অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক মো. আনোয়ার হোসেন © ফাইল ছবি
কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার শংকর মাধবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ের সহকারী শিক্ষক শাহনাজ পারভীনের এরিয়া বিলের ফাইল ফরোয়ার্ডিং করার বিনিময়ে তিন মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ ঘুষ হিসেবে দাবির অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক মো. আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
যদিও এটিকে ঘুষ বলতে নারাজ প্রধান শিক্ষক মো. আনোয়ার হোসেন। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘শাহনাজ পারভীনের মিথ্যা অভিযোগের কারণে আমার বেতন তিন মাস বন্ধ ছিল। সেই অর্থ দিতে শাহনাজের স্বামী আমার সাথে চুক্তি করেছেন। তবে চুক্তি এখনো বাস্তবায়ন না হওয়ায় আমি ফাইল ফরোয়ার্ড করিনি। উপজেলা মাধ্যমিক কর্মকর্তার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা চলছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০২ সালে শংকর মাধবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে সমাজ বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন শাহনাজ পারভীন। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে এমপিওভুক্ত হন তিনি। বিদ্যালয়ের ১৯৯৫ সালের জনবল কাঠামো অনুযায়ী সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ে তিনজন শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ থাকায় আলী আকবর, আব্দুল করিম ও শাহনাজ ওই পদে নিয়োগ পান। পরবর্তীতে ২০১০ সালের নতুন জনবল কাঠামোতে (যা ২০১২ সালে কার্যকর হয়) বাংলা, ইংরেজি ও সমাজ বিজ্ঞানে একজন করে শিক্ষক রাখার সিদ্ধান্ত হয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটি ২০১৩ সালের বৈঠকে আলী আকবরকে বাংলা, আব্দুল করিমকে ইংরেজি এবং শাহনাজ পারভীনকে সমাজ বিজ্ঞানে ক্লাস নেওয়ার দায়িত্ব দেয়।
‘এ ধরনের ঘটনা আমার জানা নেই। এমপিও স্থগিতের অর্থ কোনোভাবেই শিক্ষকের কাছে চাইতে পারেন না প্রধান শিক্ষক। আমার কাছে এ ধরনের কোনো অভিযোগ জমা হয়নি। অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’—প্রফেসর মো: আমির আলী, পরিচালক, আঞ্চলিক কার্যালয় মাউশি
অভিযোগ রয়েছে, প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন ভুয়া মিটিং দেখিয়ে পুনরায় আব্দুল করিমকে সমাজ বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে পদায়ন করেন। এ ঘটনায় শাহনাজ পারভীন আদালতে মামলা করলে তাকে বৈধ সমাজ বিজ্ঞান শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি দেন আদালত।
২০১৯ সালে এমপিওভুক্তির পর প্রধান শিক্ষক শাহনাজ পারভীন ও আব্দুল করিম— উভয়কে সমাজ বিজ্ঞানের শিক্ষক উল্লেখ করে বিলের আবেদন পাঠান। বিষয়টি জেলা শিক্ষা অফিসার ও রংপুরের তৎকালীন উপপরিচালক বাতিল করে দেন। বাতিলের নোটিশে শাহনাজ পারভীনের বেতন সমাজ বিজ্ঞানে এবং আব্দুল করিমের বেতন ইংরেজি বিষয়ে করে পুনরায় আবেদন করতে বলেন। এছাড়া প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়মের কারণে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে তার তিন মাসের বেতন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।
অভিযোগ রয়েছে, এরিয়া বিল পাঠানোর জন্য প্রধান শিক্ষক শাহনাজ পারভীনের কাছ থেকে একদফায় ২০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন মো. আনোয়ার হোসেনে। টাকা নেওয়ার পরও তার আবেদন বাতিল করে কেবল আব্দুল করিমের ফাইল পাঠানো হয়। ফলে আব্দুল করিম এরিয়া বিল পেলেও শাহনাজ পারভীন তা পাননি। উল্টো প্রধান শিক্ষক বর্তমানে তিন মাসের সমপরিমাণ বেতনের টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে দাবি করছেন শাহনাজ পারভীনের কাছে।
এ প্রসঙ্গে শাহনাজ পারভীন বলেন, ‘আমি বৈধভাবে সমাজ বিজ্ঞান শিক্ষক হলেও দীর্ঘদিন ধরে বেতন পাচ্ছি না। উল্টো প্রধান শিক্ষক আমাকে হয়রানি করছেন। প্রধান শিক্ষক আমার কাছে তিন মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ দাবি করেছেন। এই টাকা না দেওয়ায় আমার এরিয়া বিল তিনি ফরোয়ার্ড করে পাঠাচ্ছেন না।’
এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে তিন মাসের বেতন আটকে দেওয়া হয়েছে। আসলে প্রতিষ্ঠান সভাপতির দায় আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। সভাপতি স্বাক্ষর না করায় ফাইল ফরোয়ার্ড করা যায়নি। তবে শাহনাজ পারভীন সেই দায় আমার ওপর দিয়ে অভিযোগ করেছেন। যার ফলে আমার তিন মাসের বেতন বন্ধ হয়ে যায়। আমার এই বেতন ফেরত দিতে আমার সঙ্গে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে একটি চুক্তি করা হয়েছে।’
আপনার বিরুদ্ধে করা অভিযোগ মিথ্যা হলে আপিল করেছিলেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপিল করেছিলাম। তবে সেটি টেকেনি।’ আপনার বেতন কর্তন করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। সেই অর্থ একজন শিক্ষক কীভাবে ফেরত দেবেন? ফেরত দেওয়ার চুক্তি করা সঠিক কি না জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, ‘যদি না পারে, তাহলে চুক্তি করেছে কেন। তাদের অভিযোগের কারণেই আমার এমপিও স্থগিত করা হয়েছিল। সেজন্য চুক্তি করা হয়।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশির রংপুর অঞ্চলের পরিচালক প্রফেসর মো: আমির আলী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা আমার জানা নেই। এমপিও স্থগিতের অর্থ কোনোভাবেই শিক্ষকের কাছে চাইতে পারেন না প্রধান শিক্ষক। আমার কাছে এ ধরনের কোনো অভিযোগ জমা হয়নি। অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’