নাকুগাঁও স্থলবন্দর © সংগৃহীত
সীমান্তের ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে টানা অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও সড়ক ধসের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের অন্যতম স্থলবন্দর শেরপুরের নাকুগাঁওয়ে। প্রায় এক মাস ধরে ভারতের ডালু-তুরা মহাসড়কে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় নাকুগাঁও স্থলবন্দর দিয়ে সব ধরনের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
এতে আমদানি-রপ্তানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কাজ হারিয়েছেন বন্দরে কর্মরত শত শত লোড-আনলোড শ্রমিক। দীর্ঘদিন ধরে বন্দর অচল থাকায় সরকারের রাজস্ব আয়ও প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
নাকুগাঁও স্থলবন্দর ও আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ডালু-তুরা জাতীয় মহাসড়ক (এনএইচ-২১৭) দীর্ঘদিন ধরেই বেহাল অবস্থায় ছিল। সম্প্রতি টানা অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ ধসে পড়ে এবং অনেক স্থানে সড়ক ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যায়। এতে ডালু সীমান্ত হয়ে নাকুগাঁও স্থলবন্দরে পণ্য পরিবহন সম্পূর্ণ ব্যাহত হয় এবং সব ধরনের পণ্য আমদানি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
সূত্র আরও জানায়, পশ্চিম গারো হিলস ও দক্ষিণ গারো হিলস জেলার ডালু-মহেন্দ্রগঞ্জ-গারোবাঁধা-তুরা এবং ডালু-তুরা সড়কের একাধিক স্থানে পাহাড়ধস ও অতিবৃষ্টির কারণে সড়কের ওপর মাটি নেমে আসে। কোথাও কোথাও সড়কের বড় অংশ ভেঙে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এর ফলে পাথর, কয়লাসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী ট্রাক সড়কের বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়ে রয়েছে। একের পর এক ট্রাক দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
এ অবস্থায় গত ১০ জুলাই ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ডালু অঞ্চলের ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো জরুরি বৈঠকে বসে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কার করে ভারী যানবাহন চলাচলের উপযোগী না করা পর্যন্ত জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে সীমান্তমুখী কোনো পণ্যবাহী ট্রাক পাঠানো হবে না। এরপর থেকেই নাকুগাঁও স্থলবন্দর দিয়ে পাথর ও কয়লাসহ সব ধরনের পণ্য আমদানি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
তবে দীর্ঘ অচলাবস্থার মধ্যে মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বিশেষ ব্যবস্থায় বিকল্প সড়ক ব্যবহার করে ভুটান থেকে একটি পাথরবোঝাই ট্রাক নাকুগাঁও স্থলবন্দরে প্রবেশ করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি নিয়মিত আমদানি কার্যক্রমের অংশ নয়; বিশেষ পরিস্থিতিতে বিকল্প পথ ব্যবহার করে ট্রাকটি বন্দরে পৌঁছেছে।
ভারতের অংশে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নাকুগাঁও স্থলবন্দরনির্ভর ব্যবসায়ীরা। বন্দরে আমদানি কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, পরিবহন ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম প্রায় থমকে গেছে। একই সঙ্গে বন্দরে প্রতিদিন কাজ করা শত শত লোড-আনলোড শ্রমিকও কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। ফলে তাদের পরিবারগুলোও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থা ন্যাশনাল হাইওয়েজ অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন লিমিটেড (এনএইচআইডিসিএল) ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কারের কাজ শুরু করেছে। তবে টানা বৃষ্টির কারণে কাজের গতি ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত সংস্কারকাজ শেষ না হলে ব্যবসায়ীদের লোকসান আরও বাড়বে এবং সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হবে।
নাকুগাঁও স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বকুল বলেন, ভারতের ডালু বন্দর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ধরেন সাংমার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, নতুন করে ভারী বৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢল না হলে এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সড়ক সংস্কারের কাজ শেষ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে এক সপ্তাহের মধ্যেই পণ্য আমদানি স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
নাকুগাঁও স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ভারতের অংশে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় এক মাস ধরে খারাপ থাকায় পাথর বা কয়লাবাহী কোনো ট্রাক বন্দরে প্রবেশ করতে পারেনি। এর মধ্যে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ধসে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তবে মঙ্গলবার সকালে বিশেষ ব্যবস্থায় বিকল্প সড়ক ব্যবহার করে ভুটানের একটি পাথরবোঝাই ট্রাক বন্দরে প্রবেশ করেছে। প্রায় এক মাস ধরে বন্দরে কোনো পণ্য আমদানি না হওয়ায় রাজস্ব আয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।’