ঢাকা শহর সন্নিকটবর্তী এলাকায় ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন (২য় সংশোধিত) প্রকল্প

১০ সরকারি স্কুল তৈরির কাজ শেষ হয়নি ৯ বছরেও

২০ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩৮ PM , আপডেট: ২২ আগস্ট ২০২৬, ০১:১৮ PM
ঢাকা শহর সন্নিকটবর্তী এলাকায় ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন (২য় সংশোধিত) প্রকল্প

ঢাকা শহর সন্নিকটবর্তী এলাকায় ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন (২য় সংশোধিত) প্রকল্প © সংগৃহীত ও সম্পাদিত

ঢাকা শহরের নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ কমানো এবং রাজধানীর সন্নিকটবর্তী এলাকার মানুষের জন্য মানসম্মত সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে নেওয়া ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের কাজ নয় বছরেও শেষ হয়নি। ২০১৭ সালে নেওয়া প্রকল্পটির মূল মেয়াদ ছিল ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত। পরে দুই দফা সংশোধন করে মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয়েছে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত। একই সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয়ও ৬৭৩ কোটি ৪৬ লাখ ৪৬ হাজার টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০৩ কোটি ৭৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকায়। অথচ নয় বছর পেরিয়েও ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনোটিরই নির্মাণকাজ শতভাগ শেষ হয়নি। এর মধ্যে তিনটির নির্মাণকাজ এখনো শুরুই হয়নি।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) ২০২৬ সালের নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষা প্রতিবেদনে ‘ঢাকা শহর সন্নিকটবর্তী এলাকায় ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন (২য় সংশোধিত)’ নামক প্রকল্পটির ধীরগতি, ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা, সম্ভাব্যতা যাচাই না করা, প্রকল্প পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা এবং অবকাঠামো নির্মাণের অগ্রগতির এমন চিত্র উঠে এসেছে।

এক দশকের পথে এক প্রকল্প
প্রায় এক দশক আগে ‘ঢাকা শহর সন্নিকটবর্তী এলাকায় ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন (২য় সংশোধিত)’ প্রকল্পটি ২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২০ সালের ৩০ জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল রাজধানীর নামী সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানোর পাশাপাশি ঢাকার আশপাশের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে মানসম্মত সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া।

প্রকল্পের আওতায় ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ২৭ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য ১০টি সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ নির্মাণের কথা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো সাভারের হেমায়েতপুরের বিলামালিয়া সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, নবীনগরের বাঁশবাড়ী-পাথালিয়া সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ধামরাইয়ের লাকুরিয়াপাড়া সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কেরানীগঞ্জের পশ্চিমদি সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আশুলিয়ার পূর্ব-নরসিংহপুর সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, নারায়ণগঞ্জের খোর্দ্দঘোষপাড়া ও জালকুড়ি সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রূপগঞ্জের পূর্বাচল সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং ঢাকার সাঁতারকুল ও খিলখেত সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ।

প্রকল্প শুরুর পর এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত মোট তিনজন প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রথম প্রকল্প পরিচালক ড. আমিরুল ইসলাম ২০১৭ সালের ২০ ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ড. হারুন-অর-রশীদ প্রায় তিন মাস অতিরিক্ত দায়িত্বে ছিলেন।

অধ্যাপক ড. মীর জাহীদা নাজনীন ২০২১ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) পদে পদায়িত হওয়ায় প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বও অতিরিক্ত হিসেবে পালন করছেন।

প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ১০ তলা একাডেমিক ভবন, জিমনেশিয়াম, শহীদ মিনার, অভ্যন্তরীণ রাস্তা, সীমানাপ্রাচীরসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি আসবাবপত্র, কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সুবিধা, ল্যাবরেটরি, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক সরঞ্জাম এবং বই-পুস্তক সরবরাহের কথা রয়েছে। কিন্তু প্রকল্প অনুমোদনের প্রায় নয় বছর পরও এসব প্রতিষ্ঠানের কোনোটিই পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি।

