ডাকসুর উদ্যোগ
প্রতীকী ছবি © টিডিসি সম্পাদিত
বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। নানা আন্দোলন-সংগ্রাম, চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ১০৬ বছরে পা দিয়েছে দেশের অন্যতম প্রাচীন এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ এই পথচলায় এবার প্রথমবারের মতো শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য ওয়েবসাইট চালু করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের ইতিহাসেও উন্মুক্তভাবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য এ ধরনের ওয়েবসাইট চালুর ঘটনা এটিই প্রথম।
ডাকসুর উদ্যোগে চালু হওয়া ওয়েবসাইটটি ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে। সেখানে বিভিন্ন শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে রেটিং দেওয়া হচ্ছে। কেউ পাচ্ছেন ৫-এ ৫। আবার কারও রেটিং নেমে এসেছে ১ কিংবা ২-এ। তবে উদ্যোগটি নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে বিরোধও রয়েছে। যদিও এটি স্থির কোনো মূল্যায়ন নয়। ওয়েবসাইটে শিক্ষকদের তথ্য ও রেটিং নিয়মিত হালনাগাদ হচ্ছে।
উন্নত বিশ্বের কয়েকটি দেশে ‘রেট মাই প্রফেসর’ ধরনের ওয়েবসাইট চালু রয়েছে। এসব প্ল্যাটফর্মে শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে শিক্ষকদের মূল্যায়ন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও এবার একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওয়েবসাইটে কোর্সের কাঠামো ও পাঠ্যসূচি, শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন, পেশাদারিত্ব এবং সার্বিক সন্তুষ্টির মতো বিষয় রাখা হয়েছে। শিক্ষক কতটা স্পষ্টভাবে পড়ান, প্রশ্ন ও আলোচনায় উৎসাহ দেন কি না, শিক্ষার্থীদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ করেন কি না এবং সময়মতো ক্লাস নেন কি না এসব বিষয়েও শিক্ষার্থীরা মতামত দিতে পারছেন।
জানা গেছে, ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে শুরু করে পরবর্তী ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এ ব্যবস্থায় অংশ নিতে পারবেন। মূল্যায়নে অংশ নিতে শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ই-মেইল ব্যবহার করে নিবন্ধন করতে হবে। ই-মেইলে পাঠানো একটি কোড ব্যবহার করে সিস্টেমে প্রবেশ করা যাবে।
সিস্টেমে প্রবেশের পর শিক্ষার্থীরা কেবল নিজেদের বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারবেন। পুরো মূল্যায়ন প্রক্রিয়া বেনামি রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী কোনো শিক্ষককে কী মূল্যায়ন করেছেন, তা প্রকাশ করা হবে না। তবে মূল্যায়নের সামগ্রিক ফলাফল প্রকাশ্যে দেখা যাবে।
ওয়েবসাইটে সব শিক্ষকের জন্য নির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয় রাখা হয়েছে। এসব বিষয়ের ওপর শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে রেটিং পয়েন্ট দেওয়া হয়। কোর্সের কাঠামো ও পাঠ্যসূচি, শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন, পেশাদারিত্ব এবং সার্বিক সন্তুষ্টি মূল্যায়নের অন্যতম বিষয়।
সিলেবাসের কাঠামো ও গতি এবং কোর্সের উপকরণ ও পাঠ্যসামগ্রীর কার্যকারিতাও বিবেচনায় নেওয়া হয়। শিক্ষাদান পদ্ধতির ক্ষেত্রে শিক্ষক কতটা স্পষ্ট ও কার্যকরভাবে বিষয় ব্যাখ্যা করেন, তা দেখা হয়। ক্লাসে শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক ও স্বাধীন চিন্তায় উৎসাহিত করা হয় কি না, সেটিও বিবেচনায় রয়েছে। উদাহরণ ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিষয় সহজে বোঝানো হয় কি না, তাও মূল্যায়নের অংশ।
আরও পড়ুন: পাঁচ শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের মূল্যায়ন চূড়ান্ত, থাকছে জিয়াউর রহমানের প্রবন্ধ-খালেদার অবদান
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন ও মুক্ত আলোচনায় উৎসাহ দেওয়া, শিক্ষকের কাছে সহজে পৌঁছানো যায় কি না এবং তিনি শিক্ষার্থীদের প্রতি কতটা সাড়া দেন এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হয়। সব শিক্ষার্থীর সঙ্গে সম্মানজনক ও ন্যায়সংগত আচরণ করেন কি না, সেটিও মূল্যায়নের আওতায় রয়েছে। পরীক্ষা ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নম্বর দেওয়ার মানদণ্ড কতটা স্পষ্ট, ন্যায্য ও স্বচ্ছ, তা দেখা হয়। অ্যাসাইনমেন্ট ও পরীক্ষার বিষয়ে শিক্ষক কতটা দ্রুত ও গঠনমূলক মতামত দেন, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়। পাশাপাশি ক্লাসে শিক্ষকের সময়ানুবর্তিতা, নিয়মিত উপস্থিতি এবং পেশাগত সততা ও আচরণও মূল্যায়ন করা হয়।
সার্বিক মূল্যায়নে শিক্ষার্থীরা ওই শিক্ষককে অন্য শিক্ষার্থীদের কাছে সুপারিশ করবেন কি না এবং ওই শিক্ষকের কোর্সে তারা সন্তুষ্ট কি না এ বিষয়েও মতামত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এখন পর্যন্ত ৯৬ বিভাগের ২ হাজার ৪৫ শিক্ষককে নিয়ে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার রিভিউ যুক্ত হয়েছে ওয়েবসাইটটিতে। এসব রিভিউতে বিভিন্ন শিক্ষকের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দেওয়া মতামত ও রেটিং পয়েন্ট দেখা যায়।
একটি আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে ধরনের পরিবেশ থাকা উচিত, বিশ্ববিদ্যালয়ে তার চেয়ে অনেক বেশি একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ থাকা প্রয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসরুমে ক্লাস হয়, মধুর ক্যান্টিনে মিছিল হয়, নানা ধরনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হয়। এমনকি কোনো রাজনৈতিক দলের জাতীয় কাউন্সিলের মতো কর্মসূচির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বন্ধ থাকে। ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতে পারে না। অথচ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করছে।-অধ্যাপক ড. মামুন আল মোস্তফা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ঢাবি
এদিকে ডাকসুর উদ্যোগের বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা করতে দেখা যায় অনেক শিক্ষককে। যদিও আবার অনেক শিক্ষক প্রশংসাও করেন এই উদ্যোগের। সমালোচনা করা শিক্ষকদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. খোরশেদ আলম।
তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়ন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। নো ডাউট। শিক্ষক মূল্যায়ন ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা না থাকায় অনেক শিক্ষককে স্বেচ্ছাচারী হতে এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দাসসুলভ আচরণ করতে দেখা যায়! কাগজে-কলমে কেবল শিক্ষক মূল্যায়ন করলেই হবে না। পাশাপাশি মূল্যায়ন প্রতিবেদন শিক্ষক নিয়োগ (ভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আবেদনের ক্ষেত্রে), পদোন্নতি ও বার্ষিক বেতনবৃদ্ধি (স্যালারি ইনক্রিমেন্ট) ইত্যাদির ক্ষেত্রে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এবং সর্বোচ্চ পয়েন্টপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ফ্যাকাল্টি/ইনস্টিটিউট বা বিভাগ থেকে অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার ব্যবস্থা করে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
প্রশ্ন হচ্ছে: শিক্ষক মূল্যায়নের উদ্যোগ কে নেবে? এটা কি ডাকসুর কাজ? এটা করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। ডাকসু এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত করতে পারে; চাপ তৈরি করতে পারে।
তিনি উল্লেখ করেন, শিক্ষক মূল্যায়নের নামে ডাকসু যেটা করছে, এটা অনধিকার চর্চা। এর ফলে এখন অনানুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষকদের রেটিং হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরিসরে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে (যা পরবর্তীতে মব-এ রূপান্তরিত হতে পারে)। ফলত, শিক্ষার্থীরা শিক্ষক মূল্যায়নের ইতিবাচক ফলাফল থেকে বঞ্চিত হবে। আমি বরং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে শিক্ষক মূল্যায়নে যথাদ্রুত উদ্যোগ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাই।
শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে শিক্ষকদের মূল্যায়নের উদ্যোগটি ভালো। আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের মূল্যায়ন ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে শিক্ষক মূল্যায়নের ফলাফল প্রকাশ্যে না এনে প্রশাসনিকভাবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে জানানো যেতে পারে।-অধ্যাপক ড. ওয়াসিমুল বারী, পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাবি
