নাঈমুল ইসলাম দুর্জয়
অসুস্থতার কারণে যথাসময়ে পরীক্ষার হলে উপস্থিত হতে পারেননি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। তাই ওই শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম-কানুন দেখিয়ে পরীক্ষা দিতে দেয়নি অর্থনীতি বিভাগের এক শিক্ষক। আজ মঙ্গলবার অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ৬ষ্ঠ সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অসুস্থতার কারণে দেরিতে উপস্থিত হওয়ায় আজকের ৩০৪ নং কোর্সের পরীক্ষা দিতে পারেনি ওই শিক্ষার্থী।
এমনকি অসুস্থ ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় বসতে না দিয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রাখা এবং এ অবস্থায় তাকে বিভিন্ন নিয়ম-কানুন পড়ানো হয়। এভাবে তাকে মানসিকভাবে এক ধরণের পীড়া দেয়া হয়েছে বলে জানায় প্রত্যক্ষদর্শীরা।
ভুক্তভোগী নাঈমুল ইসলাম দুর্জয় অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। বিজয় একাত্তর হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। তিনি কয়েকদিন ধরে অসুস্থতায় ভুগছেন। সম্প্রতি ৬ষ্ঠ সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা চলছে। আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টায় শুরু হওয়া পরীক্ষায় অসুস্থতার কারণে একঘন্টা দেরিতে হলে উপস্থিত হয় দুর্জয়। এই কারণে তাকে পরীক্ষায় বসতে দেইনি ৩০৪ নং কোর্সের শিক্ষক ও ১১তম ব্যাচের পরীক্ষা কমিটির প্রধান প্রভাষক মাহতাব উদ্দীন। বরং মানসিকভাবে ট্রিট করা হয় তাকে। এর ফলে মারাত্মকভাবে বিষন্নতায় ভুগছেন ওই শিক্ষার্থী।
আজকের পরীক্ষার হলের দুর্বিষহ পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি স্ট্যাটাস দেন ভুক্তভোগী দুর্জয়। সেখানে তোলে ধরেন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে কীভাবে একজন শিক্ষার্থীকে মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। আর নির্যাতনকারী যদি হন একজন শিক্ষক তাহলে এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া আরও কঠিন বলে মন্তব্য করছেন শিক্ষার্থীরা।
দুর্জয়ের ফেসবুকের হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এই নিয়ে চলছে আলোচনা-সামালোচনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের খামখেয়ালি ইচ্ছার বলি হতে হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের। এ কারণে শিক্ষার্থীদের যে কতটুকু মূল্য দিতে হয় তা বিবেচনা করেন না শিক্ষকরা বরং এর মাধ্যমে একধরণের আনন্দ খোঁজে উপভোগ করতে চান কিছু শিক্ষক— এমনই মন্তব্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন কিছু নিয়ম রয়েছে যা অনেক শিক্ষার্থীদের জানা নেই। যা সম্পর্কে সচেতন করতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও তেমন উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। অথচ তেমনই একটি নিয়মে আজকে ভুগতে হচ্ছে আমাকে— বললেন ভুক্তভোগী নাঈমুল ইসলাম দুর্জয়। তিনি দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘একঘন্টা দেরিতে আসলে পরীক্ষা দিতে দিবে না। এমন কোন নিয়ম যে রয়েছে তা আমার জানা ছিল না। তার চেয়ে বড় কথা কয়েকদিন ধরে আমি অসুস্থতায় ভুগছি। আর অসুস্থতার কারণে আজকে সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে যায়। আর ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ না করে ৯ মিনিটের মধ্যে পরীক্ষার হলে উপস্থিত হই। তারপরও আমাকে পরীক্ষায় বসতে সুযোগ দেয়া হয়নি। বরং একঘন্টা ধরে আমাকে নিয়ম-কানুন পড়ালেন।’
‘আর ওই শিক্ষকের (প্রভাষক মাহতাব উদ্দীন) প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই। তবে আমার মনে হয়, তিনি বিষয়টি মানবিকভাবে দেখতে পারতেন। কিন্তু তা না করে উল্টো আমাকে বিভিন্ন নিয়ম-কানুন দেখিয়ে মানসিক যন্ত্রণা দিতে থাকেন। তিনি আমার সঙ্গে এমন আচরণ করেছেন যা কারো অধীনে থাকা কোন কর্মচারীর সঙ্গেও কেউ করবেন না’— যোগ করলেন দুর্জয়।
আজকের পরীক্ষা কেন্দ্রে আরও দায়িত্ব পালন করেন অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এস এম আবদুল্লাহ, শেখ জাফর ইমরান, প্রভাষক তাসনিম রহমান ফারিহা।
সহকারী অধ্যাপক শেখ জাফর ইমরান দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সিন্ডিকেটে পাশ হওয়া একটা নিয়ম রয়েছে— কেউ পরীক্ষা শুরু হওয়ার একঘন্টা পরে আসলে পরীক্ষায় বসতে পারবে না এবং পরীক্ষা শেষ হওয়ার একঘন্টা আগেও বের হতে পারবে না। তাই ওই শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় বসতে দেয়া হয়নি।
মানবিক দিক বিবেচনায় এনে পরীক্ষায় বসতে দেয়ার সুযোগ ছিল কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই শিক্ষার্থী অসুস্থতার কথা যদি আগে জানাতেন তাহলে সুযোগ দেয়ার বিবেচনা করা হতো। কিন্তু তাৎক্ষনিক বললে কিছু করার থাকে না।
পরীক্ষা হলে দায়িত্ব পালনকারী বিভাগের আরেক সহকারী অধ্যাপক এস এম আবদুল্লাহ কাছে জানতে চাইলে, তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। এছাড়া ওই ব্যাচের পরীক্ষা কমিটির প্রধান প্রভাষক মাহতাব উদ্দীনই এ বিষয়ে ভালো জানাতে পারবেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পরীক্ষার হলে দেরি করে আসায় দুর্জয়কে পরীক্ষা দিতে দেননি মূলত ৩০৪ নং কোর্সের শিক্ষক এবং ওই ব্যাচের পরীক্ষা কমিটির প্রধান প্রভাষক মাহতাব উদ্দীন। একইসঙ্গে তাকে একঘন্টা ধরে মানসিকভাবে হয়রানি করার অভিযোগও ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে। পরীক্ষার হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্যান্য শিক্ষকরা মানবিকভাবে বিষয়টি গ্রহণ করতে রাজি থাকলেও মাহতাব উদ্দীনের এক গুয়েমির জন্য তা সম্ভব হয়নি বলে জানায় প্রত্যক্ষদর্শীরা।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে প্রভাষক মাহতাব উদ্দীনের মোবাইলে দ্যা ডেইল ক্যাম্পাস একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে। কিন্তু তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। এছাড়া ১১তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদেরও অভিযোগ— তিনি ব্যাচের পরীক্ষা কমিটির প্রধান হলেও তাকে বিভিন্ন প্রয়োজনে ফোন দিলে পাওয়া যায় না।
আজকের ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী দুর্জয় ফেসবুকে লেখেন, আজ আমার ৩য় বর্ষ, ৬ষ্ঠ সেমিস্টারের ‘ডাইনামিক’ ফাইনাল পরীক্ষা ছিল। আমার সহপাঠীরা এখনো পরীক্ষা দিচ্ছে। গতরাতে শারীরিক অসুস্থ থাকার জন্য আমাকে মেডিসিন নিতে হয়েছিল। যদিও আমি জানতাম এর সাইড ইফেক্ট হলো গভীর ঘুম। বাধ্য না হলে আমি নিতামও না। ৯টায় পরীক্ষা ছিল, আমি ৮টায় এ্যালার্ম দিয়েছিলাম। রুমের কাউকে কিছু বলি নাই, কারণ আমি নিজে নিজেই টাইমমত উঠে পড়ি। আর রাতের বেলা সবাই ঘুমাচ্ছিলো। আমি সকাল উঠে রেডি হয়ে ৯ মিনিটের মধ্যে অর্থাৎ ১০টা ৭মিনিটে এক্সাম হলে উপস্থিত হই।
