গাইবান্ধায় পাটের দাম রেকর্ড উচ্চতায়, কৃষকের মুখে হাসি © টিডিসি ফটো
দীর্ঘ এক দশকের মধ্যে ভরা মৌসুমে পাটের সর্বোচ্চ দাম পেয়ে উচ্ছ্বসিত গাইবান্ধার কৃষকরা। ফুলছড়ি উপজেলার হাটগুলোতে চলতি সপ্তাহে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত ১০ বছরের কোনো ভরা মৌসুমে দেখা যায়নি।
ফুলছড়ি হাটে গেলে চোখে পড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ—নৌকা থেকে শুরু করে হাটের প্রতিটি প্রান্তে চলছে পাটের বেচাকেনা। চরাঞ্চলের কৃষকরা ভোরবেলা পাট বোঝাই নৌকা নিয়ে আসছেন হাটে; মুখে তাদের হাসির ঝিলিক, মনে দীর্ঘদিনের পাওয়ার স্বস্তি।
শুধু দামই বাড়েনি, বেড়েছে পাটের আবাদও। গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছর জেলায় ১৩ হাজার ৯৮৭ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ১৭০ হেক্টর বেশি। তবে সামগ্রিক চিত্র উদ্বেগজনক। ২০২২ সালে জেলায় পাটের আবাদ ছিল ১৬ হাজার ৪৬০ হেক্টর। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৫০০ হেক্টরে। ২০২৪ সালে আরও কমে ১৩ হাজার ৭৯০ হেক্টরে নেমে আসে। চলতি বছর আবাদ কিছুটা বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি কৃষি বিভাগ।
পাট চাষীরা জানান, বন্যা ও খরাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে ঋণ করে পাট চাষ করতে হয় তাদের। আর সেই কষ্টের ফসলের দাম নির্ধারণ করে দেয় পাটকল মালিক ও ফরিয়া-ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট। ফলে বছরের পর বছর পাট চাষে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। অনেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন এই ফসল চাষে। তাদের অভিযোগ, আগেও পাটের দাম বাড়লেও সেই দাম কখনো তাদের ভাগ্যে জোটেনি। মিল মালিকরা ভরা মৌসুমে কম দামে পাট কিনে নিয়ে কৃষকদের বাধ্য করে অর্ধেক দামে পাট বিক্রি করতে। আর সেই পাটই কয়েক সপ্তাহ পর হাটে দ্বিগুণ দামে বিক্রি হতো।
তবে বর্তমান বাজারের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। স্টোকার বা মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এবার পাটকল মালিক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের টপকে পাট কিনছেন। তারা মণপ্রতি ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দাম দিয়ে কৃষকের কাছ থেকে পাট সংগ্রহ করছেন। হাটের ব্যবসায়ীরা জানান, মিলাররা এই দামে পাট কিনতে রাজি না হওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও পাট কিনতে পারছেন না। অন্যদিকে স্টোকাররা ভালো মানের পাটের জন্য মণপ্রতি ৪ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত দাম দিতে রাজি হচ্ছেন। এই প্রতিযোগিতাই দাম বাড়ার মূল কারণ বলে মনে করছেন অনেকে।
জামালপুরের ঘুটাইল বাজার থেকে আসা পাইকারি ক্রেতা খোরশেদ আলম বলেন, বর্তমান হাটে সবচেয়ে ভালো মানের পাট ৪ হাজার ৫০ থেকে ১০০ টাকায়, মাঝারি মানের ৩ হাজার ৯০০ থেকে ৪ হাজার টাকায় এবং নিম্নমানের পাট ৩ হাজার ৮০০ টাকায় কিনছেন তিনি। এ বছর পাটের দাম সন্তোষজনক বলে মন্তব্য করেন এই ব্যবসায়ী।
তবে এই দাম কতদিন থাকবে—এ নিয়ে শঙ্কা রয়েছে কৃষকদের মনে। ফুলছড়ির কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের উত্তর রসূলপুরের কৃষক ফারুক হোসেন বলেন, এই অঞ্চলের শতকরা ৯০ ভাগ কৃষকের ঘর থেকে পাট শেষ হয়ে গেলে আবারও ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম ঠিক করে দেবেন। তখন আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তারা। তাই বর্তমান বাজার ধরে রাখতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন কৃষকরা। পাশাপাশি বছরজুড়ে পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে ক্রয়-বিক্রয়ে সরকারি নজরদারির দাবি জানিয়েছেন তারা।
খোলাবাড়ির কৃষক জাহাঙ্গীর আলম সরকার বলেন, পাটকে কেন্দ্র করেই চাষিদের সংসারের সব হিসাব-নিকাশ। ভরা মৌসুমে পাট বিক্রি করে তারা সংসারের খরচ, ঋণ পরিশোধ ও অন্যান্য কাজ করেন। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে এ বছরের মতো সব সময়ই পাট ক্রয়-বিক্রয়ে সরকারের নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
গাইবান্ধার উন্নয়ন সংগঠকেরা বলছেন, কৃষিনির্ভর এই জেলার অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে আগে কৃষকদের বাঁচাতে হবে। তারা হাটে-হাটে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র খোলার মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পাট কেনার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের খপ্পর থেকে কৃষকরা রক্ষা পাবেন। পাশাপাশি সরকারি পাটকলগুলো চালু এবং পাটজাত পণ্যের বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন তারা। অন্যথায় সোনালি আঁশ নামে খ্যাত এই ফসল চাষে কৃষকদের আগ্রহ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক আসাদুজ্জামান বলেন, পাটের আবাদ বাড়াতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এ বছর দুই হাজার বিঘা জমির জন্য দুই হাজার ১০০ কৃষককে বীজ ও সার সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ভালো উৎপাদনে পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে। তবে পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সব বিভাগকে একযোগে কাজ করতে হবে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।