মাটির ব্যাংক

২০ কৃষক পরিবারের দুই-পাঁচ-দশ টাকার সঞ্চয়ে গড়ে উঠছে আলোর পাঠাগার

৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৭ PM , আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৮ PM
মাটির ব্যাংকে স্বপ্ন বুনছেন গ্রামের কৃষক পরিবারগুলো

মাটির ব্যাংকে স্বপ্ন বুনছেন গ্রামের কৃষক পরিবারগুলো © সংগৃহীত

সংসারের খরচ মেটানোর পর হাতে যা থাকে, তা থেকেই কেউ জমাচ্ছেন দুই, কেউ পাঁচ, কেউবা ১০ কিংবা ২০ টাকা। প্রতিদিনের এই সামান্য সঞ্চয় জমা হচ্ছে মাটির ছোট ছোট ব্যাংকে। তিন মাস পর ব্যাংক ভেঙে সেই টাকা তুলে দেওয়া হচ্ছে গ্রামের একটি পাঠাগারের উন্নয়নে। একেকটি ব্যাংকে জমছে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা। অঙ্কের হিসাবে অর্থের পরিমাণ সামান্য হলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একেকটি পরিবারের ভালোবাসা, সামাজিক দায়বদ্ধতা আর নতুন প্রজন্মকে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন।

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার সারপুকুর ইউনিয়নের টিপার বাজার এলাকার ‘সারপুকুর যুব ফোরাম পাঠাগার’ ঘিরে গড়ে উঠেছে এমনই এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। গ্রামের ২০টি কৃষক পরিবারের সদস্যরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী মাটির ব্যাংকে টাকা জমিয়ে পাঠাগারের উন্নয়নে সহযোগিতা করছেন। তাদের কারও পক্ষে হয়তো একসঙ্গে কয়েক হাজার টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু প্রতিদিনের সামান্য সঞ্চয় দিয়ে তারা প্রমাণ করছেন, একটি ভালো উদ্যোগের পাশে দাঁড়াতে বিত্তবান হওয়ার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন সদিচ্ছা, আন্তরিকতা ও সম্মিলিত অংশগ্রহণ। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগে এখন পর্যন্ত জমা হয়েছে ৩৯ হাজার ৩০০ টাকা।

এই উদ্যোগের বিশেষত্ব শুধু অর্থ সংগ্রহে নয়, বরং একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতায়। পাঠাগারটি যেন কেবল প্রতিষ্ঠাতার কিংবা কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষীর উদ্যোগ হয়ে না থাকে, বরং গ্রামের প্রতিটি পরিবারের অংশগ্রহণে একটি সামাজিক সম্পদে পরিণত হয়, সেই ভাবনা থেকেই মাটির ব্যাংকে সঞ্চয়ের এই কর্মসূচি।

১০ বই থেকে ১৮ হাজারের সংগ্রহ
সারপুকুর যুব ফোরাম পাঠাগারের যাত্রা শুরু ২০১৪ সালে। স্থানীয় কলেজশিক্ষার্থী জামাল হোসেনের উদ্যোগে মাত্র ১০টি বই নিয়ে একটি ছোট, জীর্ণ টিনশেড ঘরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পাঠাগারটি। শুরুতে সীমিত পরিসরের এই উদ্যোগ একদিন গ্রামের শিশু-কিশোর ও তরুণদের জ্ঞানচর্চা এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের কেন্দ্র হয়ে উঠবে, তা হয়তো তখন কল্পনাও করেননি কেউ।

পাঠাগার

তবে স্বপ্নের প্রতি অবিচল ছিলেন উদ্যোক্তা জামাল হোসেন। স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা, বিভিন্ন শুভাকাঙ্ক্ষীর পৃষ্ঠপোষকতা এবং সময়ের সঙ্গে পাঠকের আগ্রহ বাড়তে থাকায় ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হয়েছে পাঠাগারটি। বর্তমানে এখানে বইয়ের সংখ্যা ১৮ হাজারের বেশি। গড়ে উঠেছে নিজস্ব ভবনও। ভবনটির দ্বিতীয় তলার ভিত্তি থাকলেও আপাতত একতলার নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।

২০২৪ ও ২০২৫ সালে ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩০ লাখ টাকার বেশি। এর প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থ সহায়তা এসেছে ঢাকার রবিন প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজ লিমিটেডের পরিচালক শাহীন হোসেন এবং মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের অষ্টম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। বাকি অর্থের জোগান দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসী।

পাঠাগার এখন বইয়ের বাইরেও
সারপুকুরের এই পাঠাগার এখন আর শুধু বই পড়ার জায়গা নয়। এটি গ্রামের শিশু-কিশোর ও তরুণদের সৃজনশীলতা বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। বই পড়ার পাশাপাশি এখানে রয়েছে কম্পিউটার ব্যবহার ও ল্যাবের সুবিধা। বাংলা ও আধুনিক বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে বইয়ের জগতে প্রবেশের পাশাপাশি সংগীত ও সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ পাচ্ছে গ্রামের নতুন প্রজন্ম।

শহরের শিশু-কিশোরেরা যেসব সুযোগ তুলনামূলক সহজে পায়, প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলেমেয়েরাও যেন সেসব সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, পাঠাগারটির কার্যক্রমে রয়েছে সেই প্রত্যাশা। বই পড়া, কম্পিউটার ব্যবহার, বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখা কিংবা সংগীতচর্চা—সব মিলিয়ে পাঠাগারটি হয়ে উঠেছে একটি বহুমাত্রিক শিক্ষাসংস্কৃতি কেন্দ্র।

স্থানীয় বাসিন্দা মেরিনা বেগম মনে করেন, পাঠাগারে বই পড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করার সামর্থ্য তাঁর নেই। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী সঞ্চয় করে মাটির ব্যাংকে টাকা জমাচ্ছেন তিনিও। তাঁর কাছে এই উদ্যোগের অংশ হতে পারাটাই আনন্দের।

মাটির ব্যাংকে স্বপ্ন বুনছেন গ্রামের কৃষক পরিবারগুলো

একই অভিজ্ঞতা দীপিকা রানীর পরিবারেরও। সংসারের প্রয়োজন মেটানোর পর যা কিছু অবশিষ্ট থাকে, তা-ই জমা করেন মাটির ব্যাংকে। স্থানীয় বাসিন্দা সাজেদা বেগমও নিয়মিত টাকা জমাচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, পাঠাগার প্রতিষ্ঠার পর গ্রামে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছে। তরুণ-তরুণীরা সংগীতচর্চার সুযোগ পাচ্ছে। তিন মাস পর ব্যাংক ভেঙে যখন ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পাওয়া যায়, তখন সেই অর্থ পাঠাগারের কাজে লাগবে ভেবেই ভালো লাগে।

শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য অভিভাবকদের সঞ্চয়
মাটির ব্যাংকে সঞ্চয়ের এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন শুধু প্রবীণ কিংবা মধ্যবয়সী মানুষ নন, শিশু-কিশোরদের অভিভাবকেরাও। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নিমাই চন্দ্র রায়ের মা নিয়মিত ব্যাংকে টাকা জমিয়ে রাখেন। তিন মাস পর সেটি পাঠাগারে নিয়ে আসা হয়। নিমাই নিজেও নিয়মিত পাঠাগারে যায়। সেখানে বই পড়ে, বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখে এবং সংগীতচর্চায় অংশ নেয়।

নিমাইয়ের মতো গ্রামের অনেক শিশুর কাছেই পাঠাগারটি এখন নতুন কিছু শেখার জায়গা। এখানে তারা পাঠ্যবইয়ের বাইরের জগৎ সম্পর্কে জানতে পারছে, অবসর সময়কে সৃজনশীল কাজে ব্যয় করতে শিখছে। অভিভাবকেরা তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে অর্থ দিচ্ছেন না, পরোক্ষভাবে নিজেদের সন্তানদের জন্যও তৈরি করছেন একটি সম্ভাবনাময় পরিবেশ।

সামান্য সঞ্চয়ে বড় স্বপ্ন
পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা জামাল হোসেনের কাছে গ্রামের মানুষের এই অংশগ্রহণ বিশেষ অনুপ্রেরণার। তিনি প্রত্যেক কৃষক পরিবারকে একটি করে মাটির ব্যাংক দিয়েছেন। বর্তমানে ২০টি পরিবার এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত নয় মাসে এসব ব্যাংক থেকে মোট ৩৯ হাজার ৩০০ টাকা জমা হয়েছে। পাঠাগারের দ্বিতীয় তলার নির্মাণকাজ শুরু না হওয়া পর্যন্ত পরিবারগুলো এভাবে সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। দ্রুতই ভবনের দ্বিতীয় তলার কাজ শুরু করতে চান তাঁরা।

উদ্যোগটির সঙ্গে যুক্ত শুভাকাঙ্ক্ষী শাহীন হোসেনের কাছেও গ্রামের সাধারণ মানুষের এই মমত্ববোধ পাঠাগারের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের বড় অনুপ্রেরণা। কারণ, একটি পাঠাগার নির্মাণে অর্থের প্রয়োজন হলেও সেটিকে সচল ও প্রাণবন্ত রাখার জন্য প্রয়োজন মানুষের সম্পৃক্ততা। আর সেই সম্পৃক্ততাই তৈরি হচ্ছে মাটির ব্যাংকে জমা হওয়া সামান্য সামান্য সঞ্চয়ের মধ্য দিয়ে।

সারপুকুরের এই উদ্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমাজ পরিবর্তনের জন্য সব সময় বড় কোনো আয়োজন কিংবা বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো দুই টাকার একটি সঞ্চয়ও হয়ে উঠতে পারে বড় সামাজিক পরিবর্তনের অংশ। একটি পরিবারের সামান্য সহযোগিতা যখন আরেকটি পরিবারের সহযোগিতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখনই তৈরি হয় সম্মিলিত শক্তি।

সারপুকুরের মাটির ব্যাংকগুলোতে তাই শুধু টাকা জমছে না; জমছে মানুষের আস্থা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু করার প্রত্যয়। প্রতিটি ব্যাংকের ভেতর যেন লুকিয়ে আছে একটি করে স্বপ্ন—গ্রামের শিশুরা বই পড়বে, জ্ঞান অর্জন করবে, সংগীত ও সংস্কৃতির চর্চায় নিজেদের বিকশিত করবে। একদিন হয়তো এই ছোট্ট পাঠাগার থেকেই বেরিয়ে আসবে দেশের আলোকিত নাগরিক, সংস্কৃতিকর্মী কিংবা নতুন দিনের নেতৃত্ব।

সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সারপুকুরের সাধারণ মানুষের এই ক্ষুদ্র সঞ্চয়ই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় পুঁজি। মাটির ব্যাংকে জমছে টাকা, আর মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে আলোর এক ঠিকানা।

৫ কলেজ থেকে পরীক্ষা দিয়েছিলেন মাত্র ১৯ শিক্ষার্থী, সবাই ফেল…
  • ৩১ অক্টোবর ২০২৬
আসছে সরাসরি ১০ হাজার কনস্টেবল ও ৪০০০ এসআই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, …
  • ৩১ অক্টোবর ২০২৬
বাবাকে হারানোর পর থেমে যায় পড়ালেখা, ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস…
  • ৩১ অক্টোবর ২০২৬
ইংরেজিতে ফেল, এবার চলে গেলেন রাব্বিলও
  • ৩১ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকায় ভর্তি কোচিং করতে গিয়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার সেই রাকিবুল …
  • ৩১ অক্টোবর ২০২৬
নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেল ১১ দলীয় ঐক্যের লংমা…
  • ৩১ অক্টোবর ২০২৬