গিয়েই বললাম খাতা দেন। আমার দিকে তাকিয়ে স্যার বলল, এত লেইট কেন? আমি কারণ ব্যাখ্যা করলাম। আমাকে বলল রুলস হলো পরীক্ষা শুরু হওয়ার ১ ঘন্টার মধ্যে কক্ষে উপস্থিত থাকা। তারপর আমাকে একটা খাতা ধরিয়ে দিয়ে বলল পড়। রুলস জেনে যাও, তোমাকে তো আমি পরীক্ষা দিতে দিচ্ছি না। আমি রিকুয়েস্ট করলাম উনি কোন জবাব না দিয়ে অন্য রুমে চলে গেলেন। তারপর ১০টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত আমি এক্সাম হলে দাঁড়ানো। ৩০ মিনিটের মধ্যে কেউ আর আমার দিকে তাকালেন না। আমি দাঁড়িয়ে ৩০ মিনিট ধরে খাতার রুলস গুলো পড়লাম। কিন্তু কোথাও পেলাম না ১ ঘন্টা পার হলে কোন শিক্ষার্থী এক্সাম হলে ঢুকতে পারবেন না। যারা ডিউটিতে ছিলেন তাদের একজনকে দেখিয়ে বললাম স্যার এমন তো কোন রুলস নেই।
ঠিক সেই সময় সেই কোর্স টিচার আসলে তাকেও দেখালাম। রিকুয়েস্ট করলাম আমাকে এই দেড় ঘন্টা যেন পরীক্ষা দিতে দেয়া হয়। স্যার বলল লেখা না থাকলেও আমরা জানি। আমি বললাম স্যার লেখা না থাকলে আমরা কিভাবে জানতে পারি? এক স্যার বললেন হি ইজ রাইট। কোর্স টিচারকে বলল উনি চাইলে পরীক্ষা নিতে পারেন। কোর্স টিচার কাউকে ফোন দিলেন। কথা শেষে আমাকে জানালেন তোমাকে পরীক্ষা দিতে দিচ্ছি না।
আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সালাম দিয়ে চলে আসি। যদি আসলেই এমন কোন রুলস থেকে থাকে যা আমরা জানি না। তাহলেও বিষয়টিকে আমি মেনে নিয়ে ফিরে আসতাম। উনি আমার জন্য কোন রকম চেষ্টা টুকু করেননি। অথচ আমি অনেক সময় দেখেছি, কোন এক ছাত্র হসপিটালের বেডে শুয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে আর স্যার পাশে বসে আছেন।
বাট এটা নিয়েও আমার কোন আপত্তি নেই। ওনার ব্যক্তিগত ব্যাপার কাকে হেল্প করবেন, কাকে করবেন না। যে কেউ রুলস ফলো করলে আমি তাকে সম্মান করি। বাট যে ক্লাস নেয় না ঠিকমত। ৯টায় ক্লাস সবাই ক্লাসে বসে আছি, সিআর (ক্লাস প্রতিনিধি) বলল ক্লাস হবে না। অথবা ১২টায় নিবেন। ১২টাতেও না নিয়ে, পরদিন টানা ২টা ক্লাস নিবেন।
সেমিস্টারের শুরুতে ক্লাস নিতে পারবেন না ব্যস্ততার জন্য, আবার পরীক্ষার আগে টানা ২/৩ টা করে ক্লাস নিয়ে কোর্সটা শেষ করে দিবেন কোন মতে। ফলস্বরূপ আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস নিয়ে মাথা ঘামাতে পারলাম না। পরবর্তীতে এই টপিক যখন কাজে লাগবে এপ্লাই করতে পারি না।
ক্লাসে একটা এক্সাম্পল করিয়ে দিয়ে বলবেন, বাকিগুলো করে আসবা। আমরা এবার প্রায় ২০০/৩০০ পেইজ হোমওয়ার্কই করছি শুধু। কারণ স্যার রিসার্চ, সানেম নিয়ে অনেক ব্যস্ত। তার মুখ থেকে রুলসের কথা শুনতে আমার ভালো লাগার কথা না। তাই এই পোস্টটি করা। আপনি চাইলেই পারতেন পরীক্ষাটি নিতে। না হলেও আমাকে বুঝিয়ে সুন্দরমত পাঠিয়ে দিতে পারতেন।
আপনি আমাদের ৩টি কাজ করতে রিকুয়েস্ট করেছিলেন।
১/ মাকে কষ্ট না দেওয়া।
২/ লাইফ পার্টনারের সাথে চিট না করা।
৩/সন্তানের জন্য আদর্শ পিতা হওয়া।
আপনাকেও একটি বিষয়ে রিকুয়েস্ট করি। আমরা বেশিরভাগই মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করি। আমাদের উপর পরিবারের ভয়ংকর এক্সপেক্টেশন আছে। আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনাদের ভাবার কথা না। কিন্তু একটু হেল্পফুল হলে উই ক্যান সারভাইভ ইন এ বেটার ওয়ে।
সো মারা দিয়ে নিজে মনে মনে খুশি থাকা থেকে বিরত থাকুন। আমার ফ্যামিলি ব্যাকআপ অথবা অন্য কোথাও পড়ার সুযোগ থাকলে, আমি নিজেকে আপনার সামনে এক্সপ্রেস করতে পারতাম।
আপাতত জেনে রাখেন আমার চোখে দেখা একজন খারাপ টিচার আপনি। তোতাপাখি।