সেন্টমার্টিনে ৩০০ হোটেল-রিসোর্ট, একটিরও নেই ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র

টিডিসি সম্পাদিত

টিডিসি সম্পাদিত © টিডিসি

নীল জলরাশি, প্রবাল আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে প্রতিবছরই সেন্টমার্টিনে ছুটে আসেন হাজারো পর্যটক। পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে দ্বীপের হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজগুলোও প্রস্তুত হচ্ছে অতিথিদের বরণে। নতুন করে সাজানো হচ্ছে আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে পর্যটকদের স্বাগত জানাতে যত প্রস্তুতিই থাকুক, তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। কারণ, দ্বীপের তিন শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁর একটিরও ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র নেই। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে নেই পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামও। এমনকি আগুন নিয়ন্ত্রণে দ্বীপে নেই ফায়ার সার্ভিসের কোনো স্টেশন।

অতীতে একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি। কাঠ, বাঁশ ও ছনের মতো দাহ্য উপকরণে তৈরি স্থাপনায় আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে পর্যটন মৌসুমে দ্বীপে আসা পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি সেন্টমার্টিনের পশ্চিম সৈকতের গলাচিপা এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যায় সাইরী, বিচ ভ্যালি ও কিংশুক নামের তিনটি রিসোর্টের ২৬টি কক্ষ। কাঠ, বাঁশ ও ছনে তৈরি রিসোর্টগুলো মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫-৬ কোটি টাকা।

আগুনে পুড়ে যাওয়া তিনটি রিসোর্টের মধ্যে কয়েকটি আবার নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে। পর্যটকদের বরণে প্রস্তুত সেগুলো। তবে নতুন করে গড়ে ওঠা স্থাপনাগুলোতেও অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। নেই ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র, অনেক ক্ষেত্রেই নেই পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম।

বিচ ভ্যালি রিসোর্টের ব্যবস্থাপক মো. রাফিউল আলম বলেন, কোনো স্থাপনা আগুনে পুড়ে গেলে তা শুধু মালিকের জন্য নয়, সবার জন্যই কষ্টের। একই সময়ে তিনটি রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তাদের উদ্বিগ্ন করেছে।

রাফিউল আলম বলেন, সামর্থ্য অনুযায়ী তারা অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগও জরুরি। পর্যটন এলাকায় একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন এখন সময়ের দাবি। এ বিষয়ে আগেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, রিসোর্টের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জায় কাঠ ও বাঁশের মতো দাহ্য উপকরণ ব্যবহার করা হয়। সমুদ্র কাছাকাছি হলেও এসব শুকনো উপকরণে আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি দ্বীপে জরুরি ভিত্তিতে ফায়ার সার্ভিসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বিচ ভ্যালি রিসোর্টের পাশেই দক্ষিণ হাওয়া রিসোর্ট। এ রিসোর্টের ১০টি কক্ষের স্থাপনা তৈরি হয়েছে কাঠ, বাঁশ ও ছন দিয়ে। রিসোর্টটির ব্যবস্থাপক মাকসুদ বলেন, তাঁদের রিসোর্টের অধিকাংশ স্থাপনাই কাঠ ও বাঁশের তৈরি। এ কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ও কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম থাকা জরুরি। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম যথাযথভাবে স্থাপন ও সচল রাখা গেলে আগুনের প্রাথমিক পর্যায়েই তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

দ্বীপের অধিকাংশ আবাসন প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থার চিত্র অবশ্য আরও উদ্বেগজনক। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, তিন শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁর কোনোটি অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র নেয়নি। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, ফায়ার অ্যালার্ম, হোস পাইপ কিংবা জরুরি নির্গমনপথ নেই।

কোরাল মুন বিচ রিসোর্টের কেয়ারটেকার মো. আতাউর বলেন, তাদের রিসোর্টে আগুন নেভানোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। আগুন লাগলে পানি ব্যবহার করেই তা নেভানোর চেষ্টা করতে হয়। কিন্তু এভাবে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। শুধু তাদের রিসোর্ট নয়, পর্যটন এলাকার অধিকাংশ রিসোর্টেই অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও কার্যকর ব্যবস্থা নেই। তাই প্রতিটি রিসোর্টে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিশ্চিত করার পাশাপাশি দ্বীপে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন করা জরুরি।

সেন্টমার্টিন বাজারসংলগ্ন তারকা হোটেল ব্লু মেরিনে রয়েছে ৪১টি কক্ষ। হোটেলটিতে ফায়ার অ্যালার্ম,ল এ, বি ও সি শ্রেণির অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র এবং পানির হোস পাইপ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মীরা। তবে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রগুলোর মেয়াদ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

