প্রায় ১৩ দিন একটানা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে পদত্যাগ করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) উপাচার্য প্রফেসর ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দিন। উপাচার্যের দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী আচরণ এবং দুর্নীতির ফলে তৈরি হওয়া ক্ষোভের বহিপ্রকাশই ছিলো এই আন্দোলন। ডেইলি ক্যাম্পাসের পক্ষ থেকে পাঠকদের উদ্দেশ্যে বশেমুরবিপ্রবির ১৩ দিনের এই অহিংস আন্দোলনের প্রেক্ষাপটসহ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি তুলে ধরা হলো:

শিক্ষার্থী বহিষ্কার এবং উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি: ফেসবুকে একটি পোস্ট দেয়ার অপরাধে ১২ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সদস্য ফাতেমা-তুজ-জিনিয়াকে বহিষ্কারের মাধ্যমে আলোচনায় চলে আসে বিশ্ববিদ্যালয়টি। দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক,শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যর্মীরা বিষয়টির নিন্দা জানায়। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে ১৬ সেপ্টেম্বর বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহার এবং উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ। এসময় উপাচার্যের স্বৈরাচারী আচরণ সহ বিভিন্ন দুর্নীতির তথ্যও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতে থাকে।

চার ছাত্রনেতার ফেসবুক লাইভ: ১৮ সেপ্টেম্বর রাত ৯ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের চার ছাত্রনেতা জাহাঙ্গীর আলম, আবু তাহের, শেখ তারেক এবং বাবুল সিকদার বাবু ফেসবুক লাইভে এসে উপাচার্যের বিভিন্ন দুর্নীতি ও স্বৈরাচারী আচরণ তুলে ধরে আন্দোলনের ঘোষণা দেন। ছাত্রনেতাদের ঘোষণার প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় দিবস হল ও স্বাধীনতা দিবস হল থেকে ওইদিন রাতেই আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনের প্রেক্ষিতে প্রশাসন ওই রাতেই ১৪ টি দাবি মেন নিয়ে একটি অফিস আদেশ প্রকাশ করে। দাবি মেনে নেয়ায় ছাত্রনেতারা আন্দোলন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিলেও সাধারণ শিক্ষার্থীরা তা প্রত্যাখান করে উপাচার্যের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যায়।

১৬ কারণে এক দফা দাবি: বাকস্বাধীনতা হরণ, ম্যুরাল ও শহীদ মিনারের অর্থ আত্মসাৎ, নারী কেলেঙ্কারি, নিয়োগ ও ভর্তি বাণিজ্য, মানসিক নির্যাতন, গোবর বাণিজ্য, নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থতা, অধিক শিক্ষা ব্যয়সহ ১৬ টি কারণ উল্লেখ করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের পদত্যাগের এক দফা দাবি জানায়।
শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা: আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ২১ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে। হলসমূহ বন্ধ করে দিয়ে বিদ্যুৎ,পানি ও খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়। এমনকি আন্দোলন বন্ধ করার জন্য উপাচার্যের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সরাসরি অংশগ্রহণে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করা হয় যাতে প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়। কিন্তু প্রশাসনের এসকল কর্মকান্ডে আন্দোলন স্তিমিত হওয়ার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ আরো বাড়িয়ে দেয় এবং আন্দোলন বেগবান হয়।

সহকারী প্রক্টরের পদত্যাগ ও শিক্ষকদের সমর্থন: শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় পদত্যাগ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর হুমায়ুন কবির। তিনি এটাও নিশ্চিত করেন যে প্রশাসনের নির্দেশেই এই হামলা ঘটে। হুমায়ুন কবির ছাড়াও প্রায় পনেরো জন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পাশে দাড়ান। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারাও ২৪ ঘন্টা ক্যাম্পাসে অবস্থান করতে শুরু করেন। শিক্ষকদের এই সমর্থন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করে।

অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ: শিক্ষার্থীদের ওপর প্রশাসনের নির্দেশে এই ন্যাক্কারজনক হামলার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও বশেমুরবিপ্রবি উপাচার্যপর পদত্যাগ দাবি করে কর্মসূচি পালন করা হয়।

উপাচার্যের কুরুচিকর মন্তব্য: আন্দোলনের মাঝেই শিক্ষার্থীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন উপাচার্য প্রফেসর ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দিন। শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের নামে রাতে ক্যাম্পাসে অবস্থান করে অশ্লীল কর্মকান্ডে লিপ্ত হয় এবং মিডিয়া কভারেজ না দিলে মাত্র দুই ঘন্টায় তিনি সমস্যার সমাধান করে ফেলবেন বলে মন্তব্য করেন। তার এই মন্তব্যের প্রতিবাদে ঝাড়ু মিছিল, লালকার্ড প্রদর্শন,কুশপুত্তলিকাদাহ সহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে শিক্ষার্থীরা।
ইউজিসির তদন্ত কমিটি: বশেমুরবিপ্রবির এমন পরিস্থিতিতে ২৪ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে ইউজিসি। তদন্ত কমিটি ২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বর বশেমুরবিপ্রবিতে তাদের তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে।

ইউজিসির রিপোর্ট ও শিক্ষার্থীদের বিজয়: ইউজিসির তদন্ত দল ২৯ সেপ্টেম্বর তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। যেখানে তদন্ত কমিটি জানায় তারা উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগসমূহের সত্যতা পেয়েছে এবং উপাচার্যের অপসারণের সুপারিশ করে। পরবর্তীতে খোন্দকার নাসিরউদ্দিন রাত সাড়ে ৯ টায় পুলিশ পাহারায় ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন এবং ৩০ তারিখ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন।

প্রশাসনের স্বৈরাচারী আচরণ শিক্ষার্থীদের কতটা প্রতিবাদী করে তুলতে পারে তার উদাহরণ তৈরি করেছে বশেমুরবিপ্রবি। দীর্ঘ ১৩ দিন রোদ,ঝড়,বৃষ্টি উপেক্ষা করে একটানা আন্দোলন করে গেছে শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারীরা মনে করে বশেমুরবিপ্রবির এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিবে অন্যান্য প্রশাসন।
.png)
কর্মসূচি স্থগিত: উপাচার্য পদত্যাগ করায় মঙ্গলবার সকাল ১০ টায় সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা।