ইমরান হোসেন © টিডিসি সম্পাদিত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ার সময় সংবাদমূল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ‘নৈকট্য’ (Proximity) সম্পর্কে জেনেছিলাম। এর অর্থ হলো কোনো ঘটনার ভৌগোলিক বা সামাজিক নিকটতা। কোনো ঘটনা যত বেশি মানুষের নিজের এলাকা বা জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তার গুরুত্বও তত বেশি অনুভূত হয়। তাই জন্মভূমি যশোরের কোনো সংবাদ স্বাভাবিকভাবেই আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চলতি বছর যশোরে নতুন করে ৪৮ জন এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩৫ জন বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষা স্তরের শিক্ষার্থী এবং ১৩ জন বিদেশফেরত। এই তথ্য কেবল একটি জেলার স্বাস্থ্য পরিস্থিতির চিত্র নয়; বরং তরুণদের স্বাস্থ্যসচেতনতা, প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি উপলক্ষ্য।
বিশ্বজুড়ে এইচআইভি প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ করলে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিন সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। সময়মতো শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে এইচআইভি মোকাবিলায় আতঙ্ক নয়; প্রয়োজন সঠিক তথ্য, সচেতনতা, স্বেচ্ছায় পরীক্ষা এবং সময়মতো চিকিৎসা।
বাংলাদেশেও এইচআইভি প্রতিরোধে সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ ও বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। তবে জনস্বাস্থ্যের বাস্তবতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সচেতনতামূলক উদ্যোগের ধরনও সময়োপযোগী হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে তরুণদের তথ্য গ্রহণের মাধ্যম ও জীবনযাপনের ধরন বদলে যাওয়ায় স্বাস্থ্যবার্তা পৌঁছে দেওয়ার কৌশলেও নতুনত্ব আনা জরুরি।
যশোরের সাম্প্রতিক তথ্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র নয়; এটি এমন একটি পরিবেশ, যেখানে তরুণেরা দায়িত্ববোধ, মূল্যবোধ ও জীবনদক্ষতা অর্জন করে। ফলে স্বাস্থ্যসচেতনতা শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের একটি অপরিহার্য উপাদান।
দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও কল্যাণে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পরিবর্তিত বাস্তবতায় এসব উদ্যোগের পরিসর আরও সমৃদ্ধ করা যেতে পারে। নিয়মিত স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক আলোচনা, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে সেমিনার, নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ এবং প্রয়োজনে উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংযোগ শিক্ষার্থীদের জন্য আরও সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
এ ধরনের উদ্যোগ সফল করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন, পরিবার, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ভালো চর্চা বিনিময়, শিক্ষার্থীদের কল্যাণমূলক উদ্যোগকে উৎসাহ প্রদান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষেত্র তৈরি করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
আমি মিলেনিয়াল প্রজন্মের একজন। আমাদের শৈশবে বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) এইডসবিষয়ক জনসচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন নিয়মিত প্রচারিত হতো। বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে, মানুষের তথ্য গ্রহণের প্রধান মাধ্যমও বদলে গেছে। তাই টেলিভিশনের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটিভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে। বিশ্বব্যাপী ২০১০ সালের পর নতুন এইচআইভি সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আন্তর্জাতিক এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশেও সচেতনতা, পরীক্ষা ও চিকিৎসা কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি বৈষম্য বা সামাজিক কলঙ্ক কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ভয় বা গোপনীয়তার সংস্কৃতি সমস্যার সমাধান করে না; বরং সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। অন্যদিকে সহমর্মিতা, গোপনীয়তা রক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক সচেতনতা ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়ের জন্যই নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
যশোরের সাম্প্রতিক তথ্য আতঙ্কের নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। এই সংকেতকে গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন, ইউজিসি, গণমাধ্যম, পরিবার এবং নাগরিক সমাজ যদি নিজ নিজ দায়িত্বের জায়গা থেকে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে এইচআইভি প্রতিরোধে আরও কার্যকর অগ্রগতি সম্ভব। জনস্বাস্থ্যের অভিজ্ঞতা বলে, প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো—সঠিক তথ্য, সময়োপযোগী সচেতনতা এবং সামাজিক সহমর্মিতা।
লেখক: সিনিয়র সহকারী পরিচালক, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)