একটি করলা ক্ষেত © সংগৃহীত
মাঠভরা করলা, কিন্তু বাজারে নেই ন্যায্য দাম। এমন পরিস্থিতিতে যশোরের করলা ও উচ্ছে চাষিরা চরম লোকসানের মুখে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। উৎপাদন খরচের তুলনায় মাত্র আড়াই থেকে পাঁচ টাকা কেজি দরে করলা বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় কেউ ফলন্ত গাছ কেটে ফেলছেন, আবার কেউ বিক্রি না হওয়া সবজি রাস্তার পাশে ফেলে দিয়ে ফিরছেন।
উৎপাদন খরচের সিকিটাও উঠছে না
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বিঘা জমিতে উচ্ছে বা করলা চাষে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়। কিন্তু বর্তমান বাজারে সেই বিনিয়োগের এক-চতুর্থাংশ টাকাও ঘরে তোলা সম্ভব হচ্ছে না।
চাষি আমির আলী বলেন, ‘বিঘাপ্রতি ৩০ হাজার টাকা খরচ করে উচ্ছে লাগিয়েছিলাম। এখন বাজারে একশ, দেড়শ বা দুইশ টাকা মণ দাম দিচ্ছে। লোকসান গুণতে গুণতে আমাদের আর কোনো পুঁজি অবশিষ্ট নেই।’
আরেক কৃষক মোহাম্মদ রবিউল ইসলাম বলেন, ‘দেড় বিঘার মতো জমিতে চাষ, নিড়ানি, সেচ আর সার-মাটি দিতে ৩৫-৩৬ হাজার টাকা চলে গেছে। কিন্তু ৩৫টা পয়সাও ঘরে উঠাতে পারিনি। বাড়ি থেকে এনে যে খরচটা করেছি, সেটা একদম ‘ফি সাবিলিল্লাহ’ হয়ে গেছে। এখন গাড়ি ভাড়া আর জোন (শ্রমিক) ভাড়া দিতেই সব শেষ। সারাদিন খেটে একটু ভালো-মন্দ খাব, সেই কপালও নেই।’
তাজা গাছ কেটে ফেলছেন কৃষকরা
বাজারের এই চরম মন্দাভাব সইতে না পেরে অনেক কৃষক মাঠের ফলন্ত গাছ কেটে ফেলছেন। কৃষক শুকুর আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এক কেজি টিএসপি সার কিনতে হচ্ছে ৫০ টাকা দিয়ে। আর এক মণ উচ্ছে বিক্রি করতে হচ্ছে দেড়শ টাকায় (৩-৪ টাকা কেজি)। জোনের দাম উঠছে না, সারের দাম উঠছে না। রাগে সবজি ধরা তাজা গাছ কেটে দিয়েছি। আর সার-ওষুধও দেব না, গাছও রাখবো না। চাষির দিকে তাকানোর কেউ নেই।’
একই চিত্র দেখা গেছে কৃষক রাসেল বিশ্বাস ও কামরুজ্জামানের ক্ষেতেও। রাসেল বিশ্বাস বলেন, ‘বাজারের যে অবস্থা, তাতে ভুঁইতি (ক্ষেতে) আসতি ইচ্ছে করে না। গাছ কেটে ফেলার চিন্তা করছি। যারা কাটতি আসবে, তাদের মজুরি দেওয়ার টাকাও নেই। তেল, কীটনাশক কিনে বাড়ি ফিরায় দায়। এভাবে ঋণগ্রস্ত হয়ে বেঁচে থাকা যায় না।’
ক্রেতা নেই, ফেলে দিতে হচ্ছে রাস্তায়
কৃষকদের দাবি, বাজারে পর্যাপ্ত পাইকার বা ‘খাওতা’ (ক্রেতা) নেই। মোকামে মাল পাঠাতে না পারায় আড়তদাররাও মাল কিনছেন না।
কৃষক আলী হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, ‘চার বিঘা ঢেঁড়স চাষ করেছি। আগাগোড়া মিলিয়ে দুই থেকে আড়াইশ মণের ওপর ফলন হয়েছে। কিন্তু হাটে নিয়ে গেলে বিক্রি হচ্ছে না, ফেরত আনতে হচ্ছে। এটা তো আর ঘরের জিনিস না যে রেখে দেওয়া যাবে। মানুষ আর কয়টা খাবে? এদিকে, সার-ওষুধের দামের কারণে উল্টো বাড়ি থেকে টাকা এনে খরচ চালাতে হচ্ছে। তাই সার-মাটি দেওয়া একবারেই বন্ধ করে দিয়েছি।’
মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম নামে আরেক চাষি বলেন, ‘করলা হাটে নিয়ে যাওয়ার পর প্রথমে দুইশ টাকা ঝুড়ি বলে, তারপর দেড়শ টাকা, শেষে কোনো দামই বলে না। নিরুপায় হয়ে হাটের রাস্তায় সব করলা ঢেলে দিয়ে এসেছি।’
‘ধলতা’ ও ওজনে কারচুপি
এদিকে বাজারে নিয়ে গেলেও কৃষকদের নানাভাবে ঠকানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কৃষক বদরুল আলম বলেন, “দশ মণের মতো করলা বাজারে নিয়ে গিয়েছিলাম। পাইকাররা ঝুড়ি বাদ দিলো ৩০ কেজি, ‘ধলতা’ (অতিরিক্ত বাদ দেওয়া ওজন) বাদ দিলো ২০ কেজি, আর এমনিতেই বাদ দিলো আরও ২০ কেজি। সব বাদসাদ দিয়ে কেজি প্রতি দাম দিলো মাত্র ছয় থেকে আট টাকা। পাইকাররা বলছে, ঢাকায় মাল পাঠিয়ে চালান বাঁচছে না, তাই তারা বেশি কিনতে পারছে না। এখন বাজারে এসে ব্যাপারিদের হাতে-পায়ে ধরে মাল বেচতে হচ্ছে।”
কৃষকদের মতে, সেচের জন্য এক বিঘা জমিতে শ্যালো মেশিনের পানির দামই দুই হাজার টাকা। এক বস্তা টিএসপি সারের দাম দেড় হাজার থেকে থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা, দস্তার কেজি সাড়ে চারশ টাকা। চাষের সব উপকরণ আকাশছোঁয়া হলেও কৃষকের উৎপাদিত সবজির দাম নেই।
কৃষি বিভাগের বক্তব্য, আশ্বাস
সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোশারফ হোসেন বলেন, যশোর জেলা সবজি চাষের জন্য বিখ্যাত। গত মৌসুমে এ অঞ্চলে ৪৭৮ হেক্টর জমিতে করলার আবাদ হয়েছিল। এটি একটি স্বল্পমেয়াদি ফসল। প্রথম দিকে কৃষকরা ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে করলা বিক্রি করে ভালো লাভ পেয়েছেন। তবে এখন মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে (প্রায় ৬০ শতাংশ উত্তোলন শেষ) দাম কিছুটা কমে গেছে।
তিনি কৃষকদের গাছ ফেলে না দিয়ে নিয়মিত পরিচর্যা ও সার দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘সবজির বাজার ওঠানামা করে। কৃষকরা যাতে সঠিক মূল্য পান, সেজন্য আমরা কৃষি বিপণন বিভাগসহ উদ্যোগ নিচ্ছি। বড় বড় সুপারশপ এবং অন্যান্য কর্পোরেট মার্কেটের সঙ্গে চাষিদের সরাসরি লিংকেজ বা যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার কাজ চলছে। আশা করা যায়, দ্রুতই কৃষকেরা ভালো দাম পাবেন।’