প্রকল্পের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো হলো সাভারের হেমায়েতপুরের বিলামালিয়া সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, নবীনগরের বাঁশবাড়ী-পাথালিয়া সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ধামরাইয়ের লাকুরিয়াপাড়া সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কেরানীগঞ্জের পশ্চিমদি সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আশুলিয়ার পূর্ব-নরসিংহপুর সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, নারায়ণগঞ্জের খোর্দ্দঘোষপাড়া ও জালকুড়ি সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রূপগঞ্জের পূর্বাচল সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং ঢাকার সাঁতারকুল ও খিলখেত সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ।

তিনটির কাজই শুরু হয়নি
প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় দুটোই বাড়লেও ১০টি প্রতিষ্ঠানের তিনটির নির্মাণকাজ এখনো শুরুই হয়নি। এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৫৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ। আর ১০টি একাডেমিক ভবনের কোনোটিরই নির্মাণকাজ শতভাগ শেষ হয়নি।

সমীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চারটি ভবনের নির্মাণ অগ্রগতি ৮৮ থেকে ৯৩ শতাংশের মধ্যে। দুটি ভবনের অগ্রগতি ৩০ ও ৩৩ শতাংশ এবং আরেকটির মাত্র ১০ শতাংশ।

সবচেয়ে উদ্বেগ নির্মাণ কাজ শুরু না হওয়া এই তিন ভবন নিয়ে। এর মধ্যে একটি বিদ্যালয়ের জমি হস্তান্তর হলেও নির্মাণকাজের চুক্তি সম্পাদনের জন্য দরপত্র মূল্যায়ন চলছে। অপর দুটি বিদ্যালয়ের জমি হস্তান্তরের কাজই এখনো শেষ হয়নি।

ভবন নির্মাণ শেষ না হওয়ায় কোনো বিদ্যালয়েই প্রকল্পের আওতায় একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। ফলে শিক্ষার্থী ভর্তি, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নসহ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য কতটা অর্জিত হয়েছে, তা বাস্তবে মূল্যায়নের সুযোগও তৈরি হয়নি। শুধু ভবন নির্মাণ নয়, বিদ্যালয়গুলোর জন্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, কম্পিউটার ও কম্পিউটার সামগ্রী, ল্যাব, জিম ও সাংস্কৃতিক সরঞ্জাম, খেলাধুলার সামগ্রী এবং বই-পুস্তক কেনার কাজও এখনো শুরু হয়নি।

অন্যদিকে বিদ্যালয়গুলো চালুর আগে ডিপিপি অনুযায়ী বিভিন্ন পদে ২১০টি পদ সৃষ্টির ব্যবস্থা করার কথা থাকলেও সেই প্রক্রিয়াও এখনো শেষ হয়নি। প্রকল্প অফিস থেকে বিলামালিয়া, বাঁশবাড়ী-পাথালিয়া ও লাকুরিয়াপাড়া বিদ্যালয়ের জন্য অধ্যক্ষসহ বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের জনবলের পদ সৃষ্টির উদ্যোগে ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।

তিনটি প্রকল্পের কাজ এখনো শুরু না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মীর জাহীদা নাজনীন বলেন, ‘এখন আমাদের তিন থেকে চারটা সাইট প্রায় কমপ্লিট। এর মধ্যে চারটি দুই মাসের মধ্যে হ্যান্ডওভার করা হবে। আর তিনটির ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়া হয়েছে। এই তিনটিরই বিভিন্ন সমস্যা ছিল। একটা সাইট তিনবার পরিবর্তন হয়েছে। আরেকটা সাইটের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অনেক কষ্টে সেখানে নতুন সাইট খুঁজে পেয়েছি। আরেকটা সাইট পূর্বাচলে। সেখানে কবরস্থান নিয়ে অনেক জটিলতা ছিল। এসব কারণে কাজ বিলম্বিত হয়েছে। কারণ এর সঙ্গে গৃহায়ণ, গণপূর্ত ও রাজউকও জড়িত ছিল। ফলে সিদ্ধান্ত আমরা এককভাবে নিতে পারিনি।’

