অভিযোগ ডিবি পুলিশের বিরুদ্ধে
ভু্ক্তভোগী মো. ইউনুস ফকির © টিডিসি
পিরোজপুরে ডিবি পুলিশের বিরুদ্ধে নির্মম নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন পুলিশ কর্মকর্তাদের মেসে অস্থায়ীভাবে কাজ করা কেয়ারটেকার মো. ইউনুস ফকির (৪০)। পিরোজপুর ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফুল ইসলামের টাকা চুরির অভিযোগ এনে নির্মম এ নির্যাতন করা হয় বলে দাবি ইউনুসের। তবে পরবর্তীতে অন্য আরেক কর্মীর কাছ থেকে চুরি যাওয়া টাকা উদ্ধার হয়।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) দুপুরে নির্যাতনের এ ঘটনা ঘটলেও বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) রাতে বিষয়টি জানাজানি হয়। তবে নির্মম এ নির্যাতনের বিষয়টি পুলিশ মহলে সমালোচনার জন্ম দিলেও এ নিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। এমনকি এ বিষয়ে পুলিশের উধ্বর্তন কর্মকর্তারাও বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
পিরোজপুর সদর উপজেলার খানাকুনিয়ারি গ্রামের মৃত মোবারেক আলী ফকিরের ছেলে ইউনুস বলেন, পিরোজপুর পুলিশ লাইনসের রাস্তায় প্রবেশের মুখে পুলিশ কর্মকর্তাদের থাকার জন্য নির্মিত মেসে তিনি কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করেন। ২০০৮ সালে ভবনটি নির্মাণের সময় তিনি ওখানে যুক্ত হন। পরবর্তীতে মেসে অবস্থানকারীরা প্রতিমাসে তাকে কিছু টাকা দেন। ভবনটির দ্বিতীয় তলায় একটি কক্ষে থাকেন পিরোজপুর ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফুল ইসলাম। তার কক্ষের দুটি চাবির মধ্যে একটি ইউনুসের কাছে ছিল।
সোমবার দুপুর দেড়টার দিকে আরিফ হঠাৎ করেই ইউনুসের কাছে থাকা চাবিটি ফেরত চায়। তবে সেটি দিতে ব্যর্থ হয় ইউনুস। এরপরই ওসি আরিফ তাকে জানান যে, তার কক্ষ থেকে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা চুরি হয়েছে এবং ইউনুসই সেই টাকা নিয়েছে। তাই টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য তাকে চাপ প্রয়োগ করেন। ইউনুস টাকা চুরির কথা অস্বীকার করার পর তাকে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে ভবনের নিচতলায় নিয়ে যায় এবং তাকে মারধর শুরু করে। পরবর্তীতে ডিবি পুলিশের আরও ৭-৮ জন সদস্য সেখানে গিয়ে ইউনুসকে নির্মমভাবে মারধর করেন। এমনকি বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়। এছাড়া তিনি চিৎকার করলে তার মুখে লাঠি দিয়ে শব্দ বন্ধ করে রাখেন।
কোনো উপায় না পেয়ে ইউনুস তাদের বলেন, যেহেতু তার কাছে একটি চাবি ছিল তিনি ওই টাকা পরিশোধ করবে। এরপর ডিবি পুলিশের লোকজন তাকে তার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান। তখন পরিবারের সদস্যরা টাকাগুলো দেওয়ার জন্য রাত পর্যন্ত সময় দাবি করেন। পরবর্তীতে মেসে নিয়ে আবারও ইউনুসকে নির্যাতন করা হয়। এক পর্যায়ের আরিফের ঘনিষ্ঠ ডিবি পুলিশ সদস্য কাওসারের নেতৃত্বে ৩-৪ জন তাকে জোর করে রান্না ঘরে নিয়ে যান। এরপর তার পুরুষাঙ্গে মোমবাতি গলিয়ে আধাঘণ্টা ফেলতে থাকে। এ ঘটনার পর পরিবারের সদস্যরা আরিফকে টাকাগুলো পৌঁছে দেন। পরবর্তীতে ইউনুসকে পিরোজপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর আহমেদ সিদ্দিকীর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।
এরপর তিনি ইউনুসের কাছ থেকে বিস্তারিত শোনার পর ওই মেসে কাজ করা ঝাড়ুদার শাকিলকে ডেকে পাঠান। পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদে শাকিল টাকা চুরির কথা স্বীকার করে এবং পুলিশ সেই টাকা উদ্ধার করে। এরপর ইউনুস প্রথমে যে টাকা দিয়েছিল সেগুলো তাকে ফেরত দেওয়া হয়। তবে পরবর্তীতে তিনি চিকিৎসার জন্য পিরোজপুর সদর হাসপাতালে যেতে চাইলে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির তাকে পিরোজপুর শহরের একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে চিকিৎসা দেন। বিষয়টি জানাজানি হবে এ আশঙ্কায় চিকিৎসকের কাছে ইউনুসের সমস্যার বিষয়ে কিছুই বলতে দেননি হুমায়ুন।
পরে একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নির্দেশে পরদিন ডিবি পুলিশ ইউনুসকে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়। সেখানেও ইউনুসকে বলতে বাধ্য করে যে, স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করে তিনি নিজেই নিজের পুরুষাঙ্গ পুড়িয়েছেন। এছাড়া তিনি পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছেন। তবে এ ঘটনার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন ইউনুস। এছাড়া পুলিশের সঙ্গে পেরে উঠবেন না এই আশঙ্কায় তারা কোথাও কোনো অভিযোগ দেননি।
বিষয়টির সুষ্ঠু বিচারের জন্য পুলিশ সুপার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান ইউনুস। এছাড়া তাকে একটি কর্মসংস্থানের আশ্বাস দিয়ে বিষয়টি চেপে যাওয়ার জন্য ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। কিন্তু কর্মসংস্থান নয়, নির্মম এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছে ইউনুস ও তার পরিবার।
ইউনুসের ভাই আনিসুর রহমান বলেন, একজন খুনিকেও এভাবে নির্যাতন করা হয় না। যেভাবে আমার ভাইকে নির্মম নির্যাতন করা হয়েছে। তাই তিনিও এ ঘটনার সুষ্ঠ বিচার দাবি করেন।
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত আরিফুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তিনি ছুটিতে আছে বলে জানান এবং এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। বরং তিনি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। এ বিষয়ে পিরোজপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মজনুর আহম্মেদ সিদ্দিকিকে একাধিক বার ফোন দিলেও, তিনি তার ফোন রিসিভ করেননি।