন সবার ক্ষেত্রে একই রকম হবে না। খাদ্যাভ্যাস, বয়স, ওজন, শারীরিক পরিশ্রম, অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয় এবং জীবনযাপনের ওপর ফলাফল নির্ভর করতে পারে।

ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে পারে তোকমা

তোকমায় থাকা উচ্চমাত্রার খাদ্যআঁশ ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে সহায়তা করতে পারে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন ৫ গ্রাম তোকমা খেলে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা ১৬.৯৪ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

উচ্চমাত্রার ট্রাইগ্লিসারাইড বিপাকীয় সমস্যা, করোনারি হৃদ্‌রোগ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, তীব্র অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ, ফ্যাটি লিভার, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

তোকমার খাদ্যআঁশ খাবারের পর রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যাওয়া কিছুটা কমাতে পারে। এতে থাকা উদ্ভিজ্জ উপাদান ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতেও সহায়তা করতে পারে।

পেট ভরা রাখতে সহায়তা করে

পানিতে ভিজলে তোকমা কয়েক গুণ ফুলে যায়। ফলে অল্প পরিমাণ তোকমা খাওয়ার পরও দীর্ঘ সময় পেট ভরা অনুভূতি হতে পারে।

এটি অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমাতে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকলে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড নিয়ন্ত্রণ করাও তুলনামূলক সহজ হয়।

অন্ত্রের স্বাস্থ্যের উন্নতি হতে পারে

তোকমা প্রিবায়োটিক হিসেবেও কাজ করতে পারে। অর্থাৎ এটি অন্ত্রে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার কার্যক্রমকে সহায়তা করতে পারে।

অন্ত্রের জীবাণুসমষ্টি বা গাট মাইক্রোবায়োম এবং শরীরে চর্বি বিপাকের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। সঠিক পরিমাণে তোকমা খেলে অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখার পাশাপাশি রক্তের চর্বির কিছু সূচক বা লিপিড মার্কারেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য তোকমার যেসব পুষ্টি উপকারী

তোকমায় থাকা বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—

দ্রবণীয় খাদ্যআঁশ
পলিফেনল
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
উদ্ভিজ্জ ওমেগা-৩ ফ্যাট
ম্যাগনেশিয়াম
ক্যালসিয়াম

এসব উপাদান স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে গ্রহণ করলে হৃদ্‌স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করতে পারে।

প্রতিদিন কীভাবে তোকমা খাবেন?

তোকমা খাওয়ার আগে পানিতে ভিজিয়ে নেওয়া উচিত। সাধারণভাবে ১-২ চা-চামচ তোকমা পানিতে ভিজিয়ে খাওয়া যেতে পারে।

ভেজানো তোকমা সরাসরি খাওয়ার পাশাপাশি দই, স্মুদি, রাতভর ভিজিয়ে রাখা ওটস বা ফলের বাটির সঙ্গে মিশিয়েও খাওয়া যায়।

তবে শুকনো তোকমা সরাসরি খাওয়া উচিত নয়। কারণ তোকমা পানি শোষণ করে দ্রুত ফুলে ওঠে। শুকনো অবস্থায় খেলে এটি গলায় আটকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

কারা তোকমা খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবেন?

তোকমা পরিমিত পরিমাণে এবং সঠিক পদ্ধতিতে খাওয়া জরুরি। শুকনো তোকমা খেলে হজমের সমস্যা হতে পারে। যাদের গিলতে সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে গলায় আটকে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি হতে পারে।

নিয়মিত কোনো ওষুধ খেলে তোকমা খাদ্যতালিকায় যুক্ত করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ কিছু ক্ষেত্রে খাবারের সঙ্গে ওষুধের পারস্পরিক প্রভাব দেখা দিতে পারে।

গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীদেরও নিয়মিত তোকমা খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

তোকমার পাশাপাশি যেসব অভ্যাস জরুরি

কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে শুধু তোকমার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ।

ভূমধ্যসাগরীয় ধাঁচের স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করা, নিয়মিত শরীরচর্চা করা এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুমও গুরুত্বপূর্ণ।

ধূমপান এড়িয়ে চলা উচিত। কারণ ধূমপান খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে পারে এবং হৃদ্‌স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। একই সঙ্গে অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট কম খাওয়াও জরুরি।

সব মিলিয়ে, ৯০ দিন নিয়মিত ও পরিমিত পরিমাণে ভেজানো তোকমা খেলে হজমের উন্নতি, দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

তাসকিনের আঘাত সামলে গ্রিনের সেঞ্চুরি, অপেক্ষা বাড়ছে বাংলাদে…
  • ১৬ আগস্ট ২০২৬
মেসির দুঃখগাথা যেন শেষ হচ্ছেই না
  • ১৬ আগস্ট ২০২৬
ইতিহাস গড়লেন মিরাজ
  • ১৬ আগস্ট ২০২৬
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: মনোনয়নপত্র বাছাই হবে আজ
  • ১৬ আগস্ট ২০২৬
পানিতে ডুবে আপন দুই বোনের মৃত্যু
  • ১৬ আগস্ট ২০২৬
গ্যাস-বুকজ্বালা কমাতে খালি পেটে কুসুম গরম পানি খাচ্ছেন, উপক…
  • ১৬ আগস্ট ২০২৬