মসজিদে জামায়াতের দলীয় কার্যক্রম: ইসলাম কী বলে

১২ জুলাই ২০২৬, ০৬:১০ PM
মোঃ ফিরোজ আলম 

মোঃ ফিরোজ আলম  © টিডিসি ফটো

মক্কার জাবালে নূর পর্বতের 'হেরা' গুহায় হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর উপর ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে পবিত্র কোরআন নাজিল হয়। সূরা আলাকের প্রথম ৫ আয়াত দিয়ে শুরু করে পর্যায়ক্রমে দীর্ঘ ২৩ বছরে সম্পূর্ন কোরআন নাজিল হয়। নিরাপত্তা রক্ষার্থে প্রথমদিকে কোরআন সম্পর্কে কোনো মসজিদে দাওয়াত কিংবা দিকনির্দেশনামূলক আলোচনা হয়নি। এমনকি নবুয়তের প্রথম ৩ বছর রসুলুল্লাহ (সাঃ) গোপনে তাঁর পরিবার, ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধব এবং অতি বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের  দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছিলেন। আল্লাহ এই দাওয়াত সম্পর্কে বলেন - "আর আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করুন।" (সূরা আশ-শুআরা, আয়াত: ২১৪)

ইসলামের ইতিহাসে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মসজিদ নির্মাণ শুরু হয় ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে। রসুলুল্লাহ (সা.)  হিজরতের সময় মক্কা থেকে মদিনায় পৌঁছানোর ঠিক আগে 'কুবা' নামক স্থানে চার দিন অবস্থান করেন এবং সেখানে ইসলামের প্রথম মসজিদ 'মসজিদ আত-তাকওয়া' বা কুবা মসজিদ নির্মাণ করেন। এই মসজিদে তিনি সালাত আদায় করেন। এই সম্পর্কে পবিত্র কোরআন শরীফে বলা হয়েছে -"...অবশ্যই যে মসজিদ প্রথম দিন থেকেই তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেটাই আপনার সালাত আদায়ের জন্য অধিক উপযুক্ত..." (সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১০৮)।

সেখানে থেকে নবী করীম (সাঃ) মদিনায় পৌঁছে মদিনার কেন্দ্রস্থলে দ্বিতীয় মসজিদ 'মসজিদে নববী' নির্মাণ শুরু করেন এবং নির্মাণকাজ সমাপ্ত করেন। তিনি এই মসজিদে সালাত আদায়ের পাশাপাশি ৬২২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেন। মদিনা সনদের মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এই মসজিদকে প্রধান আদালত বা বিচারালয় হিসেবেও ব্যবহার করতেন। এমনকি, এই মসজিদে একটি নির্দিষ্ট স্থান ছিল (যা পরবর্তীতে 'উস্তুওয়ানাতুল উফূদ' বা প্রতিনিধিদের স্তম্ভ নামে পরিচিত হয়), যেখানে বসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন গোত্রের বিচার, ফয়সালা ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি সম্পাদন করতেন। তখন তিনি সম্পূর্ণ বিচারকার্য সম্পন্ন করতেন কোরআনের আইন অনুযায়ী। এই সম্পর্কে আল্লাহ বলেন - নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাজিল করেছি, যাতে আপনি মানুষের মধ্যে সেই অনুযায়ী ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ আপনাকে দেখিয়েছেন।" - (সুরা আন-নিসা, আয়াত: ১০৫)। জামায়াত ইসলামী যদি মসজিদে বসে বিচারকার্য পরিচালনা করে থাকেন সেখানে তাদের বিচারকার্য কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত হয় কী?

শুধু তাই নয় রাসুলুল্লাহ (সাঃ) মসজিদে বসে ইসলাম প্রচারের উদ্যোগ, বড় কোনো সিদ্ধান্ত এমনকি যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পূর্বে মুমিন সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করতেন। সেখানেই মুমিনদের মতামত শুনতেন এবং সবার মতামতের ভিত্তিতে ও আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতেন। এই সম্পর্কে আল্লাহ বলেন -"এবং তাদের (মুমিনদের) কাজকর্ম পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে হয়ে থাকে।"- (সুরা আশ-শূরা, আয়াত: ৩৮)। জামায়াত ইসলামী যদি মসজিদে বসে পরামর্শ করে থাকেন তা কোরআনের বিধান অনুযায়ী গ্রহণ করা হয় কী? সেখানে যারা মতামত প্রদান করে থাকে সবাই মুমিন নাকি, বেনামাজী, মিথ্যাবাদী, প্রতারকও মতামত ও পরামর্শ প্রদান করে থাকে।

ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে একটি পর্যায়ে মোনাফেকরাও মসজিদে ঈমানদারদের ছল ধরে অবস্থান করতেন। নবীজীর সাথে সালাত আদায়ের জন্য দাঁড়াতেন। তাদের উদ্দেশ্য আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা নয় বরং ন্যায়বিচারের পরিপন্থী আচরণ করা, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআন শরীফে বলা হয়েছে - “নিশ্চয়ই মুনাফেকরা আল্লাহর সাথে প্রতারণা করতে চায়, আর তিনিও তাদের ধোঁকায় ফেলেন। এবং যখন তারা সালাতে দাঁড়ায়, তখন অলসতার সাথে দাঁড়ায়, কেবল মানুষকে দেখানোর জন্য এবং তারা আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে।" (সূরা আন-নিসা, ৪:১৪২)। 

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) যখন মোনাফেকদের মসজিদে উপেক্ষা করা শুরু করেন তখন তারা মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে ইসলামের ক্ষতিসাধন করতে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। মুনাফেকরা নিজেদের মুমিন হিসেবে পরিচয় দিয়ে আলাদা মসজিদ তৈরি করেন। নবীজী সেই সব মসজিদে যেতেন না এবং এসব মসজিদকে অভিহিত করা হয় ষড়যন্ত্রের মসজিদ হিসেবে। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে - "আর যারা মসজিদ নির্মাণ করেছে ক্ষতিসাধন, কুফরি ও মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং ইতঃপূর্বে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ করেছে তার ঘাঁটিরূপে ব্যবহারের জন্য... আপনি কখনই সেখানে (নামাজের জন্য) দাঁড়াবেন না।" - (সুরা আত-তাওবাহ্, আয়াত: ১০৭-১০৮)। জামায়াত ইসলামী মসজিদে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে তা বাস্তবিক অর্থে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ দূর করতে কতটা কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে?

মোনাফেকদের এইসব ষড়যন্ত্রের হাত থেকে মুমিনদের মসজিদসমূহ রক্ষা করে মুমিনদের মাধ্যমে মসজিদসমূহ পরিচালনা করতে আল্লাহ বলেন - "নিশ্চয়ই আল্লাহর মসজিদসমূহ তারাই আবাদ (নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ) করবে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান আনে, সালাত কায়েম করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না..." (সূরা আত-তাওবাহ, ৯:১৮)। মসজিদসমূহ যাতে তারা খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে না পারে এবং তা থেকে পবিত্র রাখার জন্য পবিত্র কোরআন শরীফে বলা হয়েছে -"আর আমি ইব্রাহিম ও ইসমাইলকে আদেশ করেছিলাম যে, তোমরা আমার গৃহকে (কাবা শরিফ বা মসজিদ) তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী ও রুকু-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখো।" (সূরা আল-বাকারাহ, ২:১২৫)। 

জামায়াত ইসলামী’র হিন্দু শাখা রয়েছে, অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য আলাদা আলাদা শাখা রয়েছে কিনা তা নিয়েও জনগণের কাছে ধোঁয়াশা রয়েছে। সেক্ষেত্রে তাদের মতামতের গুরুত্ব কোথায় গ্রহণ করা হয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে এই মতামত কীভাবে কিংবা কতটুকু মূল্যায়ন করা হয় এই বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। মোনাফেকদের পরামর্শ কিংবা মর্জি অনুযায়ী যাতে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা না হয় এজন্য আল্লাহ বলেন - "আর আদেশ করছি যে, আপনি তাদের পারস্পরিক বিষয়াদিতে আল্লাহ যা নাজিল করেছেন সে অনুযায়ী ফয়সালা করুন এবং তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না..."( সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৪৯)। মসজিদে যাতে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো স্তুতি কিংবা ইবাদত না করা হয় এ মর্মে পবিত্র কোরআন শরীফের সূরা জ্বীন এর ১৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে - এবং মসজিদসমূহ আল্লাহর ইবাদতের জন্য। সুতরাং তোমরা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ডেকো না।

সর্বোপরি, হযরত মুহাম্মদ সাঃ মসজিদসমূহ যখন বিচারকার্যসহ অন্যান্য প্রয়োজনে ব্যবহার করেছিলেন তখন মুসলমানদের জন্য আলাদা বিচারালয় ছিল না। নিজেদের মধ্যে সভা-সমাবেশ করার জন্য বর্তমান বিশ্বের মতো আলাদা অডিটোরিয়াম ছিলো না। বর্তমানে যেমন মুসলমানদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে তখন অনেক ক্ষেত্রে বাহিরে সভা-সমাবেশ ঝুঁকিপূর্ণও ছিলো। তখন মুসলমানদের জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তার স্থান, সমাবেশস্থলও আশ্রয়স্থল ছিলো মসজিদ। বর্তমানে বিচারকার্যের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে আদালত আছে। এর বাহিরে ইসলামী কালচার অনুযায়ী ছোটোখাটো ঘটনার ন্যায় বিচার পেতে মসজিদ দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে ইমাম সাহেবরা কোনো পক্ষপাতিত্ব না করে ন্যায় বিচার করতে পারেন। 

দেশে যুদ্ধ কিংবা কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় বাহিনী রয়েছে, তারাই অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে এবং নিরাপত্তার সাথে নির্ধারিত স্থান বা অডিটোরিয়ামে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। উন্নত তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে সবাইকে একসঙ্গে সশরীরে উপস্থিত না হয়েও ভার্চুয়ালি একত্রিত হতে পারেন। 

দেশের নিরাপত্তা এবং নাগরিকদের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা, অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত একাধিক সম্মেলনস্থল আছে। এসব থাকা সত্ত্বেও বর্তমান বাস্তবতার ক্ষেত্রে জামায়াতের দলীয় কার্যক্রম, হিসাব-নিকাশ কিংবা সভা-সমাবেশের ক্ষেত্রে মসজিদসমূহে ব্যবহার করা কতটা যৌক্তিক এই বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর যৌক্তিক ব্যাখ্যা প্রকাশ করা প্রয়োজন।

লেখক: এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক গণসংযোগ সম্পাদক, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ

ট্যাগ: মতামত
দুর্নীতির মামলায় কাস্টমসের ১১ কর্মকর্তার জামিন বাতিল, কারাগ…
  • ১২ জুলাই ২০২৬
বিএসবির খায়রুল বাশারের ৩৩ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক করল সিআইডি
  • ১২ জুলাই ২০২৬
প্রতারণা মামলায় সময় টিভির সাবেক এমডি জোবায়েরের জামিন হয়নি 
  • ১২ জুলাই ২০২৬
প্রাথমিক বৃত্তির টাকা দ্বিগুণ হচ্ছে
  • ১২ জুলাই ২০২৬
দীর্ঘ আট বছর পর গতি পেল চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল…
  • ১২ জুলাই ২০২৬
সেপ্টেম্বরের মধ্যে পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারির দাবি, বিলম্ব …
  • ১২ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence