© ফাইল ফটো
বিতর্ক-বিদ্রোহ পিছু ছাড়ছে না জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের। ২৭ বছর পর কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি করতে গিয়ে বড় বিদ্রোহের মুখে পড়ে বিএনপির ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনটি। সদ্য ঘোষিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯১ সদস্যের কমিটিতে একটি গ্রুপ থেকেই শীর্ষ দুই পদসহ প্রায় ৪৭টি পদ আসায় বাদ পড়েছেন সংগঠনটির অনেক কর্মীবান্ধব, ত্যাগী, পরিশ্রমী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীরা। অনেকের ক্ষেত্রে যথাযথ মূল্যায়ন না পাওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে সংগঠনটিতে।
খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, সদ্য সদ্য ঘোষিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯১ সদস্যের কমিটিতে আহবায়ক হয়েছেন রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সদস্য সচিব হয়েছেন আমান উল্লাহ আমান। তারা উভয়ই সাবেক ছাত্রদল সভাপতি ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সদস্য সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর অনুসারী এবং গত কাউন্সিলে তারা টুকু’র প্রার্থী কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবনের পক্ষে নির্বাচনে কাজ করেছেন। নির্বাচনে শ্রাবন পদে আসতে না পারায় ঢাবি ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার সিদ্দিকী’র পরামর্শক্রমে আমান যোগ দেন নির্বাচিত সভাপতি ফজলুর রহমান খোকনের গ্রুপে।
ঢাবি ছাত্রদলের কমিটিতে আহবায়ক হিসেবে রাকিব, শ্রাবনের এবং আমান, বাশারের অনুসারী হিসেবে পদপ্রাপ্ত হন। শ্রাবন ও বাশার উভয়ই সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর অনুসারী। বিষয়টিতে ক্ষুব্ধ সংগঠনটির একটি বৃহৎ অংশ। এর জেরে সংগঠনটির মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে গেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি হল শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক বলেন, দিনের পর দিন পরিবারকে ফেলে, বাবা মায়ের ভালবাসা দূরে ঠেলে সংগঠনকে সময় দিয়েছি। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে যে সংগঠনের জন্য মার খেলাম, জেল খাটলাম সে সংগঠন আমাদের বঞ্চিত করেছে। না পারছি বড় মুখ করে পরিবারের সামনে দাঁড়াতে, না পারছি সংগঠনের মূল্যায়ন। এভাবে পক্ষপাতিত্বমূলক রাজনীতি চলতে থাকলে তরুণরা-মেধাবীরা রাজনীতিতে আসার আগ্রহ হারাবে।
এক দশক পর ডাকসু নির্বাচনের মধ্যদিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারও ছাত্রদল সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়। তবে সংগঠনটির কমিটি নিয়ে টানাপোড়েন সে ঐক্যে ফাঁটল ধরাবে বলে মনে করছেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে ঢাবি শাখার কমিটিতে অবমূল্যায়ন ও বাদ পড়াদের নিয়ে সমালোচনা তুঙ্গে। ক্যাম্পাসে কর্মসূচীতে প্রথম সারিতে থাকা এবং ডাকসু ও হল সংসদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারীরাও রয়েছেন বাড় পড়া ও অবমূল্যায়িতদের তালিকায়।
এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- মো. শাহিনুর ইসলাম শাহিন (ছাত্রদল মনোনীত সাহিত্য সম্পাদক প্রার্থী ডাকসু), সাইদুর রহমান রাফসান (ভিপি প্রার্থী শহীদুল্লাহ হল সংসদ), মোহাম্মদ ইমন (জিএস প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল ছাত্র সংসদ, জারিফ রহমান (এজিএস প্রার্থী এ এফ রহমান হল সংসদ), নুরুল আমিন নূর (এজিএস প্রার্থী শহীদুল্লাহ হল), জুবায়ের আহমেদ (এজিএস প্রার্থী এস এম হল), মোঃ মিনহাজুল হক নয়ন (সাহিত্য সম্পাদক প্রার্থী মুহসিন হল ছাত্র সংসদ), মেহেদী হাসান (সাহিত্য সম্পাদক প্রার্থী জহুরুল হক হল ছাত্র সংসদ)।
