দুর্নীতি দমন কমিশন © সংগৃহীত
বন্ড সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির নামে চীন থেকে বিপুল পরিমাণ সম্পূর্ণ তৈরিকৃত টাইলস এনে প্রায় ৩৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকার শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ-তাইওয়ান সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের (বিটিসিআইএল) বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানের পরিপ্রেক্ষিতে শুল্ক ফাঁকির বিষয়ে প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জালিয়াতির আশ্রয় নিতে রপ্তানি দেখানোর উদ্দেশ্যে জাল বিল অব ল্যাডিংসহ অন্যান্য নথি তৈরি করে তা ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১-এর সহকারী পরিচালক ধীরাজ চন্দ্র বর্মন বাদী হয়ে মামলাটি করেন। পরে দুদক চট্টগ্রাম-১ কার্যালয়ে মামলাটি নথিভুক্ত করেন উপসহকারী পরিচালক আপেল মাহমুদ বিপ্লব।
অভিযুক্তরা হলেন হাসান শরিফ (৬২), মো. জিয়া উদ্দিন (৪৫), খাজা শাহাদতউল্লাহ (৫৪), মো. জিয়াউর রহমান (৪৮), আদিল রিজওয়ান (৪১), মো. খায়রুজ্জামান (৪৬), মো. শহিদুল হক (৫৭) ও হাসান শাহীন (৫০)। এদের প্রত্যেকের ঢাকা জেলার বাসন্দিা। এ ছাড়া অপর দুজন হলেন চট্টগ্রামের বাসিন্দা দীপান্বিতা বড়ুয়া (৬৯) ও সুরীত বড়ুয়া (৭০)।
দুদক সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ-তাইওয়ান সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ২০১৩ সালে শতভাগ রপ্তানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বন্ড সুবিধার আওতায় নিবন্ধিত হয়। নিয়ম অনুযায়ী, বন্ড সুবিধায় আমদানিকৃত কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করে শতভাগ রপ্তানি করার কথা। দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৬২টি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে প্রায় ২২ হাজার ৯৪৩ দশমিক ৬৫ মেট্রিক টন সম্পূর্ণ তৈরিকৃত (ফিনিসড) টাইলস আমদানি করে। এসব পণ্য আনফিনিসড টাইলস বা কাঁচামাল হিসেবে দেখানো হয়।
আমদানিকৃত টাইলসের একটি চালান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর স্থগিত করে। পরে কায়িক পরীক্ষা করে নমুনা সংগ্রহ করা হয় ও তা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) গ্লাস অ্যান্ড সিরামিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পাঠানো হয়।
বুয়েটের প্রতিবেদন, ওয়ার্ল্ড কাস্টমস অর্গানাইজেশনের এক্সপ্লেনেটরি নোটস, বাংলাদেশ কাস্টমস ট্যারিফ এবং এনবিআরের এডভান্স রুলিং পর্যালোচনা করে শুল্ক গোয়েন্দা নিশ্চিত হয়, চালানটি আনফিনিসড নয়; বরং ফিনিসড টাইলস।
বন্ড নীতি অনুযায়ী আমদানিকৃত পণ্য রপ্তানি করার কথা থাকলেও নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি সিআইএস ডাটা অনুযায়ী ৮০টি বিল অব এক্সপোর্টের মাধ্যমে রপ্তানি দেখিয়েছে। এসব রপ্তানির বিপরীতে যথাযথ রপ্তানি আয় (পিআরসি) এসেছে বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
তবে রপ্তানি কার্যক্রম যাচাই করতে গিয়ে দুদকের অনুসন্ধানে অসঙ্গতি ধরা পড়ে। রপ্তানি সংক্রান্ত কাগজপত্রে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে ব্যাংকে দাখিল করা নথিপত্রকে ‘খাটি’ হিসেবে ব্যবহার করে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করা হয়েছে বলে দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে বলা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির দাখিল করা চালান যাচাইয়ের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজস্ব কর্মকর্তা দিলীপ চৌধুরী ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা নুরুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা জানান, তাদের দ্বারা কোনো চালান পরীক্ষা করা হয়নি। চালানপত্রে থাকা স্বাক্ষরও তাদের নয়।
এ ছাড়া ২০১৩-২০১৭ সাল পর্যন্ত কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের অডিট প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে বন্ড সুবিধার আওতায় আমদানিকৃত টাইলসের মজুদে গরমিল করেছে প্রতিষ্ঠানটি। স্থানীয় খোলা বাজারে বিক্রির প্রমাণও মিলেছে।
দুদকের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, পারস্পরিক যোগসাজশে জাল-জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৩৮ কোটি ৮৬ লাখ ৪৮ হাজার ১০০ টাকা শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে। এ ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ৪২০ ও ১০৯ ধারায় মামলা করা হয়েছে।
দুদক চট্টগ্রাম-১ কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক আপেল মাহমুদ বিপ্লব বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, তদন্ত চলাকালে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে সেটিও আমলে নেওয়া হবে।