কওমি মাদ্রাসা: সংকট, সংস্কার ও মূলধারার সাথে সমন্বয় প্রস্তাবনা

১৯ জুলাই ২০২৬, ০২:৫১ PM
নাজমুল হুদা আজাদ 

নাজমুল হুদা আজাদ  © সংগৃহীত

দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক মাননিয়ন্ত্রণ এখন সময়ের দাবী। বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোর ইতিহাস অনেক প্রাচীন। অধিকন্তু তাদের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধর্মভিত্তিক হওয়ার কারণে যেকোন সরকার তাদের শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারে হাত দিতে দু'বার ভাবেন। কিন্তু দেশের এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার সাথে একেবারে সামঞ্জস্যহীন অবস্থায় যুগ যুগ ধরে ফেলে রাখা অনুচিত। 

স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও আলিয়া মাদ্রাসাসমূহ নিবন্ধনের আওতায় থাকলেও যুগ যুগ ধরে কওমি মাদ্রাসাসমূহ নিবন্ধনের আওতামুক্ত রয়ে যাচ্ছে। মূলধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ সরকারের আংশিক বা পরিপূর্ণ অর্থায়নের উপর নির্ভরশীল হলেও কওমি মাদ্রাসাসমূহের অর্থায়ন অনানুষ্ঠানিক ও অনেক সময় সন্দেহজনক। তুলনামূলকভাবে এবং বহুলাংশে কওমি শিক্ষার্থীরা সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করার ফলে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও একান্ত ধর্মীয় চেতনা থেকে দেশ-বিদেশের অনেক দানশীল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আল্লাহর ওয়াস্তে কওমি মাদ্রাসাসমূহে দান করে থাকেন। স্বাধীন ও অনানুষ্ঠানিক অর্থায়নের সুযোগ নিয়ে দেশের আনাচে-কানাচে প্রয়োজনাতিরিক্তভাবে ছোট- বড় হাজার হাজার কওমি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এর ব্যাপ্তি হেফাজখানা থেকে শুরু করে বড় বড় মাদ্রাসা পর্যন্ত। সারাদেশে কী পরিমাণ কওমি মাদ্রাসা আছে তা হয়তো সরকারের হিসেবেরও বাইরে। 

এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের প্রথমত কোন নিবন্ধন নাই। দ্বিতীয়ত অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হওয়ার দরুন  শিক্ষার মান যাচ্ছেতাই। তৃতীয়ত শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক সুরক্ষার জায়গা চূড়ান্তভাবে অবহেলিত। ফলে এই সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় ভরা।

কওমি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহকে নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। সরকার চাইলে বিদগ্ধ কওমি আলেম, মূলধারার শিক্ষা বিশারদ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, অধিকারকর্মী ও সরকারি আমলাদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করতে পারে। সরকার উদ্যোগী হলেই যে প্রতিষ্ঠানসমূহ অতি সহজে সরকারের প্রস্তাব মেনে নিবে ব্যাপারটা মোটেও এমন নয়। ওয়াশিংটন অ্যাকর্ড এর উপর ভিত্তি করে ডিগ্রিসমূহের মান নিশ্চিতকরণে পারস্পরিক সম্মতিতে স্বাক্ষরিত বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের আন্ডারগ্রেজুয়েট ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিসমূহ যেমন অ্যাক্রেটডিটেশনের আওতায় এসেছে স্ব স্ব দেশীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে (যেমন: BAC, BAETE); ঠিক তেমনিভাবে সরকারের উদ্যোগে কওমি ঘরানার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এরকম একটি চুক্তির আওতায় আসতে পারে। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেলে কোন প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের আওতামুক্ত থাকা সহজ হবে না। এবং কোন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক ডাটাবেজের আওতামুক্ত থাকবে না। 

দেশের অধিকাংশ কওমি মাদ্রাসার অবকাঠামো আবাসিক হলেও মানের বিচারে খুবই দরিদ্র। হেফজখানা থেকে শুরু করে অনেক বড় বড় মাদ্রাসায় পর্যন্ত প্রাপ্তবয়স্ক-অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীরা একসাথে নূন্যতম ব্যক্তিগত গোপনীয়তাহীনভাবে থাকে। ফলে এ ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমকামিতারমতো ব্যাপারসমূহ প্রায়শই ঘটতে দেখা যায়। এর বাইরেও বহুমাত্রিক মানসিক ও শারীরিক সহিংসতার ঘটনা নৈমিত্তিক। অনেক সময় ভিকটিমরা সামাজিকভাবে প্রান্তিক হওয়ায় ও ধর্মীয় জোযোর ভয়ে তাদের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো সামনে আনতে সাহস করতে পারে না। এ সমস্ত সহিংসতা নিরসনে প্রথমেই নিবন্ধনের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর নিশ্চয়তা থাকাটা জরুরী। দ্বিতীয়ত যেকোন ধরনের মানসিক ও শারীরিক সহিংসতা প্রতিরোধে প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘সহিংসতা নিরোধ কমিটি’ গঠনের সাথে সাথে তাদের মাধ্যমে নিয়মিত মানসিক ও শারীরিক সহিংসতা বিরোধী বিভিন্ন সচেতনতামূলক সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম আয়োজনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা উচিত। শুধু করলেই হবে না; প্রতিটি আয়োজন নথিভূক্ত থাকতে হবে- যাতে পরবর্তীতে প্রয়োজন পড়লে যাচাই-বাছাই করা যায়।

দেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম নির্ধারণ ও শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকারের যে ধরনের আগ্রহ ও আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ চোখে পড়ে, এদিক দিয়ে কওমি মাদ্রাসাগুলো সম্পূর্ণ এতিম। দেশের মূধারার শিক্ষাব্যবস্থার সাথে ন্যূনতম সংযোগহীনভাবে সম্পূর্ণ ধর্মীয় একটি পাঠ্যক্রমের উপর ভিত্তি করে এই প্রতিষ্ঠানসমূহের শিক্ষা ব্যবস্থা চলছে। ফলে দেশের ইতিহাস- ঐতিহ্য বা বর্তমান আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক কোন বিষয়ের সাথে যেমন এই শিক্ষাক্রমের সাজুজ্য নেই ঠিক তেমনিভাবে আন্তর্জাতিক কোন ঘটনাপ্রবাহের সাথেও ন্যূনতম সংযোগ নেই। এই ধরনের সম্পূর্ণ এক ঘরে শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে একটি সমাজের বিশাল এক জনগোষ্ঠী নিয়ত পিছিয়ে পড়ছে এবং বর্তমান বিবর্তিত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলের সাথে সংযোগও রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ধর্মভিত্তিক শিক্ষার অবকাঠামোর স্বকীয়তা বজায় রেখে দেশের মূল ধারার শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সংযোগ রক্ষা করতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়ের মত মৌলিক বিষয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। শুধু এই অন্তর্ভুক্তিতেই সমাধান মিলবে না; এর পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থার মান নিয়ন্ত্রণের জন্য ইন্টার্নাল ও এক্সটার্নাল কোয়ালিটি এসিওরেন্স টিম- (QAC) এর ধারণার বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। 

পড়াশোনার বাইরের একটা জগৎ আছে। কওমি মাদ্রাসাসমূহ একান্তই ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়ায় পাঠ্যক্রম বহির্ভূত শিক্ষার ক্ষেত্রেও একটা উল্লেখযোগ্য বাধা- নিষেধের ব্যাপার আছে। ধর্মীয় মৌল বিধানের সাথে সংগতি রক্ষা করেই বিভিন্ন আউটডোর ও ইনডোর গেইমস, ইসলামী সংগীত চর্চা, ক্যালিগ্রাফি চর্চা, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যুতে লেখালেখি, বক্তৃতা বা বাহাস এর মতো আয়োজনসমূহ নিয়মিত করতে পারলে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানসিক একাকিত্বের গ্রাফ ক্রমেই নিম্নমুখী হয়ে উঠবে।

দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠী কওমি মাদ্রাসা সমূহের দাতা, গ্রহীতা ও ভোক্তা। ঐতিহাসিকভাবে গড়ে ওঠা এই শিক্ষাব্যবস্থা ও কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ইকোনমি বাংলাদেশের জন্য একটি অনিবার্য বাস্তবতা। এই বাস্তবতাকে এড়িয়ে গিয়ে দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়; বরং আমাদের এই বাস্তবতাকে সদিচ্ছা, কার্যকরী ও টেকসই পদক্ষেপের সাথে মোকাবেলা করা এখন সময়ের দাবি।


লেখক: শিক্ষক, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

বিদ্যালয়ের তালা ভেঙে ল্যাপটপসহ ৫ লক্ষ টাকার জিনিসপত্র নিয়ে …
  • ২০ জুলাই ২০২৬
ফাইনালে চমক নেই স্পেনের একাদশে
  • ১৯ জুলাই ২০২৬
যে ৭ কারণে বিশ্বকাপ জিততে পারে স্পেন
  • ১৯ জুলাই ২০২৬
তিন পরিবর্তন নিয়ে মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা,দেখুন শুরুর একাদশ
  • ১৯ জুলাই ২০২৬
ফাইনালের আগে ভাইরাল স্প্যানিশ ডিফেন্ডার, গুগলেও বিশেষ চমক
  • ১৯ জুলাই ২০২৬
মাঠেই ফাইনাল দেখবেন ট্রাম্প, নিরাপত্তায় থাকছে স্নাইপার ও এফ…
  • ১৯ জুলাই ২০২৬