মোহাম্মদ নবি ও তার ছেলে হাসান ইসাখিল © টিডিসি সম্পাদিত
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) প্রতিবারই জন্ম নেয় নানা গল্প, তবে এমন দৃশ্য আগে কখনোই দেখা যায়নি। মাত্র ১৯ বছর বয়সে নোয়াখালী এক্সপ্রেসের হয়ে মাঠে নেমেই হাসান ইসাখিল প্রমাণ করেন, তার ওপর ভরসা রাখা মোটেই ভুল ছিল না। ঢাকা ক্যাপিটালসের বিপক্ষে ম্যাচে দৃষ্টিনন্দন এক ইনিংস খেলেন, ৬০ বলে ৯২ রান করেন তিনি।
এ ছাড়া বাবা মোহাম্মদ নবির সঙ্গে তার চতুর্থ উইকেটে ৫৩ রানের কার্যকর জুটিতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় নোয়াখালী। ৭ চার ও ৫ ছক্কায় সাজানো সেই ইনিংসে তার স্ট্রাইক রেট ছিল ১৫৩ দশমিক ৩৩। মূলত তার ব্যাটে ভর করেই টুর্নামেন্টে নিজেদের সর্বোচ্চ ১৮৪ রান তোলে নোয়াখালী। শেষ পর্যন্ত ৪১ রানের জয়ও নিশ্চিত করে দলটি।
পরে সংবাদ সম্মেলনে ইসাখিলের ঠিক পাশেই বসেছিলেন বাবা নবি। এমন পরিবেশে ইসাখিলকে জিজ্ঞেস করা হলো—বাবা কি খুব কঠোর? হাসিমুখে ছেলের উত্তর, ‘একদমই না। আমাদের সম্পর্ক সাধারণ বাবা–ছেলের মতোই, বরং বন্ধুর মতো বলা যায়।’ তখনই নবি হেসে যোগ করেন, ‘আমি শুধু অনুশীলনের সময় কঠোর থাকি। তখন কোনো অজুহাত নেই।’
বাবা–ছেলের এই খুনসুটি কথোপকথনে মুহূর্তেই সংবাদ সম্মেলন কক্ষ জুড়ে হাসির আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। যদিও গল্পটা এখানে শুরু হয়নি, মাঠে বাবা নবির উপস্থিতিও যেন ছিল ছায়ার মতোই। নবি প্রতিটি ওভারেই ছেলেকে ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন, বোলার কী ভাবতে পারেন, পরের বলটা দ্রুত হবে নাকি স্লোয়ার। সেই পরামর্শ কাজে লাগিয়েই আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন ইসাখিল। সংবাদ সম্মেলনে ইসাখিল জানালেন, বাবা তার আইডল হলেও তাকে নকল করতে চান না তিনি।
যদিও ইসাখিলের ব্যাটিংয়ে বাবার ছায়াই স্পষ্ট। ব্যাটের নিচের দিকে গ্রিপ, সাবলীল স্ট্যান্স এবং বল পুরো ওঠার আগেই শট খেলার প্রবণতা—সবই নবীর কথা মনে করিয়ে দেয়। স্কয়ার কাট, ফ্লিক দিয়ে ইনিংস শুরু করার পাশাপাশি একটি পুল শটে যেন বাবাকেই দেখা গেল। আইডল কে—এই প্রশ্নে একমুহূর্ত না ভেবেই ইসাখিলের উত্তর, ‘আমার বাবা’।
ইসাখিলের ভাষ্য, ‘আমি আমার ব্যাটিং দেখিনি। আমি কপি করিনি। আমার বন্ধুরাও বলে তুমি তোমার বাবাকে অনুকরণ করছো। তবে এটা স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে। আমাদের বন্ডিং বন্ধুর মতো। আমরা ক্রিকেট নিয়ে সবই শেয়ার করি।’
নবিও অকপটে জানালেন ছেলে তাকে অনুসরণ করেন না। তার দাবি, ‘এটা ওর নিজস্ব স্টাইল। ও জন্মগতভাবেই এমন।’
ছেলের সঙ্গে খেলার দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান প্রসঙ্গে নবি বলেন, ‘ছেলের সঙ্গে খেলার জন্য আমি অনেকদিন ধরে অপেক্ষা করছিলাম। আমি ওকে একজন পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তুলেছি। অভিষেকে খুব ভালো পারফরম্যান্স করেছে সে। অভিষেকের আগে গতকাল (১০ জানুয়ারি) আমি ওকে ৯০ মিনিট সময় দিয়েছি বোলারদের ধরন বোঝাতে। এমনকি সাইড-আর্ম স্টিক দিয়ে ওকে বেশ কঠিন প্র্যাকটিস করিয়েছি। যেকোনো তরুণের জন্য অভিষেকের চাপ সামলানো কঠিন, কিন্তু ও সেটা খুব ভালোভাবে পেরেছে।’
এদিকে বিপিএল অভিষেকেই সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগিয়েছিলেন নবিপুত্র। তবে শেষমেশ তা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু এ নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই ইসাখিলের।
তিনি বলেন, ‘আমি তখন ছক্কা মারার চেষ্টা করছিলাম যাতে দলের স্কোর বড় হয়। সেঞ্চুরি করতে না পেরে আমি হতাশ নই। আমার কোনো আক্ষেপ নেই এনিয়ে।’
সবমিলিয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখানো বাবা–ছেলের এই অধ্যায় বিপিএলকে উপহার দিল এক অনন্য ও স্মরণীয় গল্প।