৩ দিনে ১২৪ যৌন নিপীড়নের অভিযোগ
যৌনি নিপীড়নের শিকার হওয়ার তথ্য ‘আওয়াজ ডট বিডি’-তে লিখছেন ভুক্তভোগীরা। সাইটটির উদ্যোক্তা রাকিবুল হাসান ও সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর © টিডিসি সম্পাদিত
‘আমি রাতে ঘুমাচ্ছিলাম মাদ্রাসা হোস্টেলে। সিনিয়র-জুনিয়র একদম মেডিকেল ওয়ার্ডের মতোই থাকে। একদিন রাত ৩টায় দেখি কেউ একজন আমাকে জড়িয়ে ধরে (...) নাড়াচ্ছে। একটু মুখ ঘুরিয়ে দেখি, সিনিয়র ভাই ক্লাস নাইনের। আমি বুঝতে পারলে ঘুম ভেঙে যায়। তখন সে আমায় চুপ থাকতে বলে। আমি এ বিষয়টা নিয়ে ট্রমাটাইজ হই। সিনিয়রের চাচা আবার এ মাদ্রাসার শিক্ষক, ওনাকে বিচার দিই। কিন্তু তিনি হেসে উড়িয়ে দেন। তার ঠিক ৬ মাস পর সেই শিক্ষক হাতেনাতে ধরা খায়। পরবর্তীতে তাকে বহিষ্কার করা হয় প্রমাণ পেয়ে।’
‘আওয়াজ ডট বিডি’ নামের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে শৈশবে ঘটে যাওয়া যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা এভাবেই বর্ণনা করেছেন একজন ভুক্তভোগী। ঘুষ ডট সাইট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে গত ৭ সেপ্টেম্বর প্ল্যাটফর্মটি চালুর পর আজ বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকেল পর্যন্ত ১২৪টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঘটনার বড় অংশ, প্রায় ৫১ শতাংশ ঘটেছে কওমি মাদ্রাসায়।
আওয়াজ ডট বিডিতে দেওয়া অভিযোগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে মসজিদে ১৭ শতাংশ, স্কুলে ১৫ শতাংশ, আলিয়া মাদরাসায় ৭ শতাংশ, ইউনিভার্সিটিতে ৫ শতাংশ এবং কলেজে ও মন্দিরে দুই শতাংশ করে এমন ঘটনার কথা জানানো হয়েছে। এই সাইটে বেনামি তথ্যের ভিত্তিতে বিশেষত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিশুদের ওপর চালানো নিপীড়নের প্রকৃত মাত্রা বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে কারও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না।
এক ভুক্তভোগী লিখেছেন, ‘৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াকালীন আবাসিক স্কুলের হুজুর মারধর করে জোর করে শারিরীক সম্পর্ক করতো। ভয়ে কাউকে বলা যেত না। এখন পর্যন্ত বলাৎকার এর কোন নিউজ দেখলে ছোটবেলার সেই বীভৎস কথা মনে পড়ে।’
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঘটনার বড় অংশ, প্রায় ৫১ শতাংশ ঘটেছে কওমি মাদ্রাসায়। অভিযোগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে মসজিদে ১৭ শতাংশ, স্কুলে ১৫ শতাংশ, আলিয়া মাদরাসায় ৭ শতাংশ, ইউনিভার্সিটিতে ৫ শতাংশ এবং কলেজে ও মন্দিরে দুই শতাংশ করে এমন ঘটনার কথা জানানো হয়েছে। এই সাইটে বেনামি তথ্যের ভিত্তিতে বিশেষত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিশুদের ওপর চালানো নিপীড়নের প্রকৃত মাত্রা বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ফ্যাক্টচেক মিডিয়া দ্য ডিসেন্টও এসব তথ্যের আলোকে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছেলে ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অপরাধী ছিলেন পরিচিত ব্যক্তি। এদের মধ্যে বিশ্বস্ত পরিচিত, নিকটাত্মীয় ও অন্যান্য ব্যক্তির পাশাপাশি অপরিচিত ব্যক্তিও আছেন। মেয়ে ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অপরাধী ছিলেন দূর সম্পর্কের আত্মীয়। এছাড়া পরিচিত, বিশ্বস্ত পরিচিত ও নিকটাত্মীয়র পাশাপাশি অপরিচিতরাও অপরাধী।
৭৮টি ঘটনার ১৩ শতাংশে নিকটাত্মীয় জড়িত ছিলেন। শুধু মেয়ে ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয়ের দ্বারা সংঘটিত ঘটনার হার ১৪ শতাংশ। ১০ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। আর জেলা হিসেবে বেশি রিপোর্ট এসেছে ঢাকা থেকে।
ঘটনাস্থলের হিসাবে সবচেয়ে বেশি এমন ঘটনা ঘটেছে বাসা-বাড়িতে। ৫৪ শতাংশই বাসা-বাড়িতে ছিল। এরপর ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘটেছে ৩২ শতাংশ। এছাড়া ৯ শতাংশ খোলা জায়গায় এবং ৫ শতাংশ ঘটনা বাণিজ্যিক ও পরিবহনস্থলে ঘটেছে। জেলাভিত্তিক ঢাকার পরই আছে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ ও নোয়াখালী। ঘটনার পুনরাবৃত্তিও ঘটেছে ৪৯ শতাংশ।
এক ভুক্তভোগী লিখেছেন, ‘১০ বছর বয়সে আমার দূর সম্পর্কের কাজিন আমাকে রেইপ করে। এটা আমার লাইফ লং ট্রমা হয়ে গেছে। আমি এখনো বের হতে পারিনি এখান থেকে। এখনো নামাজে কান্না করি। নিজেকে নিয়ে সবসময় হিনমন্যতায় ভুগি। আমি এর জন্য গ্রামে যেতে চাই না।’
