মাহবুব নাহিদ © টিডিসি সম্পাদিত
একটি দেশের মেরুদণ্ড হলো তার শিক্ষা ব্যবস্থা, আর সেই মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। গ্রামীণ শিক্ষার আলো ছড়াতে এবং ‘নতুন কুঁড়ি’র মতো শিশুদের সুপ্ত মেধা বিকাশে তাঁর যে দূরদর্শী দর্শন ছিল, পরবর্তীতে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাকে এক অনন্য বিপ্লবে রূপ দেন। তিনি বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের উপবৃত্তি এবং ‘ফুড ফর এডুকেশন’ বা শিক্ষার জন্য খাদ্য কর্মসূচির মতো যুগান্তকারী উদ্যোগ চালু করে প্রতিটি ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিয়েছিলেন।
আজ তাদেরই রক্ত ও ব্যক্তিত্বের যোগ্য উত্তরসূরি, জনতার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ শিক্ষা ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক এবং অভূতপূর্ব রূপান্তরের স্বর্ণযুগে পদার্পণ করেছে। পলিটিকাল প্যারাডাইম শিফটের ধারনাকে তিনি বিভিন্ন খাতের পলিসির দিকেও ঘুরিয়ে এনেছেন। গণমানুষের নেতা তারেক রহমান দেড় যুগ ধরে চিন্তা, রুপকল্প এবং ভাবনাগুলোকে দায়িত্ব পেয়েই বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। আর দেশের এগিয়ে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে ধারন করেছে শিক্ষাক্ষেত্রকে।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করে ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পর থেকেই তিনি শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রযাত্রার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
মায়ের সেই মমত্ববোধ আর বাবার সেই দেশপ্রেমকে বুকে ধারণ করে জনতার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করতে শিক্ষা বাজেটকে এক ঐতিহাসিক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। সরকার গঠনের মাত্র ৩ মাস ১৩ দিনের মাথায় ১১ জুন ২০২৬ তারিখে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার যে ঐতিহাসিক ও জনবান্ধব বাজেট পেশ করেন, সেখানে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে দেশের 'নিউক্লিয়াস' হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। বিগত স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী সরকারের রেখে যাওয়া ধ্বংসপ্রাপ্ত ও ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে শিক্ষা খাতে সামগ্রিক বরাদ্দ বাড়িয়ে এবার ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা করা হয়েছে, যা মোট জাতীয় বাজেটের প্রায় ১২.১ শতাংশ এবং জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ।
গত অর্থবছরের ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকার (জিডিপির ১.৩৯ শতাংশ) তুলনায় এই বিশাল প্রবৃদ্ধি প্রমাণ করে যে বর্তমান জনগণের সরকার কেবল ফাঁকা বুলি বা প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাসী নয়। বাজেটের এই মহতী বরাদ্দের সুনির্দিষ্ট রূপরেখায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪৬,৭৩৮ কোটি টাকা (৩২% প্রবৃদ্ধি), মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের জন্য ৫৭,৩০১ কোটি টাকা (২০.৫% প্রবৃদ্ধি) এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য ১৮,৪৫৭ কোটি টাকা (৪৫.৬% প্রবৃদ্ধি) বরাদ্দ করা হয়েছে। যদিও রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা হওয়ায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি পূরণে ঋণনির্ভর অর্থায়নের কিছু ঝুঁকি নিয়ে অর্থনীতিবিদরা কথা বলছেন, তবুও মানবসম্পদ উন্নয়নে এই সাহসিকতা এক অনন্য রাষ্ট্রনায়কোচিত পদক্ষেপ।
ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র দুই দিনের মাথায়, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে ঐতিহাসিক ‘১২ দফা নীতিগত সংস্কার এজেন্ডা’ ঘোষণা করে, তা মূলত দেশনায়কের নির্বাচনী ইশতেহারেরই এক সুদূরপ্রসারী ও বাস্তবমুখী রূপ। এই সংস্কার পরিকল্পনায় সার্টিফিকেট-নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে সক্ষমতা-ভিত্তিক পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা হচ্ছে, যার জন্য এনসিটিবি-কে ‘লার্নিং ট্রাজেক্টরি কনসেপ্ট ম্যাপ’ ও ‘আইটেম ব্যাংক’ প্রণয়নের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি ধারার মধ্যে ন্যূনতম শিখন মানদণ্ড নির্ধারণ এবং বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের (বিটিইবি) সাথে সমন্বয়ে 'স্কিল ক্রেডিট' ও 'ব্রিজ কোর্স' চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই সুবিশাল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সরকার তিন ধাপের সময়রেখা নির্ধারণ করেছে— প্রথম ধাপে বাজেট বিশ্লেষণ ও পাইলট প্রকল্প, দ্বিতীয় ধাপে জাতীয় শিক্ষা রোডম্যাপ ঘোষণা এবং তৃতীয় ধাপে পরীক্ষা সংস্কার ও গবেষণা সহায়তা কার্যক্রম। যদিও গণসাক্ষরতা অভিযান এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদের মতো শিক্ষাবিদেরা এই ১২ দফাকে আরও সুসংহত করতে একটি সমন্বিত শিক্ষা আইন প্রণয়ন এবং বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের তাগিদ দিয়েছেন, তবুও এই সংস্কারের সদিচ্ছা পুরো জাতিকে আলোর পথ দেখাচ্ছে।
পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকার এক অভূতপূর্ব ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। বিগত পূর্ববর্তী সরকারের বিতর্কিত ও ত্রুটিপূর্ণ অভিজ্ঞতাভিত্তিক-মূল্যায়ন কারিকুলাম নিয়ে দেশজুড়ে অভিভাবক ও শিক্ষকদের মাঝে যে তীব্র অসন্তোষ ও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা নিরসনে বর্তমান সরকার পুরোনো ২০১২ সালের কারিকুলামে ফেরত যায়। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) অধীনে প্রায় ৩২০ জন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞের নিরলস পরিশ্রমে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাথমিকের ৩৬টি ও মাধ্যমিকের ৯৭টিসহ ইংরেজি ভার্সন মিলিয়ে সর্বমোট ৬০১টি বিষয়ের প্রায় ১৩৩টি পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জনের কাজ শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি দেশের সকল শিক্ষার্থীর হাতে প্রায় ৩০ কোটি ৮৩ লাখ কপি সম্পূর্ণ নতুন ও পরিমার্জিত বই তুলে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আগামী আগস্টের প্রথম সপ্তাহেই মুদ্রণের কাজ শুরু হতে যাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় আবেগের বিষয় হলো, এই নতুন বইগুলোতে ইতিহাস বিকৃতির অন্ধকার দূর করে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন পক্ষের প্রকৃত অবদান এবং ১৯৯০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ছাত্র-জনতার গৌরবময় গণআন্দোলনের সত্য ও যাচাইকৃত ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। ১২ জুলাই ২০২৬ তারিখে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা ও প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিনের উপস্থিতিতে শিক্ষামন্ত্রী জানান, নতুন চারুটি বই যুক্ত হচ্ছে— চতুর্থ শ্রেণির জন্য পৃথক 'খেলাধুলা' ও 'সংস্কৃতি' বই, এবং ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য 'লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস' ও কারিগরি-বৃত্তিমূলক শিক্ষা (টিভিই) বিষয়ক একটি উদ্দীপনামূলক বই। খেলাধুলা বইটিতে ফুটবল, ক্রিকেট, দাবা, ব্যাডমিন্টন, কারাতে, ভলিবল, অ্যাথলেটিক্স ও সাঁতারের মতো সাতটি খেলার মৌলিক ধারণা থাকবে, যা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটাবে। একই সাথে ২০২৮ শিক্ষাবর্ষে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও যুগোপযোগী কারিকুলাম প্রবর্তনের লক্ষ্যে গঠিত হয়েছে 'জাতীয় কারিকুলাম কোঅর্ডিনেশন (এনসিসি) কমিটি'।
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের অবহেলিত কন্যাশিশুদের জন্য যে বিনামূল্যে শিক্ষার ও উপবৃত্তির দ্বার উন্মোচন করেছিলেন, আজ তারেক রহমান সেই মাতৃত্বসুলভ স্নেহের পরিধিকে আরও বিস্তৃত করেছেন। তিনি দেশের মেয়েদের জন্য অনার্স বা ডিগ্রি পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষার ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছেন। ভালো ফলাফলের ভিত্তিতে ভালো শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে চালু হওয়া 'ফ্যামিলি কার্ড' কর্মসূচির সাথে সম্পূরক হিসেবে কাজ করবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য চলতি অর্থবছরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ লাখ শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে স্কুল ইউনিফর্ম দেওয়া হচ্ছে, যা ধীরে ধীরে জুতা ও ব্যাগসহ সারাদেশে সম্প্রসারিত হবে।