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মামুন আল মোস্তফা বলেন, শিক্ষক মূল্যায়ন ওয়েবসাইট সম্পর্কে আমার জানা নেই। তবে এখানে বিষয়টি হচ্ছে কারা মতামত দিচ্ছে। কারণ আমি অনার্সে কিংবা মাস্টার্সে কোনো ক্লাস নিই না। আমি এমফিল-পিএইচডি ক্লাস নিয়ে থাকি। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে আমার ক্লাসের কতজন শিক্ষার্থী এখানে মতামত দিয়েছে। আমার এমফিলের শিক্ষার্থী আছে, পিএইচডির শিক্ষার্থী আছে। তাদের সঙ্গে কথা বলুন, তাদের মূল্যায়ন নিন। ফলে অন্যরা আমাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেছে, সেটা নিয়ে আমার মাথাব্যথা থাকার কথা নয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি পাবলিকলি করা কতটা যৌক্তিক, সেটিও ভাবার বিষয়। এটি কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নয়; এটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়। একটি আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে ধরনের পরিবেশ থাকা উচিত, বিশ্ববিদ্যালয়ে তার চেয়ে অনেক বেশি একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ থাকা প্রয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসরুমে ক্লাস হয়, মধুর ক্যান্টিনে মিছিল হয়, নানা ধরনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হয়। এমনকি কোনো রাজনৈতিক দলের জাতীয় কাউন্সিলের মতো কর্মসূচির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বন্ধ থাকে। ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতে পারে না। অথচ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করছে।
অধ্যাপক ড. মামুন আল মোস্তফা বলেন বলেন, পৃথিবীর যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়নের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া থাকে। সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ করে শিক্ষক মূল্যায়নের মানদণ্ড নির্ধারণ করে। কিন্তু এখানে যদি শিক্ষার্থীরাই নির্ধারণ করে দেন একজন শিক্ষক কতটা মেধাবী বা শিক্ষকতার মানদণ্ড কী হবে, তাহলে সেটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক।
রেটিং পয়েন্ট ৫ পাওয়া শিক্ষকদের মধ্যে একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. ওয়াসিমুল বারী। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে শিক্ষকদের মূল্যায়নের উদ্যোগটি ভালো। আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের মূল্যায়ন ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে শিক্ষক মূল্যায়নের ফলাফল প্রকাশ্যে না এনে প্রশাসনিকভাবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে জানানো যেতে পারে। কোনো শিক্ষকের মূল্যায়ন খারাপ হলে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করে আরও যত্নশীল হওয়ার পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে।
আরও পড়ুন: ১০০ শিক্ষককে সম্মাননা দেবে সরকার, প্রত্যেকে পাবেন ১ লাখ টাকা
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের ক্লাস নেওয়ার পদ্ধতি, তাদের সঙ্গে কতটা সময় দিচ্ছেন, কীভাবে সহযোগিতা করছেন এবং বিষয়গুলো কতটা ভালোভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছেন—এসব একাডেমিক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন করতে পারে। তবে পুরো বিষয়টি শিক্ষার্থীরা কীভাবে দেখছে, তা বুঝতে যারা জরিপ বা মূল্যায়ন করছেন, তাদের সঙ্গে কথা বললে আরও ভালোভাবে জানা যাবে।
অধ্যাপক ওয়াসিমুল বারী বলেন, মূল্যায়নের ফল প্রকাশ্যে দিলে বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে। কারণ সবার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয় রয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কে কোনভাবে এই তথ্য ব্যবহার করবে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তাই ফলাফল প্রকাশ না করে প্রশাসনিকভাবে বিষয়টি ব্যবস্থাপনা করা তুলনামূলকভাবে ভালো হতে পারে।
শিক্ষক মূল্যায়নের উদ্যোগ ডাকসুর কাজের মধ্যে পড়ে না। এটি প্রথম কথা। দ্বিতীয়ত, এ ধরনের রেটিংয়ের ব্যবস্থা আন্তর্জাতিকভাবেও রয়েছে। যেখানে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন শিক্ষকের বিষয়ে নিজেদের মতামত জানাতে পারেন। এটি কোনো অফিশিয়াল মূল্যায়ন নয়। এ ধরনের উদ্যোগ থাকতেই পারে।- অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, উপ-উপাচার্য, ঢাবি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কার্যনির্বাহী সদস্য উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া বলেন, শিক্ষকদের রেটিং শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রতিটি শিক্ষকের জন্য আলাদাভাবে রেটিং দেওয়া হয়েছে। সেখানে শিক্ষকের সময়ানুবর্তিতা, শিক্ষার্থীবান্ধব আচরণ, শ্রেণিকক্ষে প্রশ্ন করতে উৎসাহ দেওয়া, বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান, পড়ানোর ধরন, অপ্রাসঙ্গিক কথা বলার প্রবণতা এবং নিয়মিত ক্লাস নেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার্থীরা মতামত দিয়েছেন। এসব মতামতের ভিত্তিতেই শিক্ষকদের রেটিং নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিচিত শিক্ষক মানেই ভালো শিক্ষক এমন ধারণার ভিত্তিতে রেটিং করা হয়নি। পুরো প্রক্রিয়াটি শিক্ষার্থীদের মতামতের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ। ওয়েবসাইট চালুর পর বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সামনে আসছে। যেমন, বর্তমানে রেটিং সম্পাদনা করার সুযোগ নেই। এ ধরনের বিষয় নিয়ে কাজ চলছে। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ বেনামি রাখা হবে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীর পরিচয় শনাক্ত করার সুযোগ না থাকে, সে বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। সামনে প্রয়োজন অনুযায়ী ছোটখাটো পরিবর্তন আনা হবে।
