ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বতন্ত্র হাসপাতাল: সময়ের দাবি, নাকি ভবিষ্যতের বিনিয়োগ?

৩০ জুন ২০২৬, ০৭:০৬ PM , আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৬ PM
ইমরান হোসেন

ইমরান হোসেন © টিডিসি সম্পাদিত

ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রতিদিনই দেখা যায় এক পরিচিত দৃশ্য। কেউ হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য, কেউ ক্যানসারের উন্নত থেরাপি নিতে, কেউ জটিল অস্ত্রোপচারের আশায় ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর কিংবা চীনের উদ্দেশে রওনা দিচ্ছেন। অনেক পরিবার জীবনের সঞ্চয় ভেঙে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাচ্ছে। এটি শুধু একটি পরিবারের সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা এবং অর্থনীতির সক্ষমতারও প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশের বছরে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি ব্যয় হয়। ভারত সরকারের তথ্যেও দেখা যায়, চিকিৎসা ভিসায় ভারতে যাওয়া বিদেশিদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই সর্বাধিক। অর্থাৎ উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রতিবছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো—এই ব্যয়ের একটি বড় অংশ কি দেশের ভেতরেই ধরে রাখা সম্ভব?

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশে বর্তমানে ৫টি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ১০৪টি মেডিকেল কলেজ এবং ৩৫টি ডেন্টাল কলেজ ও ডেন্টাল ইউনিট রয়েছে। প্রায় ১৮ কোটিরও বেশি মানুষের জন্য এই প্রতিষ্ঠানগুলো চিকিৎসক তৈরির প্রধান ভিত্তি। ওষুধশিল্পও দেশের অন্যতম সফল রপ্তানি খাত। তবু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসক-জনসংখ্যার অনুপাতও এখনো উন্নত দেশের তুলনায় কম। ফলে জটিল রোগের চিকিৎসা, গবেষণা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।

এই বাস্তবতায় বিশ্বের অভিজ্ঞতার দিকে তাকানো প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় ফার্স্ট হাসপাতাল ও ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝংশান হাসপাতাল কেবল চিকিৎসাকেন্দ্র নয়; এগুলো গবেষণা, উদ্ভাবন, চিকিৎসা শিক্ষা এবং জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এসব প্রতিষ্ঠানে একজন চিকিৎসক, একজন প্রকৌশলী, একজন জীববিজ্ঞানী এবং একজন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ একই রোগের সমাধানে একসঙ্গে কাজ করেন। গবেষণাগারের উদ্ভাবন দ্রুত রোগীর শয্যায় পৌঁছে যায়। সেখান থেকেই জন্ম নেয় নতুন ওষুধ, চিকিৎসা প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোগ নির্ণয় পদ্ধতি এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা।

চীনের অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় ও ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসপাতালগুলো শুধু রোগী চিকিৎসাই করে না; ক্যানসার, জিনগত রোগ, কোষ চিকিৎসা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং জীবপ্রযুক্তি গবেষণায় বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানের কাতারে রয়েছে। এই গবেষণার ওপর ভিত্তি করেই চীনের জৈবপ্রযুক্তি শিল্প, চিকিৎসা যন্ত্র উৎপাদন এবং ওষুধশিল্প বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। একইভাবে ভারতের বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার সুন্দরলাল হাসপাতাল এবং আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের জওহরলাল নেহরু মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চিকিৎসা, শিক্ষা ও গবেষণাকে একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছে। ভারত আজ দক্ষিণ এশিয়ার চিকিৎসা পর্যটনের কেন্দ্র—এর পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক চিকিৎসা ও গবেষণা ব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য এই অভিজ্ঞতা অমূল্য। কারণ, দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যেই বহুবিষয়ক গবেষণার একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলেছে। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে নিজস্ব চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে। ফার্মেসি, বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি এবং মাইক্রোবায়োলজি,  জিনপ্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি, অণুজীববিজ্ঞান, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, জনস্বাস্থ্য, রসায়ন, বায়োমেডিকেল ফিজিক্স এন্ড টেকনোলজি এবং ফিজিক্সসহ চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত বহু বিভাগ এবং আধুনিক গবেষণাগার এখানে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা পরিচালনা করছে। এসব গবেষণাকে যদি একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের মাধ্যমে রোগীর চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবে গবেষণা ও সেবার মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের ঐতিহাসিক সম্পর্কও এখানে স্মরণযোগ্য। ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রথম দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাঠামোর অংশ ছিল। পরে চিকিৎসা শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পৃথক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠে। আজও সেই ঐতিহাসিক সম্পর্ক আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিশ্ববিদ্যালয় ও চিকিৎসা শিক্ষা পরস্পরের পরিপূরক।

অবশ্য এ কথাও সমানভাবে সত্য যে, দেশের বিদ্যমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজগুলোর অবদান অসামান্য। স্বাধীনতার পর থেকে তারাই দেশের চিকিৎসক তৈরির মূল ভিত্তি। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য মেডিকেল কলেজ প্রতিনিয়ত চিকিৎসা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের ধারণাকে কখনোই এসব প্রতিষ্ঠানের বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং এটি হবে গবেষণা, উদ্ভাবন ও আন্তঃবিষয়ক চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি পরিপূরক কেন্দ্র।

এ ধরনের একটি বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হলে দেশের অর্থনীতিও উপকৃত হতে পারে। বিদেশে চিকিৎসার জন্য ব্যয় হওয়া বৈদেশিক মুদ্রার একটি অংশ দেশে থেকে যাবে। আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুদান, বিদেশি শিক্ষার্থী ও গবেষক আকৃষ্ট হবে। জৈবপ্রযুক্তি, চিকিৎসা যন্ত্র, ওষুধ উদ্ভাবন এবং স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি শিল্প নতুন গতি পাবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ তুলনামূলক কম ব্যয়ে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তবে এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন সহজ নয়। প্রয়োজন হবে পৃথক আইনগত কাঠামো, আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, দক্ষ চিকিৎসক-শিক্ষক, গবেষক, আধুনিক যন্ত্রপাতি, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং সর্বোপরি সুশাসন। বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল পরিচালনা একটি বিশেষায়িত দায়িত্ব; এখানে একাডেমিক স্বাধীনতা ও পেশাগত দক্ষতার সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।

এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) ভূমিকা হবে হাসপাতাল পরিচালনা নয়; বরং গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, মাননিয়ন্ত্রণ, আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা নেটওয়ার্ক গঠন এবং উচ্চশিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন। অন্যদিকে সরকারের দায়িত্ব হবে একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা, গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বিশ্ববিদ্যালয়–শিল্প–হাসপাতাল অংশীদারত্ব গড়ে তোলা।

একটি দেশের উন্নয়ন শুধু সেতু, মহাসড়ক বা আকাশচুম্বী ভবন দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হলো সেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, হাসপাতালের মান এবং মানুষের আস্থা। বাংলাদেশ যখন জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ার কথা বলছে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়কে হতে হবে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং জনকল্যাণের কেন্দ্র।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আন্তর্জাতিক মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ধারণা তাই আবেগের নয়, নীতিনির্ভর আলোচনার দাবি রাখে। এটি যদি বিদ্যমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সমন্বয়, সুপরিকল্পিত বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক মানের শাসনব্যবস্থা এবং গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি শুধু আরেকটি হাসপাতাল হবে না; বরং বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, গবেষণা ও জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। যে দেশে আজ মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যায়, সেই দেশই একদিন চিকিৎসা, গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশি রোগী, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের গন্তব্য হবে—এই স্বপ্ন আর কল্পনা নয়; সঠিক পরিকল্পনা ও দূরদর্শী নেতৃত্ব থাকলে সেটিই হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী উন্নয়ন অভিযাত্রার একটি বাস্তব মাইলফলক।

লেখক: সিনিয়র সহকারী পরিচালক, ইউজিসি

শুরুতেই বাঁচল ক্রোয়েশিয়া 
  • ০৩ জুলাই ২০২৬
বিশ্বরেকর্ড গড়লেন স্পেনের গোলকিপার সিমন 
  • ০৩ জুলাই ২০২৬
রোনালদো–মদ্রিচ মাঠে নামলেই বিশ্বকাপে নতুন ইতিহাস
  • ০৩ জুলাই ২০২৬
এক পরিবর্তন নিয়ে নামছে পর্তুগাল, অপরিবর্তিত ক্রোয়েশিয়া
  • ০৩ জুলাই ২০২৬
২০১০ সালের পর স্পেনের প্রথম নকআউট ম্যাচ জয়
  • ০৩ জুলাই ২০২৬
দারুণ জয়ে শেষ ষোলোয় স্পেন
  • ০৩ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence