মোঃ শরিফুল ইসলাম © টিডিসি সম্পাদিত
একটি দেশের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপর নির্ভর করে না, বরং নির্ভর করে সেই দেশ কতটা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করছে, সেই জ্ঞানকে কতটা সংরক্ষণ করছে এবং উন্নয়নের কাজে কতটা ব্যবহার করতে পারছে তার উপর। একবিংশ শতাব্দীতে জ্ঞানই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। আর গবেষণা হলো সেই সম্পদ সৃষ্টির প্রধান মাধ্যম।
বাংলাদেশে গত দুই দশকে উচ্চশিক্ষার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ, গবেষণা প্রকাশনার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবছর হাজার হাজার স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি গবেষণা, শত শত গবেষণা প্রকল্প এবং অসংখ্য বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ প্রকাশ হচ্ছে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অনিবার্যভাবে বারবার সামনে আসছে যে, এই গবেষণার ফলাফল কতটুকু জাতীয় উন্নয়ন, উদ্ভাবন এবং জনকল্যাণে কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে? দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের গবেষণার বড় অংশই বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত থাকে। কোথাও একটি থিসিস গ্রন্থাগারের তাকেই সীমাবদ্ধ, কোথাও গবেষণা প্রতিবেদন কোনো দপ্তরের ফাইলেই আটকে থাকে, আবার কোথাও প্রকাশিত গবেষণাও সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে একই বিষয়ে একাধিকবার গবেষণা হয়, সরকারি অর্থের অপচয় ঘটে এবং গবেষণার ফলাফল সমাজ ও রাষ্ট্রের কাজে যথাযথভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ বাস্তবতায় বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের “জাতীয় গবেষণা রিপোজিটরি” প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি কেবল একটি ডিজিটাল তথ্যভান্ডার হিসেবেই নয় বরং বাংলাদেশের গবেষণা ব্যবস্থার ভিত্তিগত সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। জাতীয় গবেষণা রিপোজিটরি গবেষণাকে দৃশ্যমান করবে। বর্তমানে একজন গবেষক নতুন কোনো বিষয়ে কাজ শুরু করার আগে দেশে একই বিষয়ে কী ধরণের গবেষণা হয়েছে, তা জানতে অনেক সময় ব্যয় করেন। অনেক ক্ষেত্রে সেই তথ্য সময়মতো পাওয়া যায় না। ফলে একই ধরনের গবেষণার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। যদি দেশের সব গবেষণা একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে থাকে, তাহলে একজন গবেষক সহজেই বিদ্যমান জ্ঞান পর্যালোচনা করে নতুন গবেষণার ক্ষেত্র নির্ধারণ করতে পারবেন। এতে গবেষণার মৌলিকত্ব বাড়বে, পুনরাবৃত্তি কমবে এবং সরকারি অর্থের আরও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হবে।
এই রিপোজিটরি গবেষণার গুণগত মান উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গবেষণা যত বেশি উন্মুক্ত হবে, তত বেশি তা সমালোচনা, মূল্যায়ন ও পর্যালোচনার সুযোগ সৃষ্টি করবে। এতে গবেষকের জবাবদিহি যেমন বাড়বে, তেমনি গবেষণার মানও উন্নত হবে। একই সঙ্গে Research Integrity এবং প্লেজিয়ারিজম, ডুপ্লিকেট গবেষণা ও অন্যান্য অসদাচরণ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
বর্তমান বাস্তবতায় গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্ত ও বিশ্লেষণনির্ভর নীতিনির্ধারণই বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। দেশে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং শিল্পোন্নয়নসহ নানা বিষয়ে গবেষণা হচ্ছে। কিন্তু এসব গবেষণা বিচ্ছিন্ন থাকায় নীতিনির্ধারকদের কাছে সেগুলো সহজে পৌঁছায় না। একটি জাতীয় গবেষণা রিপোজিটরি থাকলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত প্রয়োজনীয় গবেষণালব্ধ তথ্য খুঁজে পাবে এবং তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে।
এটি বাংলাদেশের গবেষণাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নতুন পরিচিতি দেবে। বর্তমানে র্যাংকিং নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মূল্যায়নে শুধু গবেষণাপত্রের সংখ্যা নয়, বরং গবেষণার দৃশ্যমানতা, উদ্ধৃতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সামাজিক প্রভাবও বিবেচনা করা হয়। একটি জাতীয় রিপোজিটরি বাংলাদেশের গবেষণাকে বৈশ্বিক অনুসন্ধান ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারলে আন্তর্জাতিক গবেষকরা সহজেই আমাদের গবেষণা ব্যবহার করতে পারবেন। এর ফলে উদ্ধৃতি বাড়বে, আন্তর্জাতিক যৌথ গবেষণা বৃদ্ধি পাবে এবং বিদেশি গবেষণা অনুদান পাওয়ার সম্ভাবনাও শক্তিশালী হবে। ভারতের Shodhganga আজ হাজার হাজার থিসিসের জাতীয় ভান্ডার। ইউরোপের OpenAIRE বিভিন্ন দেশের গবেষণাকে একটি সমন্বিত অবকাঠামোর আওতায় এনেছে। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় উন্মুক্ত গবেষণা-ভান্ডারের মাধ্যমে গবেষণাকে জনগণের জন্য সহজলভ্য করেছে। এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশও বৈশ্বিক ধারার অংশ হতে পারে।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন যে, “জাতীয় গবেষণা রিপোজিটরি”-এর গুরুত্ব একটি সাধারণ সফটওয়্যার প্রকল্পের চেয়ে অনেক বেশি, কেননা এটি জাতীয় পর্যায়ে গবেষণা ব্যবস্থাপনা, তথ্য সংরক্ষণ ও জ্ঞান বিনিময়ের একটি মৌলিক অবকাঠামো। তবে এর সফলতা শুধুমাত্র প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল নয়, বরং উপযুক্ত নীতিগত দিকনির্দেশনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সমন্বিত প্রয়োগের উপর নির্ভরশীল।
এ ব্যবস্থায় প্রতিটি গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন Metadata, Digital Object Identifier (DOI) এবং Open Researcher and Contributor ID সংযুক্ত করতে হবে। গবেষণার গুণগত মান নিশ্চিত করতে প্লেজিয়ারিজম যাচাই এবং মানসম্মত তথ্য যাচাইকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ওপেন-অ্যাকসেস ও কপিরাইট নীতিমালার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে, যাতে গবেষকের স্বত্বও সুরক্ষিত থাকে এবং গবেষণাও জনগণের কাজে আসে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিদ্যমান ডিজিটাল রিপোজিটরির সঙ্গে আন্তঃসংযোগ (Interoperability) নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আলাদা আলাদা তথ্যভান্ডার নয়, এটি একটি সমন্বিত জাতীয় নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। আমার মতে, জাতীয় গবেষণা রিপোজিটরিকে শুধু গবেষণাপত্র সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত হবে না। এটি গবেষণা অনুদান ব্যবস্থাপনা, গবেষণা প্রকল্প পর্যবেক্ষণ, গবেষকের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন, গবেষণা-উপাত্ত সংরক্ষণ এবং জাতীয় গবেষণা সূচক তৈরির সঙ্গেও সংযুক্ত করা উচিত। যার মাধ্যমে এ ব্যবস্থাকে বাংলাদেশের গবেষণা ব্যবস্থাপনার ডিজিটাল মেরুদণ্ড হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশকে একটি জ্ঞানভিত্তিক, উদ্ভাবননির্ভর এবং উচ্চ আয়ের দেশে রুপান্তরের লক্ষ্য অর্জনের জন্য গবেষণাকে কেবল একাডেমিক অনুশীলন হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না, বরং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। জাতীয় গবেষণা রিপোজিটরি সেই রূপান্তরের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ইউজিসি’র এই সিদ্ধান্ত তাই নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ও দূরদর্শী। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়ন কৌশলের উপর। যদি এটি আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী গড়ে তোলা যায় এবং দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে কার্যকরভাবে সংযুক্ত করা যায়, তাহলে এটি শুধু গবেষণার একটি ডেটাবেসই নয়, বরং বাংলাদেশের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি নির্মাণের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠবে।
আজকের পৃথিবীতে প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে জ্ঞানসম্পদের মূল্য অনেক বেশি। বাংলাদেশের গবেষণা খাতকে যদি আমরা জাতীয় সম্পদে পরিণত করতে পারি, তাহলে তার সুফল শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, রাষ্ট্র, শিল্প, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সবার কাছেই পৌঁছাবে। “জাতীয় গবেষণা রিপোজিটরি” সেই সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। এখন প্রয়োজন দূরদর্শী বাস্তবায়ন, শক্তিশালী নীতিমালা এবং গবেষণাকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকার।
লেখকঃ সিনিয়র সহকারী পরিচালক, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন।