মাইলস্টোন ট্রাজেডি
দুর্ঘটনায় আহত শিক্ষার্থী © সংগৃহীত
‘এখনো স্কুলে গেলে প্লেন দেখলে ভয় লাগে। রাতে ঘুম হয় না। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে দেখি কেউ মনে হয় আমাকে আগুনে ফেলে দিচ্ছে’, কথাগুলো বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মাইলস্টোনের বিমান দুর্ঘটনায় আহত ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র নুরে জান্নাত ইউশা।
গত বছর ২১শে জুলাই ওই স্কুলে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় গুরুত্বর আহত হয়ে ঢাকার জাতীয় বার্ন ইন্সটিটিউটে দীর্ঘদিন ভর্তি ছিলেন ইউশা।
ওই দুর্ঘটনার এক বছর পর, একই দিনে এই হাসপাতালে স্মরণ সভার আয়োজন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। যেখানে ওই দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতদের পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
আহতদের অনেকে সেই দুর্ঘটনায় তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা যেমন বলছিলেন, পরিবারগুলোও এই এক বছরের তাদের জীবনের সেই অভিজ্ঞতার কথাও জানাচ্ছিলেন।
পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী মেহেরীন বিবিসি বাংলাকে জানান, ওই দুর্ঘটনার পর সে এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। ক্ষত শরীর নিয়ে আর যাওয়া হচ্ছে না স্কুলে।
সেখানেই মাইলস্টোনের বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে সোমবার বিবিসি বাংলার বিশেষ প্রতিবেদনটির প্রসঙ্গ টানেন বক্তাদের কেউ কেউ।
মাইলস্টোনে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত স্কুল শিক্ষিকা মাহেরীন চৌধুরীর স্বামী মনসুর হেলাল বলেন, ‘আমরা দেখেছি এই ঘটনাটি নিয়ে বিবিসি একটি বিশেষ ডকুমেন্টারি করেছে- ঘটনার দায় কার? এখন পর্যন্ত কোন তদন্ত রিপোর্টও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ হয়নি। ওই রিপোর্টে কী আছে সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন চাই আমরা’।
অনুষ্ঠানে আহত নিহতদের পরিবারগুলো সরকার ঘোষিত তদন্ত কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী আহত নিহতদের পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ ও আহতদের চিকিৎসা সেবা প্রদানসহ বিভিন্ন দাবির কথা তুলে ধরেন সরকারের কাছে।
এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট জুবাইদা রহমান।
এসময় তিনি বলেন, ‘মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির ভয়াবহতা সামলে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সদস্যরা যে সাহস, দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা জাতির জন্য অনুপ্রেরণার উৎস’।
গত বছরের ২১শে জুলাই ঢাকার উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর যুদ্ধ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় স্কুলটির ২৮ শিশুসহ মারা যায় অন্তত ৩৬ জন।
এই বিমান দুর্ঘটনার পরপরই তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল। সেই কমিশন রিপোর্ট জমা দেওয়ার পরও সেটি গোপন রাখা হয়েছিল এতদিন।
মঙ্গলবার দুর্ঘটনার এক বছর পূর্তির দিনের এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত আহত নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে কয়েকজন বক্তব্য দেন। সেখানে উঠে আসে মাইলস্টোনের বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে বিবিসি বাংলার বিশেষ প্রতিবেদন প্রসঙ্গ।
মাইলস্টোনের বিমান দুর্ঘটনায় নিহত স্কুল শিক্ষক মাহেরীন চৌধুরী স্বামী মনসুর হেলাল বলেন, ‘আমরা দেখেছি গতকাল (সোমবার) বিবিসি বাংলা এই ঘটনা নিয়ে একটি বিশেষ ডকুমেন্টারি প্রকাশ করেছে। সেখানে অনেক কিছুই আমরা দেখতে পেয়েছি’।
‘এই ঘটনার দায় কার সেই বিষয়টি এসেছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সরকার তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করেনি। এই তদন্ত রিপোর্ট সরকারিভাবে প্রকাশ হওয়া উচিত। এটি নিয়ে আরো গভীর তদন্ত হওয়া দরকার’, যোগ করেন তিনি।
তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বিবিসি বাংলার বিশেষ প্রতিবেদনে মাইলস্টোন বিমান দুর্ঘটনায় মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের বিল্ডিং কোড না মানা, অনুমোদনহীন ভবনে ক্লাস করাসহ বিভিন্ন বিষয়গুলো উঠে এসেছিল।
সেই প্রসঙ্গ টেনে মি. হেলাল তার বক্তব্যে বলেন, ‘স্কুলের যে বিল্ডিংটাতে এই এক্সিডেন্টটা হয়েছে সেটায় মাত্র একটা দরজা ছিল। সেখানে ৮০০/৯০০ শিক্ষার্থীর জন্য একটা মাত্র দরজা কিভাবে থাকে। ওইদিন যদি আরো কয়েকটা দরজা থাকতো, তাহলে আরো কিছু প্রাণ আমরা বাঁচাতে পারতাম’।
তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বিবিসি বাংলার বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় উচ্চতার সীমা লঙ্ঘন করে ৬৩০টি স্কুল, কলেজ, হাসপাতালসহ উচ্চ ভবন গড়ে উঠেছে।
ওই প্রসঙ্গ টেনে মি. হেলাল বলেন, ‘ভবিষ্যতে এই স্কুলের ওপর যে আরেকটা বিমান পড়বে না এই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। কারণ স্কুলটার অবস্থান আর এয়ারপোর্টের অবস্থান প্রায় একই। এটি আসলেই একটা বিভীষিকাময় অবস্থা। প্রতিদিন প্রায় আড়াই তিন হাজার স্টুডেন্ট ওই স্কুলটাতে যায়’।
‘আমার একটা আবেদন থাকবে রাষ্ট্রের কাছে, সরকারের কাছে যাতে তারা যথাযথভাবে এই জিনিসটাকে আমলে নিয়ে তারা একটা আশু সমাধান করে। ভবিষ্যতে যেন বার্ন ইউনিটে যেন আর কোন পোড়া রোগী আসতে না হয়’, যোগ করেন তিনি।
‘দুই ঘণ্টা পড়েও একটা লাইন মুখস্থ করতে পারি না’
মাইলস্টোনের বিমান দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে ৫৭ জনকে ভর্তি করা হয়েছিল ঢাকার জাতীয় বার্ন ইন্সটিটিউটে। সেখানে থেকে অনেকে কিছুটা সুস্থ হয়ে ফিরলেও, তাদের বেশিরভাগই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি এখনো।
হাসপাতালের আয়োজনে এই স্মরণ অনুষ্ঠানে আসা পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী মেহেরীন এসেছিল তার মায়ের সাথে। ওই ঘটনার পর শারীরিকভাবে কিছুটা সুস্থ হলেও ফিরতে পারেনি স্বাভাবিক জীবনে।
গত বছর চতুর্থ শ্রেণিতে পড়তো মেহরীন। এবার ফাইভে উঠেছে। কিন্তু আগুনের ক্ষত কাটিয়ে উঠে এখনো স্কুলে যেতে পারছে না সে।
মেহেরীন বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, ‘আগে একটা জিনিস পড়লে দুই মিনিটে মুখস্থ হয়ে যেতো। এখন একটা লাইন দুই ঘণ্টায় মুখস্থ করতে পারছি না। একটু রোদ লাগলে পুরো শরীর জ্বলে যায়। যে কারণে আর স্কুলে যাই না’।
তিনি বলেন, ‘রাতে আমি ঘুমাতে পারি না। ঘুমালে বেশিরভাগ সময় ঘুমের মধ্যে অদ্ভুত স্বপ্ন দেখি। সেই ঘটনার কথা এখনো ভুলতে পারি না’।
ষষ্ঠ শ্রেণির নুরে জান্নাত ইউশার মা ইয়াসিন আক্তার জানান, তার মেয়ে বড় হয়ে নৃত্যশিল্পী হওয়ার শখ ছিল। কিন্তু এই দুর্ঘটনার পর তার মেয়ে কোন কাজেই স্বাভাবিক হতে পারছে না।
মিজ আক্তার বলেন, ‘সারাদিন চিৎকার করে, ভয় পায় আমার মেয়েটা। হঠাৎ বলে ওঠে মা আবার মনে হয় প্লেন পড়বে। আগে পড়াশোনার প্রতি ঝোঁক ছিল। এখন আর পড়তে চায় না। বাচ্চাটাকে নিয়ে আমাদের খুব কষ্ট হচ্ছে’।
হাসপাতাল আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসেছিল আবিদ, নিলয়, দীপ্ত, মেহেরীনসহ আহতদের অনেকেই।
দুই হাতে ব্যান্ডেজ, বেশিরভাগ শিশু শিক্ষার্থীই বয়ে বেড়াচ্ছে সেই ক্ষত চিহ্ন। এমন অবস্থায় তারা এসেছিলেন এই অনুষ্ঠানে।
এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি ক্লাস সেভেনের ছাত্র নিলয়। সে জানাচ্ছিল, পুরোপুরি সুস্থ না হওয়ায় এখনো সে স্কুলে যেতে পারছে না। একটি অস্ত্রোপচার আগে পর্যন্ত সে আর স্কুলে যেতে পারছে না।
পরিবারগুলোর জন্য কী করবে সরকার?
এই অনুষ্ঠানে স্কুলটির আহত নিহতদের পরিবারের সদস্যরা যেমন ছিলেন। তেমনি স্কুলটির শিক্ষকদের কেউ কেউও উপস্থিত ছিলেন।
ওই ঘটনায় আহত নিহতদের পরিবারে পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন নিহত স্কুল ছাত্রী তাসনিয়ার বাবা নাজমুল হক।
মি. হক এসময়, আহতদের উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য বর্তমান সরকারের যথাযথ সহযোগিতা কামনা করেন। একই সাথে আহত নিহতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করা হয়েছিল সেই বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে সরকারের কাছে আহ্বানও জানান।
সেখানে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি এসময় বলেন, ‘মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনার ফলে আহতদের যদি অতিরিক্ত উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, তাহলে সেটি সরকারই প্রদান করবে’।
যদিও আহত নিহতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ নিয়ে তদন্ত কমিশন যে সুপারিশ করেছিল সেটি বর্তমান সরকার বাস্তবায়ন কবে করবে, সে বিষয়ে কোন খোলামেলা বক্তব্য আসেনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পক্ষ থেকে।
এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান।
তিনি জুবাইদা রহমান বলেন, ‘মাইলস্টোনে আহতরা ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরও তাঁরা যে সাহস ও সংকল্প নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, জাতি তা কোনো দিন ভুলবে না। এই কষ্টের মধ্যেও তাঁরা যে দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন, তার জন্য তাঁদের ধন্যবাদ জানান তিনি।