শিশু অপুষ্টি দূরীকরণে দেশজুড়ে মিড-ডে মিল কর্মসূচি ধাপে ধাপে চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়ায় শিক্ষার বৈষম্য দূর করতে 'ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব' কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি শিক্ষককে ট্যাবলেট ডিভাইস দেওয়া হচ্ছে এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে আরও ২০ হাজারসহ মোট ৪৫ হাজার মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপনের কাজ চলছে। সামাজিক ও ভৌগোলিক বৈষম্য চিহ্নিত করে লক্ষ্যভিত্তিক টেকসই উন্নয়নের জন্য ৫০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জিআইএস (GIS) ম্যাপিং করা হচ্ছে। ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, কারিগরি, মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষার অভিন্ন বিষয়গুলোতে এখন থেকে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হবে।
ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও এক নতুন প্রাণের স্পন্দন এনেছেন ক্রীড়াবান্ধব প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শহীদ জিয়ার 'নতুন কুঁড়ি' প্রতিযোগিতার সেই চিরচেনা রূপকে ফিরিয়ে এনে দেশব্যাপী প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে 'প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬' এ বছর দেশের ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বালক ও বালিকা বিভাগের প্রায় ২২ লাখ শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে, যা দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে এক অনন্য রেকর্ড। ২০ জুন ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত জাতীয় পর্যায়ের ফাইনালে বালক বিভাগে বরিশালের বাকেরগঞ্জ এবং বালিকা বিভাগে পাবনার সাঁথিয়া চ্যাম্পিয়ন হয় এবং বিজয়ী শিশুদের বুকে জড়িয়ে ধরে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, আগামী বছর থেকে একটি স্বতন্ত্র 'প্রাইম মিনিস্টার কাপ' ফুটবল টুর্নামেন্ট চালু করা হবে।
সমান্তরালভাবে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) উদ্যোগে 'প্রাইম মিনিস্টার্স গোল্ডকাপ জাতীয় ফুটবল প্রতিযোগিতা'র উদ্বোধন করেছেন শিক্ষামন্ত্রী, যার লোগো, রিলস ও থিম সং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আহ্বান করা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্ক ও উদ্ভাবনী চিন্তা বিকাশে ঢাকা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে 'স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন আইডিয়া সোকেসিং প্রতিযোগিতার আয়োজন এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে 'ইনোভেশন কর্নার' কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। এই আইডিয়াকে বাস্তবায়নের পথে সারথী ছিলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান।
কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা খাতকে দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলছেন প্রধানমন্ত্রী। অর্থমন্ত্রী বাজেটে ঘোষণা করেছেন 'সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা', যার অধীনে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পর্যায়ক্রমে সব শিক্ষার্থীর জন্য কৃষি, আইসিটি, বিদ্যুৎ, ইলেকট্রনিক্স, গ্রাফিক ডিজাইন, পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা ও নির্মাণের মতো কর্মবাজার-উপযোগী অন্তত একটি প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। প্রতিটি উপজেলায় কারিগরি স্কুল-কলেজ এবং প্রতিটি জেলায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে ২,৩৩৬টি কারিগরি প্রতিষ্ঠান এবং ৮,২৩২টি মাদ্রাসায় বিনামূল্যে উচ্চগতির ওয়াই-ফাই ও স্মার্ট ক্লাসরুম চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা ও পাইথন প্রোগ্রামিংয়ের মতো আধুনিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। তবে মাদ্রাসা শিক্ষা খাতে পূর্ববর্তী সরকারের আমলের অমীমাংসিত প্রায় ১৭ হাজার শিক্ষকের বেতন জটিলতা নিরসনে অর্থমন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছেড়েছে এবং ২০২২ সাল থেকে ঝুলে থাকা শিক্ষকদের অবসর-কল্যাণ ভাতা প্রদানের জন্য ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, যা শিক্ষকদের প্রতি এই সরকারের গভীর সম্মান ও আন্তরিকতার প্রমাণ।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের আত্মমর্যাদাশীল অবস্থান নিশ্চিত করতে এবং উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে বিদেশে যাওয়ার পথ সুগম করতে প্রধানমন্ত্রী এক ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব ঋণের ব্যবস্থা করেছেন। ২৪ মার্চ ২০২৬ তারিখে তিনি প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংককে নির্দেশ দেন, উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, চীন ও জার্মানির মতো দেশে যেতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের ব্যাংক গ্যারান্টি বা সলভেন্সি-সংক্রান্ত জটিলতা দূর করতে কোনো প্রকার গ্যারান্টর ছাড়াই সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ-সহায়তা দেওয়া হবে। এই অর্থ নগদে না দিয়ে সরাসরি টিউশন ও ভিসা প্রসেসিং ফির মাধ্যমে ব্যাংকে পরিশোধ করা হবে।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে আমাদের শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তুলতে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি চীনা, জাপানি, কোরিয়ান, ম্যান্ডারিন, আরবি, ফরাসি বা জার্মানের মধ্যে একটি তৃতীয় ভাষা শিক্ষাকেও ২০২৮ সালের নতুন কারিকুলামে বাধ্যতামূলক করার দূরদর্শী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা এই শিক্ষার্থীরা ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন। এছাড়াও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আয়কর অব্যাহতি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে আঞ্চলিক শাখায় পুনর্গঠন এবং স্কাউটস, গার্লস গাইড ও দেশজুড়ে ২৪ হাজার নতুন বিএনসিসি ইউনিট গঠনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা ও নেতৃত্বগুণ বিকাশের কাজ চলছে।
শিক্ষার এই সুবিশাল ও উচ্চাভিলাষী কর্মযজ্ঞের সফল বাস্তবায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সরকারি ব্যয় পর্যালোচনার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার প্রশ্ন কিংবা প্রশিক্ষিত শিক্ষকের সংকট এবং গ্রামীণ গবেষণাগারের অভাবের মতো কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের কথা বিশ্লেষকেরা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। খোদ দলীয় ফোরামেও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আমলাতান্ত্রিক দায়িত্বহীনতার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। গত দেড় দশকে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পরিকল্পিতভাবে শিক্ষাব্যবস্থার যে ক্ষতি সাধন করে গেছে, তা কাটিয়ে উঠতে ইউনিসেফ ও গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশনের সহযোগিতায় ২০২৬ সালের জুনে ঢাকায় অনুষ্ঠিত 'বাংলাদেশ এডুকেশন সেক্টর অ্যানালাইসিস (ইএসএ) ২০২৬' কর্মশালার মাধ্যমে একটি মজবুত নীতিনির্ধারণী কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দেশপ্রেমের মহান আদর্শ বুকে ধারণ করে এবং দেশনেত্রীর মাতৃত্বসুলভ দোয়া ও আশীর্বাদকে পাথেয় করে, জনতার নেতা তারেক রহমানের হাত ধরে বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থা আজ এক নতুন ভোরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই সুপরিকল্পিত, আধুনিক ও মানবিক শিক্ষানীতির আলোকেই গড়ে উঠবে আগামী দিনের একটি সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন ও স্বাবলম্বী প্রত্যাশিত নতুন বাংলাদেশ।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক