ফুলবাড়ীয়া সরকারি মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও আবু ওবায়দা © ফাইল ছবি
যোগ্য না হয়েও ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া সরকারি মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আবু ওবায়দা সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পান বলে প্রমাণ পেয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) আঞ্চলিক কার্যালয় কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটি। এছাড়া আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিদ্যালয়ের সম্পদ আত্মসাতের নানা অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে।
গত ৩ মে জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য কমপক্ষে ১২ বছরের শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক কাজের অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু আবু ওবায়দার ক্ষেত্রে এ নিয়মের লঙ্ঘন করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, আবু ওবায়দা ২০০২ সালের ১ জুলােই সহকারী শিক্ষক হিসেবে এমপিওভুক্ত হন। এমপিওভুক্তির মাত্র ৭ বছর ৫ মাস ৯ দিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন। অর্থাৎ সহকারী প্রধান পদে নিয়োগের প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার চেয়ে সাড়ে ৪ বছরের অভিজ্ঞতার ঘাটতি ছিল আবু ওবায়দার। এর ফলে তার নিয়োগটি বিধি সম্মত হয়নি বলে জানিয়েছে তদন্ত কমিটি।
তদন্ত প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক-কর্মচারীদের লিখিত ও মৌখিক বক্তব্যে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু ওবায়দার নানা আর্থিক অনিয়ম ও একক কর্তৃত্বের একাধিক অভিযোগ উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র শিক্ষক এবং শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক মো. হারুনুর রশিদ তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের সব আর্থিক লেনদেন নিজেই পরিচালনা করতেন এবং বিভিন্ন ব্যয়ের ভাউচারে শিক্ষকদের স্বাক্ষর করতে বাধ্য করতেন। কোনো শিক্ষক কোনো হিসাব চাইলে তাকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাতেন।
সহকারী প্রধান পদে নিয়োগের প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার চেয়ে সাড়ে ৪ বছরের অভিজ্ঞতার ঘাটতি ছিল আবু ওবায়দার। এর ফলে তার নিয়োগটি বিধি সম্মত হয়নি বলে জানিয়েছে তদন্ত কমিটি।
সিনিয়র শিক্ষক (গণিত) মো. আশরাফুল আলম তার অভিযোগে বিদ্যালয়ের প্রধান ফটক ও প্রধান শিক্ষকের বাসভবনের অংশ নিলাম ছাড়াই ভেঙে ফেলা হয়। সেখানকার ইট ও গ্রিল ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন আবু ওবায়দা। বিদ্যালয়ের দুটি গাছ কেটে নিজের বাসার আসবাব তৈরির অভিযোগও করা হয়েছে।
এছাড়া চুন, রং ও বাউন্ডারি নির্মাণের নামে ভুয়া ভাউচার তৈরি করে অর্থ আত্মসাৎ, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নামে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো, ফরম পূরণে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, পুরোনো আসবাবপত্র ও পরীক্ষার উত্তরপত্র বিক্রি এবং বিদ্যালয়ের কেচি গেট বিক্রির অভিযোগও করা হয়েছে আবু ওবায়দার বিরুদ্ধে।
তদন্ত কমিটির কাছে বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করে জানান, প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও ফাইল বিদ্যালয়ে সংরক্ষণ করেন না আবু ওবায়দা। এগুলো নিজের বাসায় রাখেন তিনি। শিক্ষার্থীদের টিফিনে নিম্নমানের খাবার সরবরাহ এবং বিশুদ্ধ পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও করেননি তিনি।
বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মো. লুৎফর রহমান তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষকদের সমন্বয়হীনতা ও আর্থিক অস্বচ্ছতা ছিল। সহকারী শিক্ষক রাবেয়া সিদ্দিকি বলেন, হিসাব-নিকাশ প্রশ্ন তুললেই প্রধান শিক্ষক তাদের সঙ্গে রাগারাগি করতেন। শিক্ষকদের জোর করে ভাউচারে স্বাক্ষর করাতেন।
সিনিয়র শিক্ষক সাফিয়া বেগম শোভা অভিযোগ করেন, নারী শিক্ষকদের জন্য আলাদা নামজ কক্ষের ব্যবস্থা করেননি আবু ওবায়দা। ক্লাস রুটিন প্রণয়নেও অসংগতি ছিল। বিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী নানা কাজে কাউকে মতামত দেওয়ার সুযোগ দেন না আবু ওবায়দা।
যদিও তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আবু ওবায়দা। তিনি তার লিখিত বক্তব্যে বলেছেন, অভিযোগগুলো মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তদন্ত প্রতিবেদনের সার্বিক পর্যবেক্ষণে মাউশির আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন উল্লেখ করেন, শিক্ষক-কর্মচারীদের লিখিত ও মৌখিক বক্তব্য পর্যালোচনায় আর্থিক লেনদেন ও ব্যয় ভাউচার সংক্রান্ত অসঙ্গতির বিষয়টি প্রতীয়মান হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন কমিটির কাজে হস্তক্ষেপের অভিযোগও গুরুত্বসহকারে উঠে আসে।
প্রতিবেদনে বিদ্যালয়ে দ্রুত একজন দক্ষ প্রধান শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি বিধি বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের ওপর নিরীক্ষা পরিচালনার সুপারিশ করা হয়।