পরীক্ষার্থী © ফাইল ছবি
চলমান উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় ইংরেজি ভার্সনের প্রশ্নপত্রে ধারাবাহিক অনুবাদ ভুল, গাণিতিক তথ্যের অসংগতি এবং বৈজ্ঞানিক পরিভাষা বিকৃতির অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরীক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, প্রশ্নপত্রে বারবার এমন ভুল হওয়ায় তারা বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের তুলনায় বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন এবং পরীক্ষায় সঠিকভাবে উত্তর দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) অধীনে দেশে বাংলা মাধ্যম ও ইংরেজি ভার্সন—দুই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চালু থাকলেও শিক্ষা বোর্ডগুলো ইংরেজি ভার্সনের প্রশ্নপত্র প্রস্তুতের ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। প্রশ্নপত্র প্রথমে বাংলায় তৈরি করে পরে সাধারণ অনুবাদকদের মাধ্যমে ইংরেজিতে রূপান্তর করা হয়। বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের যথাযথ পর্যালোচনা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে আক্ষরিক অনুবাদে প্রশ্নের অর্থই বদলে যাচ্ছে।
শিক্ষার্থীরা জানান, প্রথম চারটি ভাষাভিত্তিক বিষয়ে অনুবাদের প্রয়োজন না থাকলেও পরবর্তী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ের প্রায় সব পরীক্ষায় গুরুতর ত্রুটি দেখা গেছে। বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞান প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) পরীক্ষায় এমন ভুল হয়েছে, যা প্রশ্নের মূল ধারণাকেই পরিবর্তন করে দিয়েছে।
পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের বহুনির্বাচনি অংশে একটি প্রশ্নে দক্ষতা (Efficiency) ও সরবরাহকৃত শক্তির (Energy) গুণফল নির্ণয়ের কথা থাকলেও ইংরেজি ভার্সনে ‘Energy’-এর পরিবর্তে ‘Power’ লেখা হয়। ফলে বাংলা ভার্সনে যেখানে উত্তর হবে ‘Work Done’, সেখানে ইংরেজি ভার্সনের প্রশ্ন অনুযায়ী উত্তর দাঁড়ায় ‘Power Obtained’। অথচ দুটি উত্তরই বিকল্প হিসেবে দেওয়া ছিল।

এ ছাড়া অষ্টম সৃজনশীল প্রশ্নে ‘Overtone’ এবং ‘Beat’—দুটি ভিন্ন শব্দকে একইভাবে ‘Note’ হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছে। এতে তরঙ্গ-সংক্রান্ত হিসাবের ভিত্তিই পরিবর্তিত হয়ে যায়। ষষ্ঠ প্রশ্নে ‘এক-তৃতীয়াংশ কমানো হয়েছে’ বাক্যাংশকে ‘এক-তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনা হয়েছে’ হিসেবে অনুবাদ করায় গাণিতিক মানের পার্থক্য তৈরি হয়। সপ্তম প্রশ্নে বাংলা ভার্সনে একটি ভেক্টরের মান +120ĵ থাকলেও ইংরেজি ভার্সনে তা -120ĵ ছাপা হয়েছে।

একই ধরনের অসঙ্গতি দেখা গেছে পদার্থবিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র ও আইসিটি পরীক্ষাতেও। পদার্থবিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্রের চতুর্থ সৃজনশীল প্রশ্নে বাংলা ভার্সনে থাকা ‘সাম্যাবস্থা’ (Equilibrium)-এর শর্তটি ইংরেজি ভার্সনে বাদ পড়ে। ষষ্ঠ প্রশ্নে বাংলা ভার্সনে উল্লেখ থাকা ‘P’ বিন্দুর তথ্যও ইংরেজি ভার্সনের প্রশ্নপত্রে ছিল না। ফলে দুই মাধ্যমে একই পরীক্ষার প্রশ্নে তথ্যগত পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, ইংরেজি ভার্সনের প্রশ্নপত্রে ভাষাগত ও অনুবাদজনিত ত্রুটির অভিযোগ প্রায় প্রতি বছরই ওঠে। চলতি বছরের অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি বিষয়টি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ শাখায় আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আন্তঃশিক্ষা সমন্বয় বোর্ড সভাপতি এবং ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, ভবিষ্যতে ইংরেজি ভার্সনের প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও পর্যালোচনার জন্য বিষয়ভিত্তিক যোগ্য বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে আগামী দিনের পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রের ভুল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নটরডেম কলেজের পদার্থ বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক রোজারিও বলেন, পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরিতে শুধু সাধারণ অনুবাদকের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। ভাষাবিদ ও বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে যৌথ মডারেশন প্যানেল গঠন করে প্রশ্নপত্রের প্রতিটি শব্দ, বাক্য এবং বৈজ্ঞানিক তথ্য একসঙ্গে যাচাই করতে হবে। তার মতে, বৈজ্ঞানিক পরিভাষা ও গাণিতিক প্রেক্ষাপটের কোনো বিকৃতি গ্রহণযোগ্য নয়। তাই চূড়ান্তভাবে প্রশ্নপত্র প্রকাশের আগে এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তক এবং মূল বাংলা প্রশ্নপত্রের সঙ্গে প্রতিটি অনুবাদ সতর্কতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।