হোটেলটির কর্মী মোহাম্মদ রবি হোসেন বলেন, কর্মীদের অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ে সচেতন ও দক্ষ করতে প্রতি মাসে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। হোটেলে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ও হোস পাইপের পাশাপাশি ওপরের অংশে দুটি হোস পাইপ স্থাপন করা হয়েছে। অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সেগুলো কক্সবাজারে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অবশ্য কিছু রিসোর্টে নিজস্ব উদ্যোগে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। লুইপাজ রিসোর্টের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মিঠু মিয়া বলেন, তাঁদের রিসোর্টে মোট নয়টি কক্ষ রয়েছে। সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি হওয়ায় এটি প্রচলিত ভবন নির্মাণপদ্ধতিতে নয়, ইউপি সিস্টেমে নির্মাণ করা হয়েছে।

মিঠু মিয়ার ভাষ্য, অগ্নিনিরাপত্তার জন্য তাঁদের রিসোর্টে ফায়ার এক্সটিংগুইশার, ফায়ার বাকেট, বালতি, বালু ও পানির ব্যবস্থা রয়েছে। শুরু থেকেই এসব সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে তাঁর মতে, সেন্টমার্টিনের অধিকাংশ রিসোর্ট ইকো-ট্যুরিজমের আদলে কাঠসহ বিভিন্ন দাহ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি। তাই পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তায় দ্বীপে একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন অত্যন্ত জরুরি।

ফায়ার সার্ভিস স্টেশন চান স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও
গত ১৭ অক্টোবর ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১১ পর্যটকের মৃত্যুর পর সেন্টমার্টিনের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, পর্যটক ও বাসিন্দাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্বীপে দ্রুত ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন করা প্রয়োজন। অন্তত পর্যটন মৌসুমে প্রশিক্ষিত কর্মী ও প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম মোতায়েন করা উচিত।

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, দ্বীপের হোটেল, রিসোর্টসহ বিভিন্ন আবাসিক প্রতিষ্ঠানে প্রায় ছয় হাজার মানুষের থাকার সক্ষমতা রয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এখানে একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন জরুরি।

ফয়েজুল ইসলাম আরও বলেন, কয়েক দিন আগে টেকনাফে অনুষ্ঠিত একটি সভায় তিনি বিষয়টি তুলে ধরে সেন্টমার্টিনে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের আবেদন জানিয়েছেন। দ্বীপের বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত এ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

পরিদর্শনে যাওয়ার কথা ফায়ার সার্ভিসের
প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, পর্যটকদের নিরাপত্তায় অগ্নিনিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ জন্য হোটেল-রিসোর্টের মালিক, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শাহিদুল আলম বলেন, বাসাবাড়ির মতো হোটেল ও রিসোর্টেও অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বরং হোটেল-রিসোর্টের ক্ষেত্রে বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। কারণ, সেখানে অসংখ্য পর্যটক ও অতিথির নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত।

তিনি বলেন, হোটেল ও রিসোর্টের মালিকদের প্রথম দায়িত্ব অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে শুধু অগ্নিনিরাপত্তা নয়, অন্যান্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থাও যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য মালিকপক্ষ, ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, ফায়ার সার্ভিসসহ তদারকি সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের লাইসেন্স শাখার পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম বলেন, সেন্টমার্টিনের পরিস্থিতি নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন। দ্বীপের কোনো হোটেল-রিসোর্টেরই ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র নেই। অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থাও সন্তোষজনক নয়। শিগগিরই ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একটি দল দ্বীপটি পরিদর্শনে যাবে। এরপর পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, সমুদ্রের তীব্র বাতাসে কাঠ ও বাঁশের তৈরি রিসোর্টে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ ধরনের স্থাপনায় বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেতব্যবস্থা, হোস পাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু সেন্টমার্টিনে এসব ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে।

দ্বীপে স্থানীয় বাসিন্দাদের দুই হাজারের বেশি বসতবাড়ি রয়েছে। এর পাশাপাশি গড়ে উঠেছে তিন শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও অন্যান্য আবাসিক প্রতিষ্ঠান। ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে শুধু পর্যটকেরা নন, রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে সেন্টমার্টিন পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হলেও অগ্নিনিরাপত্তার এমন দুর্বলতা বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করছে। অতীতের অগ্নিকাণ্ড থেকে শিক্ষা নিয়ে পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি ঘটতে পারে। পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে তাই শুধু হোটেল-রিসোর্ট সাজানো নয়, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এখন জরুরি।

১৩ বছর দুবাইপ্রবাসী, ৫১ লাখ টাকা হারিয়ে এখন ঢাকায় রিকশা চাল…
  • ০৩ নভেম্বর ২০২৬
‘সংবিধান সংশোধন ও সংস্কার এক বিষয় নয়’ মতবিনিময় সভা বর্জনের …
  • ০৩ নভেম্বর ২০২৬
পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে ইবির ২৪ শিক্ষার্থীকে শাস্তি
  • ০৩ নভেম্বর ২০২৬
কানাডার সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকে পড়ার সুযোগ, থাকব…
  • ০৩ নভেম্বর ২০২৬
শিক্ষক-শ্রেণিকক্ষ ছাড়াই চলছে কলেজ শাখা, এইচএসসিতে পাসের হার…
  • ০৩ নভেম্বর ২০২৬
সব সরকারি কলেজের জন্য মাউশির নির্দেশনা
  • ০৩ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950