তিনি বলেন, ‘এই তিনটি সাইটের কাজ নতুন করে এখনো শুরু হয়নি, তবে ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়া হয়েছে। আর চারটি সাইট দুই মাসের মধ্যে কমপ্লিট হয়ে যাবে। বাকি তিনটির মধ্যে একটির ১০ তলা স্ট্রাকচার হয়ে গেছে, আরেকটির আট তলা এবং অন্যটিরও ১০ তলা স্ট্রাকচার হয়ে গেছে। এর মধ্যে একটি ফেব্রুয়ারি বা মার্চের দিকে হ্যান্ডওভার হবে এবং বাকি দুটিও ডিসেম্বরের মধ্যে হ্যান্ডওভার করার চেষ্টা করছি।’

‘তিন থেকে চারটা সাইট প্রায় কমপ্লিট। চারটি দুই মাসের মধ্যে হ্যান্ডওভার করা হবে। আর তিনটির ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়া হয়েছে। এই তিনটিরই বিভিন্ন সমস্যা ছিল। একটা সাইট তিনবার পরিবর্তন হয়েছে। আরেকটা সাইটের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আরেকটা সাইট পূর্বাচলে। সেখানে কবরস্থান নিয়ে অনেক জটিলতা ছিল। এসব কারণে কাজ বিলম্বিত হয়েছে। কারণ এর সঙ্গে গৃহায়ণ, গণপূর্ত ও রাজউকও জড়িত ছিল।’

বেড়েছে প্রকল্পের ব্যয়
সময় বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে প্রকল্পের ব্যয়ও। মূল প্রকল্পটি ৬৭৩ কোটি ৪৬ লাখ ৪৬ হাজার টাকা ব্যয়ে অনুমোদিত হলেও প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৭৫০ কোটি ৪০ লাখ ১০ হাজার টাকা। সর্বশেষ দ্বিতীয় সংশোধনীতে তা আরও বেড়ে হয়েছে ৮০৩ কোটি ৭৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৩০ কোটি ২৮ লাখ ৩৯ হাজার টাকা, যা প্রায় ১৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি।

অন্যদিকে মূল মেয়াদ ২০২০ সালের জুন থেকে বাড়িয়ে প্রথমে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর এবং পরে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। ফলে মূল মেয়াদের তুলনায় প্রকল্পের সময় বেড়েছে ৮৪ মাস বা ২৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মীর জাহীদা নাজনীন বলেন, ‘ব্যয় বাড়বেই। কারণ এটা ছিল ২০১৪ সালের রেট শিডিউলের ভিত্তিতে করা ডিপিপি (ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল)। ভবনগুলোও অনেক বড়। প্রতিটি একাডেমিক ভবন ১০ তলা। এর সঙ্গে অ্যাপ্রোচ রোড, বাউন্ডারি ওয়াল, জিমনেশিয়াম, গার্ডিয়ান শেড, সাবস্টেশনসহ অনেক নির্মাণকাজ আছে।’

তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালের রেট শিডিউল অনুযায়ী ডিপিপি (ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল) তৈরি হয়েছিল। এরপর জমি অধিগ্রহণ করে নির্মাণকাজে যেতে যেতে ২০২২ সালের রেট শিডিউল চলে এসেছে। ফলে নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডও ২০২০ সালে সংশোধন হয়েছে। আগের কোডের সঙ্গে বর্তমান কোডের পার্থক্য আছে। সব মিলিয়ে নির্মাণকাজের ব্যয় বেড়েছে।’

সমীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের মোট সংস্থান ৮০৩ কোটি ৭৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকার বিপরীতে এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত অর্থ ছাড় হয়েছে ৫২৮ কোটি ৩১ লাখ ৩১ হাজার টাকা এবং প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ৪৪৩ কোটি ৮৬ লাখ ৫৪ হাজার টাকা।

যে জটিলতায় আটকে ছিল নির্মাণ
প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে সমীক্ষা প্রতিবেদনে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো, প্রকল্প গ্রহণের আগে কোনো ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা করা হয়নি।

সমীক্ষা দলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রকল্প শুরুর আগে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হলে জমি নির্বাচন, জমির মালিকানা, মামলা-মোকদ্দমা ও অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতাগুলো আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হতো। এতে প্রকল্পের বাস্তবায়ন পরিকল্পনা আরও বাস্তবসম্মত করা যেত এবং সময় ও ব্যয় দুটোই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতো।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে চিহ্নিত জমি মামলা ও মালিকানা জটিলতার কারণে বাতিল করে নতুন করে সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে জমি নির্বাচন করতে হয়েছে। এতে ভবন নির্মাণ শুরুর আগেই দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেছে। প্রকল্পের আওতায় ২০ একর জমি অধিগ্রহণের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় পুরোটা অর্জিত হলেও পূর্ব-নরসিংহপুরে অধিগ্রহণের টাকা পরিশোধের পরও জমি বুঝে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া বিলামালিয়া, পশ্চিমদি ও খোর্দ্দঘোষপাড়া এলাকায় রাস্তা ও সীমানাপ্রাচীর নিয়েও জটিলতা রয়েছে।

সমীক্ষায় প্রকল্পের ধীরগতির পেছনে আরও কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। একনেক অনুমোদন, প্রশাসনিক আদেশ ও কর্মকর্তা নিয়োগে বিলম্বের কারণে কার্যক্রম প্রায় ১১ মাস পর শুরু হয়। এরপর কোভিড-১৯ মহামারির কারণে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। ভূমি অধিগ্রহণে মামলা-মোকদ্দমা ও মালিকানা জটিলতাও প্রকল্পের গতি কমিয়েছে।

এ ছাড়া ভবনের নকশায় পরিবর্তন আনতে গিয়ে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয়েছে। পুরোনো রেট শিডিউলের ভিত্তিতে প্রকল্প অনুমোদিত হওয়ার পর নতুন রেট শিডিউল কার্যকর হওয়ায় ডিপিপি সংশোধন ও অনুমোদনেও সময় লেগেছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে দরপত্র মূল্যায়ন ও প্রকল্প বাস্তবায়নেও বিলম্ব হয়েছে।

প্রথম প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে ভূমি ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগের পর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুদকের তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।

বিলম্বের আরও যত ব্যাখা দিলেন প্রকল্প পরিচালক
প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মীর জাহীদা নাজনীন বলেন, ‘প্রকল্পটি ২০১৭ সালে শুরু হওয়ার কথা ছিল। প্রথম প্রকল্প পরিচালক ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে যোগ দেন। সুতরাং আল্টিমেটলি এটা ২০১৮ সাল থেকে শুরু হয়েছে। এরপর কোভিড এসেছে। এ ধরনের নির্মাণধর্মী প্রকল্পে প্রথম কাজই হচ্ছে জমি অধিগ্রহণ, আর জমি অধিগ্রহণের আগে জমি নির্বাচন করতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘এখানে মন্ত্রণালয়ের একটি নির্ধারিত হাইপ্রোফাইল কমিটি আছে। তারা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে জমি দেখে। এরপর প্রস্তাব ডিসি অফিসে পাঠানো হয়। কোভিডের কারণে ওই সময় জমি পরিদর্শনসহ এসব কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। ২০২০ এবং ২০২১ সালে তো আমরা স্বাভাবিকভাবে বাইরে যেতে পারিনি। ফলে এসব কাজও এগোয়নি। আমি ২০২১ সালের জানুয়ারিতে যোগ দেওয়ার পর পরিস্থিতি একটু ভালো হলে আমরা জমিগুলো পরিদর্শন করি এবং অধিগ্রহণের কার্যক্রম সম্পন্ন করি। মূলত জমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে।’

কোনো বড় প্রকল্প নেওয়ার আগে ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি মূলত যাচাই করে প্রকল্পটি বাস্তবে করা সম্ভব কি না, কোথায় সমস্যা হতে পারে এবং কত টাকা ও কত সময় লাগতে পারে। কিন্তু ১০ সরকারি স্কুলের প্রকল্পের ক্ষেত্রে ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয় নি। ফলে জমি নির্বাচন, জমি অধিগ্রহণ, মালিকানা বিরোধ ও আইনি জটিলতা চিহ্নিত করতে দেরি হয়েছে।

ফিজিবিলিটি স্টাডি না হওয়া নিয়ে এই প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘নিয়ম হচ্ছে, প্রকল্প শুরু করার আগে ফিজিবিলিটি স্টাডি করতে হয়। তখন আমি  এই প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলাম না। তাই ফিজিবিলিটি স্টাডি কেন হয়নি এটা আমি বলতে পারব না।’ প্রথম প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে ভূমি ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগের কারণে কাজের ধীরগতির কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘আমার আগের যিনি প্রকল্প পরিচালক ছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে কিছু মামলা হয়েছিল। বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়া, টেলিভিশন ও অন্যান্য মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে অনেক লেখালেখি ও প্রতিবেদন হয়েছিল। ফলে ২০১৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রকল্পের কাজের পাশাপাশি এসব বিষয় সামলাতেও সময় গেছে। এমনকি আমি আসার পরও এসব বিষয়ে অনেক কাগজপত্র দিতে হয়েছে।’

‘পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক দেওয়ার জন্য আমি বারবার আবেদন করেছি, চিঠিও পাঠিয়েছি। কিন্তু এখনো দেওয়া হয়নি।পূর্ণকালীন একজন থাকা তো দরকার। এখন প্রকল্পের খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময় যাচ্ছে, পিক টাইম যাচ্ছে। এই সময়ে একজন পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক খুবই দরকার।’-অধ্যাপক ড. মীর জাহীদা নাজনীন, প্রকল্প পরিচালক

সমীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও বিদ্যালয় চালু করতে শিক্ষক-কর্মচারীর পদ সৃষ্টি, জনবল নিয়োগ, আসবাবপত্র ও শিক্ষা উপকরণ সরবরাহসহ একাধিক কাজ সম্পন্ন করতে হবে। ফলে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ শেষ করলেই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য অর্জিত হবে না।

অন্যদিকে পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক না থাকায় প্রকল্পের নিবিড় তদারকি, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয় এবং সময়মতো কাজ শেষ করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে সমীক্ষা দল।

পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক না থাকা প্রসঙ্গে অধ্যাপক ড. মীর জাহীদা নাজনীন বলেন, ‘পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক দেওয়ার জন্য আমি বারবার আবেদন করেছি, চিঠিও পাঠিয়েছি। কিন্তু এখনো দেওয়া হয়নি।পূর্ণকালীন একজন থাকা তো দরকার। এখন প্রকল্পের খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময় যাচ্ছে, পিক টাইম যাচ্ছে। এই সময়ে একজন পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক খুবই দরকার।’

উদ্দেশ্য এখনো অধরা
ঢাকার সন্নিকটবর্তী এলাকায় সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ কমানো এবং সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্মত শিক্ষা সহজলভ্য করাই ছিল প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া অভিভাবকদের বড় অংশ নতুন বিদ্যালয় চালু হলে শিক্ষার মান উন্নয়ন, আধুনিক অবকাঠামো, যাতায়াতে সময় ও ব্যয় সাশ্রয়, মেয়েদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া কমার প্রত্যাশা জানিয়েছেন। এর মধ্যে ৮০ দশমিক ৫০ শতাংশ অভিভাবক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের প্রত্যাশা করেছেন। আধুনিক শিক্ষা উপকরণ ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা জানিয়েছেন ৭৮ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং যাতায়াতের সময় ও ব্যয় কমার প্রত্যাশা করেছেন ৭৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। 