অবমূল্যায়নের শিকার হয়েছেন ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেল থেকে জিএস প্রার্থী আলোচিত ছাত্রনেতা আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক। ডাকসুতে ছাত্রদলের ভিপি ও এজিএস প্রার্থী যুগ্ম আহ্বায়ক হলেও জিএস প্রার্থী হয়েছেন আহবায়ক কমিটির দুই নম্বর সদস্য। অথচ তার সেশন থেকে যুগ্ম আহ্বায়ক পদ এসেছে নতুন কমিটিতে। একইভাবে অবমূল্যায়নের শিকার বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নির্যাতনের শিকার ঢাবির শহীদুল্লাহ হলের সদস্য সচিব গোলাম কিবরিয়াও। তিনি তার সেশনেরও নিচে স্থান পেয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য সাবেক হওয়া কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক জি এম ফকরুল হাসানের স্থান হয়নি নতুন কমিটিতে। হল ইউনিটের সদস্য সচিবদের মধ্যে বাদ পড়েছেন- মনজুরুল আলম রিয়াদ (অমর একুশে হল), মোস্তাফিজুর রহমান রুবেল (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল) ।বিভিন্ন হলের যুগ্ম আহবায়কদের মধ্যে বাদ পড়েছেন- সাফি ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, মোহাম্মদ শামিম আকতার শুভ, ইউনুস পিটু ও কামরুজ্জামান নাহিন (সুর্যসেন হল), নাদির শাহ পাটোয়ারী ও রিয়াদ রহমান (জহুরুল হক হল), শিপন বিশ্বাস, কাউসার সরকার ও আফসার উদ্দিন (এস এম হল), শ্রী মিঠুন কুমার দাশ (যুগ্ম আহবায়ক জগ্ননাথ হল), নাজমুল হাসান, মওদুদ হোসেন ও হাসান-আল আরিফ (জসিমুদ্দিন হল), ফারহান আরিফ, নাকিব চৌধুরী, ছফী ওবায়েদুর রহমান সামিত, সালেহ মো. আদনান, বায়েজিদ হোসেন ও ইউসুফ হোসেন খান (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল) রাশেদ আল আমিন শুভ (অমর একুশে হল), দ্বীন ইসলাম, মুহসিন ভুইয়া, জিহাদুল ইসলাম রঞ্জু ও সাইফুল ইসলাম শিমুল (মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল), মোহাব্বত আলী জয় (এফ আর হল), মাহফুজ আহমেদ ও মো. হাসান (মুহসিন হল), জাহাঙ্গীর আলম (আহবায়ক, জিয়া হল)।
এর মধ্যে শিপন বিশ্বাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে ছাত্রলীগের নির্মম হামলার শিকার হন। তবে সে সময় বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। আর হল সংসদের নির্বাচনের দিন সূর্যসেন হলে ভোট দিতে গিয়ে হামলার শিকার হন মোহাম্মদ শামিম আকতার শুভ। এছাড়াও বাদ পড়াদের তালিকায় রয়েছেন আরও অনেক ছাত্রনেতা।
একই গ্রুপে শীর্ষ দুটি পদ, কমিটিতে স্থান না পাওয়া ও অবমূল্যায়নের অভিযোগে ঢাবি ছাত্রদলের চলমান অসস্তোষ নিয়ে কথা হয় ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি ও সম্পাদকের সঙ্গে। বিষয়টির দ্রুত কোনো সমাধান না হলেও পরবর্তীতে বাদ পড়া যোগ্য ও ত্যাগীদের কমিটিতে স্থান দেবেন বলে তারা জানিয়েছেন।
ছাত্রদল সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলসমূহে এখন আহবায়ক কমিটি আছে। এক মাসের মধ্যে সেগুলো পূর্ণাঙ্গ করার বিষয়ে ঢাবি শাখার নতুন নেতৃত্বকে নির্দেশে দেওয়া হয়েছে। এরপর সম্মেলনের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হবে। তখন ঢাবি ও কেন্দ্রীয় সংসদের কমিটিতে বাদ পড়াদের অনেকেই অন্তর্ভুক্ত হবে বলে তিনি জানান। কেন্দ্রীয় সংসদ ১৭১ সদস্যবিশিষ্ট হতে পারে বলে জানান ছাত্রদল সভাপতি।
তবে মাঠের ছাত্রদল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে কমিটিতে একক নিয়ন্ত্রণ থাকায় টুকু গ্রুপের গলায়ই বিজয়ের মালা উঠবে। এমন আশঙ্কায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে আশঙ্কায় আছেন সংগঠনটির হেভিওয়েট প্রার্থীরা।