রাফিয়া বলেন, ডাকসুর বর্তমান মেয়াদ শেষ হলেও আমরা আরও এক বছর ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই কার্যক্রমটি দেখভাল করব। এরপর এটি শিক্ষার্থীদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে। তারা কীভাবে বিষয়টি ব্যবহার করবেন, কীভাবে রিভিউ করবেন সেটিই পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রাফিয়া বলেন, শিক্ষকদের রেটিং ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি আমার নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল। সে অনুযায়ী তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছি। প্রশাসনের রেজিস্ট্রার বিল্ডিং থেকে শুরু করে আইটি অফিস, ভিসি অফিস—এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে আমি এ কাজ নিয়ে যায়নি। প্রতি সপ্তাহেই বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে আমাকে এই কাজ করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, সবচেয়ে কঠিন বিষয় ছিল কোথাও সরাসরি বলা হয়নি যে কাজটি হবে না। বরং প্রতিবারই সামনে আরেকটি ধাপ দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, বিষয়টি অমুক টেবিলে আছে, আবার কোনো মিটিংয়ে অনুমোদন নিতে হবে। ২০২৩ সাল থেকেই বিষয়টি অনুমোদনের প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকলেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সভায় তা উঠেছে। কিন্তু কোনো এক কারণে সেটি অনুমোদন পায়নি। কেন অনুমোদন দেওয়া হয়নি, সেটিও আমরা বুঝতে পারে নি।
আরও পড়ুন: এসএসসির পুনর্নিরীক্ষণের ফল প্রকাশ, নতুন জিপিএ-৫ তিন হাজারের বেশি
রাফিয়া বলেন, ‘আমি যদি এই কাজটি করতে না পারি, তাহলে আমি তো আর রাজনীতিবিদ নই যে কথা দিয়ে কথা রাখলাম না বিষয়টি আমার গায়ে লাগবে না। শেষ পর্যন্ত আমার মনে হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সম্ভব না হলেও ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে এই কাজটি শুরু করতে হবে। এরপর আমি একটি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাদের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে শিক্ষকদের বিভিন্ন তথ্য এবং বিভাগসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি ল্যাবসহ সংশ্লিষ্ট জায়গাগুলোতে দৌড়াদৌড়ি করে প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করা হয়। শেষ পর্যন্ত শিক্ষকদের রেটিং ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচিং ইভ্যালুয়েশনের জন্য নিজস্ব একটি নীতিমালা রয়েছে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুমোদিত হয়েছে। এখন শুধু এর বাস্তবায়ন বাকি।- ঢাবি উপাচার্য
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, ডাকসুর উদ্যোগে শিক্ষক মূল্যায়নের যে ওয়েবসাইট খোলা হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ ডাকসুর কাজের মধ্যে পড়ে না। এটি প্রথম কথা। দ্বিতীয়ত, এ ধরনের রেটিংয়ের ব্যবস্থা আন্তর্জাতিকভাবেও রয়েছে। যেখানে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন শিক্ষকের বিষয়ে নিজেদের মতামত জানাতে পারেন। এটি কোনো অফিশিয়াল মূল্যায়ন নয়। এ ধরনের উদ্যোগ থাকতেই পারে।’
তিনি বলেন, শিক্ষক মূল্যায়নের একটি সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকা উচিত। এর মাধ্যমে শিক্ষকরা বুঝতে পারবেন, তাদের অবস্থান কোথায় এবং কোথায় উন্নতির প্রয়োজন। একই সঙ্গে কারা শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারবেন, সেটিও একটি নির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে ঠিক করা উচিত।’
শিক্ষক মূল্যায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য অফিশিয়াল যে ব্যবস্থা থাকবে, সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই হওয়া উচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচিং ইভ্যালুয়েশনের জন্য নিজস্ব একটি নীতিমালা রয়েছে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুমোদিত হয়েছে। এখন শুধু এর বাস্তবায়ন বাকি।