তিন বছরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যে ২০১৭ সালে শুরু হওয়া ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের নয় বছর পেরিয়ে গেল। বিপুল অর্থ ব্যয় ও দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও প্রকল্পের মূল সুফল অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ কবে নাগাদ বাস্তবে পৌঁছাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ড. রুবাইয়া মুর্শেদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘প্রশ্ন হচ্ছে একটি এলাকায় জনসংখ্যার অনুপাতে কতটি স্কুল প্রয়োজন। ওই এলাকার শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে না কেন? স্কুলের অভাবে, নাকি স্কুল থাকা সত্ত্বেও অন্য কোনো কারণে যাচ্ছে না এ বিষয়গুলো আগে যাচাই করা দরকার। অর্থাৎ, প্রকল্প নেওয়ার আগে ফিজিবিলিটি স্টাডির মাধ্যমে প্রকৃত প্রয়োজন ও সম্ভাব্যতা নির্ধারণ করা জরুরি ছিল।’

তিনি বলেন, ‘এখানে একটি রাজনৈতিক অর্থনীতির বিষয়ও আছে। অবশ্যই এর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও আর্থিক বিষয় জড়িত। কারণ প্রকল্পটির সঙ্গে অনেক অর্থ এবং অনেক স্টেকহোল্ডারের স্বার্থ জড়িত। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে এর দায় নির্ধারণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।’

প্রকল্পের সময়মতো বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একটি প্রকল্প দশ বছরে শেষ করার কথা বলা হলো, কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। এর পেছনে ফিজিবিলিটি স্টাডি না থাকা থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় দেখতে হবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ না হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা যাবে  এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকা দরকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সিস্টেমে সময়মতো প্রকল্প শেষ করার জন্য যথেষ্ট প্রণোদনা নেই। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারলেও যদি কারও চাকরি বা দায়িত্বের ক্ষেত্রে কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে বরং প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লে আরও অর্থ বরাদ্দের সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে সময়মতো কাজ শেষ করার তাগিদ কমে যায়। এটা মানুষের প্রাকৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃতিক আচরণ ও প্রণোদনার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে সহজেই বোঝা যায়।’

শুধু নতুন স্কুল নির্মাণ করলেই শিক্ষার সুযোগ বাড়বে এমন ধারণার সঙ্গে একমত নন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘শুধু স্কুলের সংখ্যা বাড়ালেই শিক্ষার মান বা সুযোগ নিশ্চিত হবে বিষয়টি এমন নয়। আমাদের বিদ্যমান অনেক স্কুলেই শিক্ষক সংকট রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে একজন শিক্ষককে একাধিক বিষয় পড়াতে হচ্ছে। শিক্ষকদেরও যথেষ্ট প্রণোদনার অভাব রয়েছে। ফলে বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থার যে সমস্যাগুলো রয়েছে, সেগুলো সমাধান না করে শুধু নতুন স্কুলের সংখ্যা বাড়ালে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। তাই নতুন স্কুল নির্মাণের পাশাপাশি শিক্ষক, একাডেমিক প্রস্তুতি, শিক্ষাদান-সংক্রান্ত রিসোর্স ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধায় বিনিয়োগ করাও খুব গুরুত্বপূর্ণ।’

চট্টগ্রাম বোর্ডের এইচএসসির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রশ্ন …
  • ২২ আগস্ট ২০২৬
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে চাকরি, আবেদন ৩০ আগস্ট পর্যন্ত
  • ২২ আগস্ট ২০২৬
দেশে পৌঁছাল কলকাতায় হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাজুর মরদেহ
  • ২২ আগস্ট ২০২৬
শরীফুল ম্যাজিকে আশা বাঁচিয়ে রাখল বাংলাদেশ
  • ২২ আগস্ট ২০২৬
ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ গেল স্কুলশিক্ষকের মেয়ের
  • ২২ আগস্ট ২০২৬
২৪ ঘণ্টায় শিক্ষকদের বদলির জন্য যত আবেদন পড়ল
  • ২২ আগস্ট ২০২৬