শিশু বয়সে যৌন নিপীড়নের শিকার হলে এর দীর্ঘমেয়াদি নানা ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিকাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসায় আমরা যেসব ঘটনা দেখতে পাচ্ছি, সেখানে ছেলেশিশুরাই ভুক্তভোগী। বিভিন্ন বয়সের শিশু এসবের শিকার হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কৈশোরে পৌঁছানোর আগেই নিপীড়নের শিকার হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘মনোবিজ্ঞানের দিক থেকে দেখলে, যৌন নিপীড়নের শারীরিক ক্ষত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেরে উঠতে পারে। কিন্তু মানসিক আঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়। কোনো শিশু ঘটনাটিকে অত্যন্ত কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখলে সেটি তার জীবনে ট্রমা হিসেবে থেকে যেতে পারে। ফলে তার বিভিন্ন ধরনের মানসিক ও সামাজিক সমস্যা তৈরি হতে পারে।’
অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, এ ধরনের ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হলেও এটি নতুন সমস্যা নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এমন ঘটনা ঘটে আসছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এখন বিষয়গুলো বেশি সামনে আসছে এবং অভিভাবকেরাও সচেতন হচ্ছেন।
কওমি মাদ্রাসার আবাসিক ব্যবস্থার মধ্যেও বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে উল্লেখ করে তার ভাষ্য, অল্প জায়গায় অনেক শিশুকে একসঙ্গে রাখা হয়। পাশাপাশি শিক্ষক বা সিনিয়রদের ব্যক্তিগত কাজে শিশুদের ব্যবহার করার ঘটনাও ঘটছে। অনেক শিশুকে গা-হাত-পা টিপে দেওয়া বা বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিগত কাজ করতে হয়। এ ধরনের পরিবেশে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং নিপীড়নের সুযোগ তৈরি হয়।
তিনি বলেন, ‘যতটা সম্ভব আবাসিক ব্যবস্থা নিরুৎসাহিত করা উচিত। তা সম্ভব না হলে অন্তত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যারা শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়ন চালায়, তাদেরও শক্ত নেটওয়ার্ক থাকতে পারে। জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
আরও খবর: ঢাবির ১০৬ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম ‘শিক্ষক মূল্যায়ন’, রেটিংয়ে কোনো শিক্ষক পাচ্ছেন ৫-এ ৫, কেউ ১-২
‘আওয়াজ ডট বিডি’ তৈরির পেছনে কাজ করেছেন রাকিবুল হাসান ও সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর নামের দুই তরুণ। এর মধ্যে রাকিবুল হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থীরা। তিনি অনলাইনে উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন। আর সালাহউদ্দীন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল করছেন। পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন।
প্ল্যাটফর্মটির বিষয়ে জানতে চাইলে রাকিবুল হাসান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘এরকম একটা প্লটফর্ম করার আইডিয়াটা মাথায় আছে ঘুষ সাইট দেখে। তারা বেশ ভালো সফল হয়েছে, ভালো সাড়া ফেলছে। এটা সরকার পর্যন্ত নাড়া দিতে পারছে। আমার মনে হলো যে আমরাও যদি এরকম একটা উদ্যোগ নিই। এখানে ডাটাগুলো হবে বেনামি এবং কোনোটাই ট্র্যাক করা যাবে না।
এর ফলে মানুষ এগুলো বলতে আগ্রহী হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা এই সেক্টরে এরকম একটা সাইট করি যেন, এর ফলে সচেতনতা তৈরি হয়, প্রেসার ক্রিয়েট হয় এবং কর্তৃপক্ষ এইদিকে যথাযথ মনোনিবেশ করতে বাধ্য হয়।’
তথ্যের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ব্যাকেন্ডে দেখে প্রয়োজন মনে করলে সেনসিটিভ অংশ রিমুভ করে পাবলিশ করি। যদি আইডেন্টিফায়েবল কোনো তথ্য থাকে সেটাকে আমরা গোপন করি। আমাদের মূল প্ল্যান হচ্ছে, উদ্যোগটা সরকারকে নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট অন্যান্য যে সব কর্তৃপক্ষ আছে, যেমন কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা বোর্ড এবং অন্যান্য অথরিটি, তারা এই উদ্যোগটা নেবে।
নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে চাচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ভিক্টিমদেরকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া বা এ ঘটনার তদন্ত করা, আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো প্ল্যান আমাদের নেই, ভবিষ্যতে সম্ভাবনাও নেই। আমরা সচেতনতা তৈরি করতে চাই।’